Category: গল্প
rumi-4.jpg
News Headings

খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Feb 4, 2009
Source: bdnews24.com
শিয়াল রাজার সাজা
এনায়েত রসুল

এক নদীর পাড়েরয়েছে একটি গ্রাম। সেই গ্রামের পাশে রয়েছে একটি মাঠ। সেই মাঠের শেষ প্রান্তে রয়েছে একটি বন। তবে বন বলা হলেও ওটা কোনো বন নয়। বলা চলে বড়ো একটা জঙ্গল। সেই জঙ্গলে রয়েছে দু-তিনশো গাছ, নানা জাতের পাখি, বানর, বনবিড়াল বনমোরগ, খরগোশ আর বিষ ছাড়া দু’চারটি সাপ। সেই সাপ ফোঁস ফোঁস করলেও ফণা তোলে না। ফণা তুললেও কাউকে ছোবল মারে না। খিদে লাগলে ধান খেতে ঢুকে ইঁদুর-ব্যাঙ খায়। তবু বনের ইঁদুর-ব্যাঙ ধরে খায় না। অন্য বনের মতো বাঘ, সিংহও নেই এই বনে। তাই কোনো রাজাও নেই। সবাই সবার ইচ্ছে মতো চলে। তাতে কোনো সমস্যাও হয় না। ভালোই কেটে যাচ্ছে বনবাসীদের জীবন।

এক সকালে কোথা থেকে এক শিয়াল এলো সেই বনে। এসেই নাক সিঁটকে বললো, ধ্যাত! এ কোথায় এলাম? এখানে তো মান-সম্মান নিয়ে থাকা যাবে না। নড়চড়াই করা যাচ্ছে না। এটা আবার বন হলো নাকি?

যেখানে দাঁড়িয়ে শিয়াল এসব কথা বলছিলো সেখানে একটা ডুমুর গাছ ছিলো। সেই গাছে বসে ডুমুর খাচ্ছিলো একটা ছোট বানর। শিয়ালের কথা শুনে সে বললো, আমাদের এ বনটাকে পছন্দ হচ্ছে না বুঝি ? তুমি কে হে? কোথা থেকে এসেছো?

শিয়াল বললো, আগে তোর পরিচয় দে। তুই কে?

ছোট বানর বললো, আমার নাম টুকু। এই বনেই জন্ম হয়েছে- এই বনেই বেড়ে উঠছি। তা তুমি কে? কখনো দেখিনি তো তোমাকে।

শিয়াল বললো, তুই তো এক ছোট্ট বানর। তোর কাছে পরিচয় দিলে মান-সম্মান থাকবে না। তুই রাজা সাহেবকে ডেকে আন। তার কাছে সব বলবো।

টুকু বললো, আমাদের কোনো রাজা নেই। আমরা সবাই রাজা।

শিয়াল বললো, বুঝতে পেরেছি। এ বনে কোনো আইন-শৃঙ্খলা নেই। মান্যগণ্য নেই। সবাইকে তোরা সমান ভাবিস। এটা ভালো কথা নয়। তোদের একজন রাজা থাকা দরকার।

টুকু বললো, তাহলে আমি এক কাজ করি। বনের সবাইকে ডেকে জড়ো করি। তুমি তাদের কাছে এসব কথা বলো।

শিয়াল বললো, ভালো কথাই বলেছিস। তবে যা, সবাইকে ডেকে জড়ো কর। বল, শিয়াল সাহেব ডেকেছেন। জরুরি সভা হবে।

বনের ভেতর যে পুকুর ছিলো তার চারপাশে বসলো সাপ, ব্যাঙ, ঘরগোশ, বেজি আর ইঁদুররা। গাছের বসলো পাখি, প্রজাপতি আর বানরের দল। সবাই বসার পর গম্ভীর চালে হেলেদুলে শিয়াল এসে বসলো একটা উঁচু ঢিবির ওপর। তারপর বললো, আমি এ বনে নতুন এসেছি। এসেই দেখতে পেলাম এখানে কেনো উন্নত শ্রেণীর প্রাণী নেই। সবাই নিজ নিজ ইচ্ছে মতো চলে। এটা ভালো কথা নয়।

