Category: গল্প
News Headings
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Feb 4, 2009
Source: bdnews24.com
Source: bdnews24.com
চাষা ও তার গরু
আহমেদ রিয়াজ
এক ছিল চাষা। থুক্কু, এক ছিল রাখাল। মনে হয় চাষাই ছিল। তবে যাই হোক, আর যে-ই হোক, তার ছিল এক গরু। গরু চাষারও থাকতে পারে আবার রাখালেরও থাকতে পারে। তবে মনে হয় ওটা চাষাই ছিল। প্রতিদিন সকাল হলে ওই চাষার সাথে গরুটা মাঠে যেত। কেন যেত? নাহ্! জমি চাষ করার জন্য নয়। ঘাস খাওয়ার জন্য। প্রতিদিনই চাষা গরুটাকে এত্ত এত্ত ঘাস খাওয়াত, খড় খাওয়াত, মাটির বড় হাঁড়িতে লবণ দিয়ে ভাতের মাড় খাওয়াত। তবু দিন দিন গরুটা শুকিয়ে যাচ্ছিল।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, গরুটা কিন্তু কথাও বলতে পারত। তবে এটা চাষা ছাড়া আর কেউ জানতে না। মানে গরুটাই আর কাউকে জানাতে মানা করে দিয়েছিল। একেবারে গভীর রাতে, সবাই যখন বিছানায় নাক ডাকত, তখন গরু আর চাষা গোয়ালঘরে বসে বসে সুখ-দুঃখের আলাপ করত।
চাষা বলত, কাল উত্তর দিকের বড় জমি লাঙ্গল দিতে যাবো। যাবি?
গরু বলত, এত বড় জমি আমি লাঙ্গল দিতে পারবো না। এমনিতেই তো শুকিয়ে যাচ্ছি। ওই জমি লাঙ্গল দিলে মরেই যাবো।
চাষা বলত, তুই আসলেই একটা গরু। তোকে দিয়ে কখনো লাঙ্গল টানিয়েছি? তুই ভুলে যাচ্ছিস আমার একটা ট্রাক্টর আছে। ওটাই লাঙ্গল দেবে। তুই তো যাবি কেবল ঘাস খেতে। আমি জমিতে ট্রাক্টর চালাবো আর তুই জমির আইল থেকে কেবল ঘাস খাবি। ওখানে বেশ সুন্দর ঘাস হয়েছে। ঘাস খেতে খেতে আমার সাথে গল্প করবি।
ভীষণ খুশি হল গরু। গল্প করতে খুব ভালো লাগে ওর। কিন' রাত ছাড়া তো গল্প করতে পারে না। রাতের বেলা গোয়ালে এসে গল্প করে তাতেও শান্তি নেই। কোনো কোনো দিন চাষাবউ ঘুম থেকে উঠে চলে আসে। চাষাকে খুঁজতে চলে আসে সোজা গোয়ালঘরে। প্রথম প্রথম খুঁজে পেত না। পরে দু-তিনবার চাষাকে গোয়াল ঘরে খুঁজে পেয়েই বুঝে গিয়েছে, চাষা আর কোথাও যায়নি। গোয়াল ঘরে বসে একা একা বিড় বিড় করছে।
কতদিন চাষার ইচ্ছে হয়েছে বউকে সবকিছু খুলে বলে। কিন্তু গরু ওকে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, খবরদার! ভুলেও চাষাবউ যেন না জানে তুমি আমার সাথে গল্প কর।
চাষা জানতে চায়, জানলে কী হবে?
গরু বলেছিল, জানলে পুরো দুনিয়া জেনে যাবে আমি কথা বলতে পারি। তখন চেয়ারম্যান সাহেব এসে আমাকে জোর করে নিয়ে যাবে। তখন তুমি কার সাথে কথা বলবে? সুখ-দুঃখের আলাপ করবে? আমাকে তখন পেট মোটা চেয়ারম্যানের সাথে আলাপ করতে হবে। তাকে আমি দেখতে পারি না।
চাষা বলল, ঠিকই বলেছিস। ঠিক আছে কাউকেই বলবো না।
সত্যি সত্যি চাষা কাউকে বলেনি। কিন্তু চাষার চিন্তা তা-ও গেল না। গরুটা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। এত খাওয়াচ্ছে, তবু শুকোচ্ছে। হাড়-গোড় সব বেরিয়ে এসেছে। এখনতো তাও চামড়ার ভিতরে আছে, মনে হচ্ছে কদিন বাদে চামড়ার বাইরে চলে আসবে সব। কী করা যায় ভাবতে থাকে চাষা।
একদিন ওই গ্রামে এলেন এক পশুডাক্তার। সেই পশুডাক্তারের কাছে গরুটাকে নিয়ে গেল চাষা। অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন ডাক্তার। কী কী খেতে দেয়া হয় সেটাও জানতে চাইলেন। সব শুনে বললেন, গরুটার ভয়াবহ রোগ হয়েছে।
চাষা বুক ধক করে ওঠল। ভয়ানক রোগ! জানতে চাইল, কী রোগ? এ রোগের ওষুধ আছে তো?
ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন, গাছে চড়া রোগ হয়েছে গরুটার। ও গাছে চড়তে চায়। প্রতিদিন একবার দুবার গাছে চড়লেই রোগ ভালো হয়ে যাবে।
সে রাতে গোয়ালঘরে গিয়ে চাষা বলল, তোর গাছে চড়তে ইচ্ছে করে বললেই পারতিস আমাকে।
গরু বলল, কিন্তু এমন ইচ্ছে তো আমার কখনো করেনি।
চাষা বলল, ডাক্তার যে বলল।
গরু বলল, কেন বলেছে কে জানে?
চাষা বলল, তা চেষ্টা করে দেখবি নাকি?
গরু জানতে চাইল, কী?
চাষা বলল, গাছে চড়া।
গরু বলল, ধ্যাৎ। কোনো গরুকে কখনো গাছে চড়তে দেখেছ, নাকি শুনেছ?
চাষা বলল, আমি ছাড়া আর কেউ কোনো গরুকে কথা বলতে দেখেছে নাকি শুনেছে? চেষ্টা করলে তুই গাছেও চড়তে পারবি। করবি নাকি চেষ্টা? চেষ্টা করে যদি গাছে চড়তে পারিস, আর কিছু না হোক তোর রোগ তো ভালো হবে।
গরু বলল, ঠিকই বলেছ। ঠিক আছে তোমার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে।
পরদিন ভোর বেলা গরু নিয়ে একটা নারকেল গাছের সামনে এসে দাঁড়াল চাষা। গাছটা দেখিয়ে গরুকে বলল, এই গাছের নাম তো জানিস?
গরু বলল, জানি। এটা ডাব গাছ। আচ্ছা এক গাছে দুটো জিনিস ধরে কেন?
চাষা বলল, কোথায় দুটো জিনিস ধরে?
গরু বলল, এই যে ডাব গাছে, ডাবও হয় আবার নারকেলও হয়।
চাষা বলল, তুই আসলেই একটা গরু বুঝলি? ডাব পাকলেই তো নারকেল হয়। দুটো জিনিস হলো কই?
গরু বলল, বা রে! ডাব আর নারকেল কি এক জিনিস হল?
চাষা আবার বোঝাতে চাইল, তুই আসলে বুঝতে পারছিস না। গাছে থাকতে থাকতে ডাব একসময় নারকেল হয়ে যায়।
গরু বলল, সেই তো একই কথা হল। ডাব একসময় নারকেল হয়ে যায়। নারকেলটাই পাকা নারকেল হতে পারে না? কিংবা ডাবটাই পাকা ডাব হতে পারে না?
চাষা বোঝাতে চাইল, তুই আসলে বুঝতে পারছিস না। আচ্ছা তোকে আম দিয়েই বোঝাই। প্রথমে থাকে কাঁচা আম। সবুজ সবুজ। তারপর গাছে থেকেই আম পেকে যায়। ডাবও তেমনি।
গরু বলল, সব আমই কি গাছে থেকে পাকে? সবুজ আম ঘরে নিয়ে রাখলে একসময় পেকে যায় না?
চাষা বলল, তা যায়।
গরু বলল, কিন্তু ডাব ঘরে নিয়ে রাখলে কি নারকেল হবে?
চাষা বলল, তা হবে না। কিন্তু তাই বলে একই গাছে দুটো ফল ধরবে এমন কথা বলতে পারিস না। আম গাছে আমই ধরে, কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল। আর ডাব গাছে ডাব।
গরু বলল, তাহলে নারকেল ধরে কোন গাছে?
চাষা এবার রেগে গিয়ে বলল, গরু কথা বলতে জানলেই সমস্যা। এখানে এসেছি তোকে গাছে চড়া শেখাবো বলে। তুই কিনা ডাব আর নারকেল নিয়ে তর্ক জুড়ে দিয়েছিস।
গরু বলল, তুমি অন্য গাছ থাকতে আমাকে ডাব গাছের সামনে আনলে কেন?
চাষা বলল, ডাব গাছে চড়া শিখলে সব গাছে চড়তে পারবি তুই। বুঝেছিস? গাধা কোথাকার?
গরু বলল, এই যে তুমি আবার ভুল কথা বললে। আমি কিন্তু ডাব নই। ডাব থেকে নারকেল হতে পারে। কিন্তু গরু থেকে গাধা হওয়ার কোনো নজির নেই। কেউ হয়ও না। কোনো গরুকে গাধা হতে দেখেছ?
চাষা দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, চোখের সামনেই তো দেখতে পাচ্ছি। এবার কথা না বাড়িয়ে গাছে ওঠ।
চাষাকে অবাক করে দিয়ে এক নিমিষেই ডাবগাছের মাথায় উঠে গেল গরু। গরুটা যখন ডাবগাছের মাথায় ঠিক তক্ষুণি চেয়ারম্যান যাচ্ছিলেন ও পথ দিয়ে। চাষা অবাক। এত সকাল সকাল কই যায় চেয়ারম্যান? বলেই বসল সে, কই যান চেয়ারম্যান সাব?
পেট নিয়ে হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। সাথে কেউ নেই। একা। চেয়ারম্যানকে কখনো এমন একা হাঁটতে দেখেনি চাষা। সাথে আটদশজন তো থাকেই। চেয়ারম্যান বললেন, যাবো আর কোথায়? চেয়ার ঠিক ঠাক করতে যাই। তা তুই এখানে কী করছিস?
চাষা বলল, গরুকে গাছে চড়া শেখাচ্ছি।
চাষার কথা শুনে ভিরমি খেলেন চেয়ারম্যান। পান চিবুচ্ছিলেন তিনি। সেই পান আটকে গেল তার শ্বাসনালিতে। তিনি কাশতে শুরু করলেন। কাশতে কাশতে চোখমুখ লাল হয়ে গেল। কোনো রকমে কাশি থামিয়ে বললেন, কী বললি?
চাষা নির্বিকার জবাব দিল আবার, গরুকে গাছে চড়া শেখাচ্ছি।
খেপে গেলেন চেয়ারম্যান। ইয়ার্কি তিনি মোটেই সইতে পারেন না। চোখ মুখ নাক আরো লাল করে বললেন, ইয়ার্কি করছিস আমার সাথে? আমার পেছনে করিস ভালো কথা। আমি শুনেও না শোনার ভান করে থাকি। তাই বলে একেবারে সামনাসামনি করবি? কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? তোর তিনটা জমি কিন্তু আমার কাছে বাঁধা আছে, মনে রাখিস। ইয়ার্কির ফল কখনো ভালো হয় না।
চাষা বলল, আপনি মান্যি গণ্যি মানুষ। আপনার সাথে ইয়ার্কি করা আমার মানায় না। ওই যে দ্যাখেন।
বলে গাছের দিকে দেখাল চাষা। সত্যি একটা গরু ডাব গাছের একেবারে মাথায়। চারপা দিয়ে গাছটাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
দেখে তো চেয়ারম্যানের চক্ষুচড়ক গাছ। বেশ ঘামতে শুরু করলেন তিনি। এমন অবাক করা দৃশ্য বাপের জন্মেও দেখেননি। এবং তিনি নিশ্চিত দুনিয়ার আর কোনো মানুষ দেখেনি। কেবল চাষা আর তিনিই দেখেছেন।
চেয়ারম্যান বললেন, তুই জাদু-টোনা শিখলি কবে থেকে?
চাষা অবাক হয়ে বলল, মানে?
চেয়ারম্যান বললেন, মানে আর কী। এটা তুই আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস? তাই বলছি জাদু টোনা শিখছিস কতদিন ধরে?
চাষা বলল, নিজের চোখে দেখে বলছেন এটা জাদু টোনা?