টুকুর বুড়ো দাদুও ছিলো সেই সভায় খক্‌খক্‌ করে কাশতে কাশতে সে বলো, কে বললো ভালো কথা নয়? আমরা খিদে লাগল ফুল-ফুল পেড়ে খাচ্ছি, কিচির-মিচির করে খেলছি, ঘুম পেলে ঘুমোচ্ছি। কোনো সমস্যা তো হচ্ছে না। এ বনে সবাই স্বাধীন। আর এটাই এ বনের বৈশিষ্ট্য।

শিয়াল বললো, বুঝলাম তোমার কথা। কিন্তু সব বনে রাজা থাকেন। তিনি প্রজাদের শাসন করেন আর আপদে-বিপদে পাশে গিয়ে দাঁড়ন। তোমাদের কোনো রাজা নেই। এটা তো খুব লজ্জার কথা। ঝটপট একজন রাজা ঠিক করে নাও।

একটা সাদা খরগোশ ছিলো সেখানে। খুব সরু গলায় সে বললো, আমি যতোটুকু জানি সিংহকে বনের রাজা বলা হয়। সিংহ না থাকলে বাঘ মামাকে সবাই মিলে রাজা করে নেয়। আমাদের এই বনে তো উনারা নেই। কাকে রাজা বানাবো?

শিয়াল বললো, এটা একটা সমস্যা বটে। তবে সমস্যা যেমন আছে তেমন তার সমাধানও আছে। বাঘ নেই সিংহ। নেই বলে কি এ বনটা উচ্ছন্নে যাবে ? তা তো হতে দেয়া যায় না।

তাহলে কি করতে চাও তুমি?

জিজ্ঞেস করলো হুতুম প্যাঁচা।

শিয়াল বললো, কি আর করবো? তোমরা রাজি হলে আমিই বনের শাসনভার নিজের কাঁধে তুলে নেবো। ভারটা বইতে অনেক কষ্ট হবে জানি। কিন্তু উপায়ও তো নেই। বাঘ নেই, সিংহ নেই, ভালুক নেই যে বনে-যে বনে তো শিয়ালকে দায়-দায়িত্ব মাথা পেতে নিতেই হবে। তবে এ কথাও সত্য। এটা গনতন্ত্রের যুগ। তোমরা সবাই রাজি হলে তবেই আমি রাজা হবো। নইলে যেমন চলছে তেমনই চলুক। আমার আপত্তি নেই।

টুকুর দাদু বললো, আচ্ছা, মেনে নিলাম। আজ থেকে তুমি আমাদের রাজা। আমরা তোমার কথা মেনে চলবো। ব্যস, সেই থেকে শিয়াল হয়ে গেলো ছোট বনের রাজা।

দুই.
রাজা হয়েই কিন্তু শিয়াল সেই বনের নিয়মকানুন বদলে দিলো। সাতসকালে পাখিরা কিচির মিচির করতে পারবে না। বানররা পাঁচটার বেশি ডুমুর খেতে পারবে না। সাপেরা ফোঁস ফোঁস করতে পারবে না-এমন সব অদ্ভুত আইন। মোট কথা, দুষ্টু শিয়াল দুদিনেই সবার জীবন অতিষ্ঠ করে তুললো।

শিয়াল রাজার অত্যাচার মেনে নিতে আপত্তি করেনি কেউ। রাজার আদেশ যতোই অদ্ভুত আর কড়া হোক, মেনে চলতে তো হবেই। এটাইতো দুনিয়ার নিয়ম। কিন্তু একদিন শিয়াল যখন বললো রোজ তাকে দুটো করে বনমোরগ খেতে দিতে হবে, তখন সবার মনখারাপ হয়ে গেলো। প্রথম প্রতিবাদ করলো টুকু। সে বললো, শিয়াল রাজার এ আদেশ আমরা মানবো না। বনমোরগদের সাথে আমরা মিলে মিশে বড়ো হয়েছি। ওদের আমরা শিয়ালের মুখে তুলে দিতে পারবো না। হুতুম প্যাঁচা হুমহুম শব্দ করে বললো, তোমরা ভাই উত্তেজিত হয়ো না। আমাকে একটু ভাবতে দাও।