চেয়ারম্যান বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। গরুটা আমার কাছে দুদিন থাক। দেখি নিজে নিজে গাছে চড়তে পারে কি না। যদি চড়তে পারে, তাহলেই বুঝব জাদু টোনা নয়।
চাষা বুঝল জমির মতো ওর গরু হজম করার বুদ্ধি এঁটেছে চেয়ারম্যান। গরুর দিকে তাকিয়ে নিচ থেকে হাঁক দিল, নেমে আয়।
কিন্তু গরুটা নামছে না। আরো কয়েকবার হাঁক দিল। তাও নামল না গরু। এবার চেয়ারম্যান নিজেই হম্বি তম্বি শুরু করলেন, নেমে আয় বলছি। আমাকে তো চিনিস না। আমি এ এলাকার চেয়ারম্যান। চারবার চেয়ারম্যান হয়েছি। চারবারের চেয়ারম্যান বলছি, নেমে আয়।
কিন্তু যতই হম্বি তম্বি করা হোক, গাছ থেকে নামতে রাজি নয় গরু। এবার কয়েকটা মাটির ঢেলা জোগাড় করলেন চেয়ারম্যান। তারপর সেগুলো ছুঁড়ে মারতে লাগলেন গরুর দিকে। চাষার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, ইটা মার। ইটা মার। বড় লাঠি জোগাড় কর। লাঠি দিয়ে খোঁচা মার গরুর লেজে। এমনিতেই নামবে।
চাষা বলল, গরুর গায়ে আমি হাত তুলি না।
চেয়ারম্যান বললেন, আবার জাদু কর। জাদু দিয়ে নিচে নামা। নাকি ভুলে গেছিস জাদু মন্ত্র? যে মন্ত্র পড়ে গাছে তুলেছিস, মন্ত্রটা উল্টো করে পড়। গাছ থেকে নেমে যাবে।
চাষা আবারও বলল, গরু একা একাই গাছে উঠেছে।
চেয়ারম্যান রাগে গজ গজ করতে করতে বললেন, আহাম্মক। সব ক’টা আহাম্মক। গাছে উঠেছে এখন নামতে পারছে না।
চাষা বলল, আপনার সামনে নামতে সাহস পাচ্ছে না। মনে হয় আপনি চলে গেলে নামবে।
চেয়ারম্যান আরও খেপে গেলেন। বললেন, আমার সামনে নামতে পারবে না কেন? আমি কি বাঘ না ভালুক?
চাষা বলল, গরুটা মনে হয় আপনাকে শেয়াল মনে করে। ও শেয়াল দেখলে খুব ভয় পায়।
এবার আর কথা বাড়ালেন না চেয়ারম্যান। উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলেন। মনে কোথায় যাবেন, ভুলে গেছেন।
চেয়ারম্যান চলে যেতেই চাষা ফিস ফিস করে গরুকে বলল, এবার নেমে আয় তো গাছ থেকে। অনেক হয়েছে। আর কেউ তোকে গাছে দেখে ফেলার আগেই নেমে পড়।
গরু বলল, কিন্তু আমি যে নামতে পারছি না।
চাষার মাথায় যেন বাজ পড়ল। বলছে কী গরুটা? উঠতে পারল, আর নামতে পারবে না? তা কি হয়?
চাষা বুদ্ধি দিতে লাগল, যেভাবে উঠেছিস, ঠিক সেভাবে নেমে আয়।
গরু চেষ্টা করল। কিন্তু নামতে পারছে না মোটেই। বলল, পারছি না। লাফ দেই?
চাষা হইহই করে ওঠল। খবরদার, লাফ-ঝাঁপ দিস না। একেবারে গুঁড়ো হয়ে যাবি। এ গ্রামে কোনো পশু হাসপাতাল নেই। আশপাশের কোনো গ্রামেও নেই। যেতে হবে শহরে। তোকে নিয়ে শহরে যাবে কে?
গরু বলল, তাহলে কী করবো?
চাষার তো মাথায় হাত। কোনো উপায়ই যে পাচ্ছে না। মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল ডাব আর নারকেল গাছের তলায়। মাথা থেকে তার হাতই সরছে না। ওভাবেই বসে রইল।
কতদিন?
অনেক অনেকদিন। কারণ গল্পের গরুকে গাছে তোলা সহজ, গাছ থেকে নামানো কিন্তু সহজ নয়। আর সহজ নয় বলেই এখনও সেই চাষা গাছের তলায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে তো আছেই। ওই গাছে কত ডাব হচ্ছে, কত ডাব নারকেল হয়ে যাচ্ছে, তবু গাছ আঁকড়ে আছে গরুটা। কতদিন থাকবে কে জানে?
এক ছিল চাষা। থুক্কু, এক ছিল রাখাল। মনে হয় চাষাই ছিল। তবে যাই হোক, আর যে-ই হোক, তার ছিল এক গরু। গরু চাষারও থাকতে পারে আবার রাখালেরও থাকতে পারে। তবে মনে হয় ওটা চাষাই ছিল। প্রতিদিন সকাল হলে ওই চাষার সাথে গরুটা মাঠে যেত। কেন যেত? নাহ্! জমি চাষ করার জন্য নয়। ঘাস খাওয়ার জন্য। প্রতিদিনই চাষা গরুটাকে এত্ত এত্ত ঘাস খাওয়াত, খড় খাওয়াত, মাটির বড় হাঁড়িতে লবণ দিয়ে ভাতের মাড় খাওয়াত। তবু দিন দিন গরুটা শুকিয়ে যাচ্ছিল।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, গরুটা কিন্তু কথাও বলতে পারত। তবে এটা চাষা ছাড়া আর কেউ জানতে না। মানে গরুটাই আর কাউকে জানাতে মানা করে দিয়েছিল। একেবারে গভীর রাতে, সবাই যখন বিছানায় নাক ডাকত, তখন গরু আর চাষা গোয়ালঘরে বসে বসে সুখ-দুঃখের আলাপ করত।
চাষা বলত, কাল উত্তর দিকের বড় জমি লাঙ্গল দিতে যাবো। যাবি?
গরু বলত, এত বড় জমি আমি লাঙ্গল দিতে পারবো না। এমনিতেই তো শুকিয়ে যাচ্ছি। ওই জমি লাঙ্গল দিলে মরেই যাবো।
চাষা বলত, তুই আসলেই একটা গরু। তোকে দিয়ে কখনো লাঙ্গল টানিয়েছি? তুই ভুলে যাচ্ছিস আমার একটা ট্রাক্টর আছে। ওটাই লাঙ্গল দেবে। তুই তো যাবি কেবল ঘাস খেতে। আমি জমিতে ট্রাক্টর চালাবো আর তুই জমির আইল থেকে কেবল ঘাস খাবি। ওখানে বেশ সুন্দর ঘাস হয়েছে। ঘাস খেতে খেতে আমার সাথে গল্প করবি।
ভীষণ খুশি হল গরু। গল্প করতে খুব ভালো লাগে ওর। কিন' রাত ছাড়া তো গল্প করতে পারে না। রাতের বেলা গোয়ালে এসে গল্প করে তাতেও শান্তি নেই। কোনো কোনো দিন চাষাবউ ঘুম থেকে উঠে চলে আসে। চাষাকে খুঁজতে চলে আসে সোজা গোয়ালঘরে। প্রথম প্রথম খুঁজে পেত না। পরে দু-তিনবার চাষাকে গোয়াল ঘরে খুঁজে পেয়েই বুঝে গিয়েছে, চাষা আর কোথাও যায়নি। গোয়াল ঘরে বসে একা একা বিড় বিড় করছে।
কতদিন চাষার ইচ্ছে হয়েছে বউকে সবকিছু খুলে বলে। কিন্তু গরু ওকে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, খবরদার! ভুলেও চাষাবউ যেন না জানে তুমি আমার সাথে গল্প কর।
চাষা জানতে চায়, জানলে কী হবে?
গরু বলেছিল, জানলে পুরো দুনিয়া জেনে যাবে আমি কথা বলতে পারি। তখন চেয়ারম্যান সাহেব এসে আমাকে জোর করে নিয়ে যাবে। তখন তুমি কার সাথে কথা বলবে? সুখ-দুঃখের আলাপ করবে? আমাকে তখন পেট মোটা চেয়ারম্যানের সাথে আলাপ করতে হবে। তাকে আমি দেখতে পারি না।
চাষা বলল, ঠিকই বলেছিস। ঠিক আছে কাউকেই বলবো না।
সত্যি সত্যি চাষা কাউকে বলেনি। কিন্তু চাষার চিন্তা তা-ও গেল না। গরুটা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। এত খাওয়াচ্ছে, তবু শুকোচ্ছে। হাড়-গোড় সব বেরিয়ে এসেছে। এখনতো তাও চামড়ার ভিতরে আছে, মনে হচ্ছে কদিন বাদে চামড়ার বাইরে চলে আসবে সব। কী করা যায় ভাবতে থাকে চাষা।
একদিন ওই গ্রামে এলেন এক পশুডাক্তার। সেই পশুডাক্তারের কাছে গরুটাকে নিয়ে গেল চাষা। অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন ডাক্তার। কী কী খেতে দেয়া হয় সেটাও জানতে চাইলেন। সব শুনে বললেন, গরুটার ভয়াবহ রোগ হয়েছে।
চাষা বুক ধক করে ওঠল। ভয়ানক রোগ! জানতে চাইল, কী রোগ? এ রোগের ওষুধ আছে তো?
ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন, গাছে চড়া রোগ হয়েছে গরুটার। ও গাছে চড়তে চায়। প্রতিদিন একবার দুবার গাছে চড়লেই রোগ ভালো হয়ে যাবে।
সে রাতে গোয়ালঘরে গিয়ে চাষা বলল, তোর গাছে চড়তে ইচ্ছে করে বললেই পারতিস আমাকে।
গরু বলল, কিন্তু এমন ইচ্ছে তো আমার কখনো করেনি।
চাষা বলল, ডাক্তার যে বলল।
গরু বলল, কেন বলেছে কে জানে?
চাষা বলল, তা চেষ্টা করে দেখবি নাকি?
গরু জানতে চাইল, কী?
চাষা বলল, গাছে চড়া।
গরু বলল, ধ্যাৎ। কোনো গরুকে কখনো গাছে চড়তে দেখেছ, নাকি শুনেছ?
চাষা বলল, আমি ছাড়া আর কেউ কোনো গরুকে কথা বলতে দেখেছে নাকি শুনেছে? চেষ্টা করলে তুই গাছেও চড়তে পারবি। করবি নাকি চেষ্টা? চেষ্টা করে যদি গাছে চড়তে পারিস, আর কিছু না হোক তোর রোগ তো ভালো হবে।
গরু বলল, ঠিকই বলেছ। ঠিক আছে তোমার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে।
পরদিন ভোর বেলা গরু নিয়ে একটা নারকেল গাছের সামনে এসে দাঁড়াল চাষা। গাছটা দেখিয়ে গরুকে বলল, এই গাছের নাম তো জানিস?
গরু বলল, জানি। এটা ডাব গাছ। আচ্ছা এক গাছে দুটো জিনিস ধরে কেন?
চাষা বলল, কোথায় দুটো জিনিস ধরে?
গরু বলল, এই যে ডাব গাছে, ডাবও হয় আবার নারকেলও হয়।
চাষা বলল, তুই আসলেই একটা গরু বুঝলি? ডাব পাকলেই তো নারকেল হয়। দুটো জিনিস হলো কই?
গরু বলল, বা রে! ডাব আর নারকেল কি এক জিনিস হল?
চাষা আবার বোঝাতে চাইল, তুই আসলে বুঝতে পারছিস না। গাছে থাকতে থাকতে ডাব একসময় নারকেল হয়ে যায়।
গরু বলল, সেই তো একই কথা হল। ডাব একসময় নারকেল হয়ে যায়। নারকেলটাই পাকা নারকেল হতে পারে না? কিংবা ডাবটাই পাকা ডাব হতে পারে না?
চাষা বোঝাতে চাইল, তুই আসলে বুঝতে পারছিস না। আচ্ছা তোকে আম দিয়েই বোঝাই। প্রথমে থাকে কাঁচা আম। সবুজ সবুজ। তারপর গাছে থেকেই আম পেকে যায়। ডাবও তেমনি।
গরু বলল, সব আমই কি গাছে থেকে পাকে? সবুজ আম ঘরে নিয়ে রাখলে একসময় পেকে যায় না?
চাষা বলল, তা যায়।
গরু বলল, কিন্তু ডাব ঘরে নিয়ে রাখলে কি নারকেল হবে?
চাষা বলল, তা হবে না। কিন্তু তাই বলে একই গাছে দুটো ফল ধরবে এমন কথা বলতে পারিস না। আম গাছে আমই ধরে, কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল। আর ডাব গাছে ডাব।
গরু বলল, তাহলে নারকেল ধরে কোন গাছে?