সবাই বললো, বেশ হুতুম দাদা, তুমি ইচ্ছে মতো ভাবো। ভেবে-টেবে বলো কি করলে আমরা শিয়াল রাজার হাত থেকে মুক্তি পাবো। আমাদের আর রাজা-টাজার দরকার নেই।

কদম গাছের ডালে বসে চোখ বুজে দুদিন ভাবলো হুতুম প্যাঁচা। তারপর চোখ খুলে বললো, দুদিন ভেবে এটুকু বুঝেছি, আমরা আগেই ভালো ছিলাম। শিয়াল রাজাকে বন থেকে তাড়াতে হবে।

কি করে তাড়াবে?

জিজ্ঞেস করলো বেজি। হুতুম প্যাঁচা বললো, কী করে তাড়াবো তা এখনো ভেবে দেখিনি। আমাকে সাত দিন সময় দাও। ভেবে-টেবে দেখি।

সবার সঙ্গে সেখানে টুকুও ছিলো। টুকু বললো, তোমার আর ভেবে দরকার নেই প্যাঁচা দাদু। তাড়াবার বুদ্ধি আমি পেয়ে গেছি। তোমরা শুধু ধৈর্য ধরে দেখো আমি কি করি।

সবাই বললো, ঠিক আছে আমরা ধৈর্য ধরলাম। দেখি তুই কিভাবে ওকে তাড়াস।

সেই ছোট বনে জাম গাছে কয়েকটি মৌচাক ছিলো। মৌচাকের মৌমাছিদের সঙ্গে টুকুর খুব বন্ধুত্ব ছিলো। টুকু সেই মৌমাছিদের কাছে গিয়ে বললো, তোমরা তো জানো, কোথা থেকে এক শিয়াল এসে আমাদের রাজা সেজেছে। শিয়াল রাজার অত্যাচারে জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আমরা এখন ওকে এ বন থেকে তাড়াতে চাই। তোমরা কি কোনো সাহায্য করতে পারবে?

মৌমাছিরা বললো, পারবো। আমরা ওকে হুল ফুটিয়ে পাগল করে ছাড়বো। তবে সবুজ গ্রামের কুকুরদের সাহায্য পেলে কাজটা আরো সহজ হবে। তুমি কুকুরদের কাছে যাও।

অন্য বানরদের সঙ্গে কুকুরদের যেমন সম্পর্কই থাক, ছোট্ট বানর টুকুর সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভালো ছিলো। টুকু গিয়ে ওদের দুঃখের কথা জানালো কুকুরদের। সব শুনে কুকুররা বললো, একটুও ভেবো না। আজ রাতেই দুষ্টু শিয়ালটাকে বনছাড়া করবো। মৌমাছিদেরও তৈরি থাকতে বলো।

টুকু আবার সব কথা এসে জানালো মৌমাছিদের। বললো, আজ রাতেই কুকুররা আসবে। তোমরা হুল-টুল শানিয়ে তৈরি থেকো। এতো কিছু যে ঘটে যাচ্ছে, শিয়াল তার কিছুই জানতে পারেনি। তাই রাতে নিশ্চিন্ত মনে তার গর্তে ঘুমোতে গেলো সে। শুয়ে পড়ার পর সবে মাত্র বেচারার চোখ দুটো লেগে এসেছে, এমন সময় সবুজ গ্রামের কুকুররা ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলো ওকে। আর মৌমাছিরা চারদিক থেকে ঘিরে ধরে কুটুস কুটুস করে হুল ফুটাতে লাগলো।

শিয়াল তো এমন বিদঘুটে আক্রমনের জন্য একেবারেই তৈরি ছিলোনা। হুলের ব্যথা। আর কুকুরদের কামড় খেয়ে এতোটাই ঘাবড়ে গেলো সে যে, কোনো দিকে না তাকিয়ে এক দৌড়ে বলে গেলো বন ছেড়ে-আর ফিরে এলো না।

ছোট্ট বনের সবাই খুব খুশি হলো দুষ্টু শিয়ালের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে। আর এ কাজটা সাহস করে টুকু করেছে, তাই সবাই একমত হয়ে টুকুকে তাদের রাজা করে নিলো। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম এক বানর হলো বনের রাজা।