চাষা এবার রেগে গিয়ে বলল, গরু কথা বলতে জানলেই সমস্যা। এখানে এসেছি তোকে গাছে চড়া শেখাবো বলে। তুই কিনা ডাব আর নারকেল নিয়ে তর্ক জুড়ে দিয়েছিস।
গরু বলল, তুমি অন্য গাছ থাকতে আমাকে ডাব গাছের সামনে আনলে কেন?
চাষা বলল, ডাব গাছে চড়া শিখলে সব গাছে চড়তে পারবি তুই। বুঝেছিস? গাধা কোথাকার?
গরু বলল, এই যে তুমি আবার ভুল কথা বললে। আমি কিন্তু ডাব নই। ডাব থেকে নারকেল হতে পারে। কিন্তু গরু থেকে গাধা হওয়ার কোনো নজির নেই। কেউ হয়ও না। কোনো গরুকে গাধা হতে দেখেছ?
চাষা দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, চোখের সামনেই তো দেখতে পাচ্ছি। এবার কথা না বাড়িয়ে গাছে ওঠ।
চাষাকে অবাক করে দিয়ে এক নিমিষেই ডাবগাছের মাথায় উঠে গেল গরু। গরুটা যখন ডাবগাছের মাথায় ঠিক তক্ষুণি চেয়ারম্যান যাচ্ছিলেন ও পথ দিয়ে। চাষা অবাক। এত সকাল সকাল কই যায় চেয়ারম্যান? বলেই বসল সে, কই যান চেয়ারম্যান সাব?
পেট নিয়ে হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। সাথে কেউ নেই। একা। চেয়ারম্যানকে কখনো এমন একা হাঁটতে দেখেনি চাষা। সাথে আটদশজন তো থাকেই। চেয়ারম্যান বললেন, যাবো আর কোথায়? চেয়ার ঠিক ঠাক করতে যাই। তা তুই এখানে কী করছিস?
চাষা বলল, গরুকে গাছে চড়া শেখাচ্ছি।
চাষার কথা শুনে ভিরমি খেলেন চেয়ারম্যান। পান চিবুচ্ছিলেন তিনি। সেই পান আটকে গেল তার শ্বাসনালিতে। তিনি কাশতে শুরু করলেন। কাশতে কাশতে চোখমুখ লাল হয়ে গেল। কোনো রকমে কাশি থামিয়ে বললেন, কী বললি?
চাষা নির্বিকার জবাব দিল আবার, গরুকে গাছে চড়া শেখাচ্ছি।
খেপে গেলেন চেয়ারম্যান। ইয়ার্কি তিনি মোটেই সইতে পারেন না। চোখ মুখ নাক আরো লাল করে বললেন, ইয়ার্কি করছিস আমার সাথে? আমার পেছনে করিস ভালো কথা। আমি শুনেও না শোনার ভান করে থাকি। তাই বলে একেবারে সামনাসামনি করবি? কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? তোর তিনটা জমি কিন্তু আমার কাছে বাঁধা আছে, মনে রাখিস। ইয়ার্কির ফল কখনো ভালো হয় না।
চাষা বলল, আপনি মান্যি গণ্যি মানুষ। আপনার সাথে ইয়ার্কি করা আমার মানায় না। ওই যে দ্যাখেন।
বলে গাছের দিকে দেখাল চাষা। সত্যি একটা গরু ডাব গাছের একেবারে মাথায়। চারপা দিয়ে গাছটাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
দেখে তো চেয়ারম্যানের চক্ষুচড়ক গাছ। বেশ ঘামতে শুরু করলেন তিনি। এমন অবাক করা দৃশ্য বাপের জন্মেও দেখেননি। এবং তিনি নিশ্চিত দুনিয়ার আর কোনো মানুষ দেখেনি। কেবল চাষা আর তিনিই দেখেছেন।
চেয়ারম্যান বললেন, তুই জাদু-টোনা শিখলি কবে থেকে?
চাষা অবাক হয়ে বলল, মানে?
চেয়ারম্যান বললেন, মানে আর কী। এটা তুই আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস? তাই বলছি জাদু টোনা শিখছিস কতদিন ধরে?
চাষা বলল, নিজের চোখে দেখে বলছেন এটা জাদু টোনা?
চেয়ারম্যান বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। গরুটা আমার কাছে দুদিন থাক। দেখি নিজে নিজে গাছে চড়তে পারে কি না। যদি চড়তে পারে, তাহলেই বুঝব জাদু টোনা নয়।
চাষা বুঝল জমির মতো ওর গরু হজম করার বুদ্ধি এঁটেছে চেয়ারম্যান। গরুর দিকে তাকিয়ে নিচ থেকে হাঁক দিল, নেমে আয়।
কিন্তু গরুটা নামছে না। আরো কয়েকবার হাঁক দিল। তাও নামল না গরু। এবার চেয়ারম্যান নিজেই হম্বি তম্বি শুরু করলেন, নেমে আয় বলছি। আমাকে তো চিনিস না। আমি এ এলাকার চেয়ারম্যান। চারবার চেয়ারম্যান হয়েছি। চারবারের চেয়ারম্যান বলছি, নেমে আয়।
কিন্তু যতই হম্বি তম্বি করা হোক, গাছ থেকে নামতে রাজি নয় গরু। এবার কয়েকটা মাটির ঢেলা জোগাড় করলেন চেয়ারম্যান। তারপর সেগুলো ছুঁড়ে মারতে লাগলেন গরুর দিকে। চাষার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, ইটা মার। ইটা মার। বড় লাঠি জোগাড় কর। লাঠি দিয়ে খোঁচা মার গরুর লেজে। এমনিতেই নামবে।
চাষা বলল, গরুর গায়ে আমি হাত তুলি না।
চেয়ারম্যান বললেন, আবার জাদু কর। জাদু দিয়ে নিচে নামা। নাকি ভুলে গেছিস জাদু মন্ত্র? যে মন্ত্র পড়ে গাছে তুলেছিস, মন্ত্রটা উল্টো করে পড়। গাছ থেকে নেমে যাবে।
চাষা আবারও বলল, গরু একা একাই গাছে উঠেছে।
চেয়ারম্যান রাগে গজ গজ করতে করতে বললেন, আহাম্মক। সব ক’টা আহাম্মক। গাছে উঠেছে এখন নামতে পারছে না।
চাষা বলল, আপনার সামনে নামতে সাহস পাচ্ছে না। মনে হয় আপনি চলে গেলে নামবে।
চেয়ারম্যান আরও খেপে গেলেন। বললেন, আমার সামনে নামতে পারবে না কেন? আমি কি বাঘ না ভালুক?
চাষা বলল, গরুটা মনে হয় আপনাকে শেয়াল মনে করে। ও শেয়াল দেখলে খুব ভয় পায়।
এবার আর কথা বাড়ালেন না চেয়ারম্যান। উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলেন। মনে কোথায় যাবেন, ভুলে গেছেন।
চেয়ারম্যান চলে যেতেই চাষা ফিস ফিস করে গরুকে বলল, এবার নেমে আয় তো গাছ থেকে। অনেক হয়েছে। আর কেউ তোকে গাছে দেখে ফেলার আগেই নেমে পড়।
গরু বলল, কিন্তু আমি যে নামতে পারছি না।
চাষার মাথায় যেন বাজ পড়ল। বলছে কী গরুটা? উঠতে পারল, আর নামতে পারবে না? তা কি হয়?
চাষা বুদ্ধি দিতে লাগল, যেভাবে উঠেছিস, ঠিক সেভাবে নেমে আয়।
গরু চেষ্টা করল। কিন্তু নামতে পারছে না মোটেই। বলল, পারছি না। লাফ দেই?
চাষা হইহই করে ওঠল। খবরদার, লাফ-ঝাঁপ দিস না। একেবারে গুঁড়ো হয়ে যাবি। এ গ্রামে কোনো পশু হাসপাতাল নেই। আশপাশের কোনো গ্রামেও নেই। যেতে হবে শহরে। তোকে নিয়ে শহরে যাবে কে?
গরু বলল, তাহলে কী করবো?
চাষার তো মাথায় হাত। কোনো উপায়ই যে পাচ্ছে না। মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল ডাব আর নারকেল গাছের তলায়। মাথা থেকে তার হাতই সরছে না। ওভাবেই বসে রইল।
কতদিন?
অনেক অনেকদিন। কারণ গল্পের গরুকে গাছে তোলা সহজ, গাছ থেকে নামানো কিন্তু সহজ নয়। আর সহজ নয় বলেই এখনও সেই চাষা গাছের তলায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে তো আছেই। ওই গাছে কত ডাব হচ্ছে, কত ডাব নারকেল হয়ে যাচ্ছে, তবু গাছ আঁকড়ে আছে গরুটা। কতদিন থাকবে কে জানে?







