Category: গল্প
rumi-4.jpg
News Headings

খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Feb 4, 2009
Source: bdnews24.com
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
এনায়েত রসুল

ঘুপুর যে ঝোপের নিচে থাকে টুনু সেই ঝোপের ডালে থাকে। ঘুপু এক ব্যাঙ আর টুনু টুনটুনি পাখি। ঘুপু ঘ্যাগর ঘ্যাগর ডাকে আর টুনু টুনটুন করে কথা বলে। দুজনার ভাষা দুজনার বোঝার কথা নয়, তবে ওরা তো বোঝে। বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ইচ্ছে নিয়ে একজন অন্য জনার ভাষা শিখে নিয়েছে। এখন ঘুপু ঘ্যাগর ঘ্যাগর করে যা বলে, টুনু তা বোঝে। আবার টুনু টুনটুন করে যা বলে, ঘুপু তা বোঝে। এতে সুবিধা হয়েছে দুজনারই। অবসর সময়গুলো গল্প করে কাটাতে পারছে।

আজ সকালে চোখ মেলে প্রথম পাখা ঝাঁপটালো টুনু। তারপর তাকালো সূর্যের দিকে। সূর্যটা আজ তালগাছের মাথা ছুঁয়ে স্থির হয়ে আছে। তার মানে আজ ঘুম ভাঙতে অনেক দেরি হয়েছে টুনুর। তবে কি ঘুপু দাদা চলে গেছে? সরু ডালটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে টুনু তাকালো নিচের দিকে। দেখলো ঘুপু কোথাও যায়নি। চুপচাপ বসে আছে।

টুনু বললো, “সুপ্রভাত ঘুপু দাদা। ভালো আছো তো?”
ঘুপু বললো, “হ্যাঁ, ভালোই আছি। এই বুঝি ঘুম থেকে উঠলে? আমি কিন্তু অনেক আগে উঠেছি। সূর্য তখনো ভালো করে ওঠেনি।”
টুনু বললো, “তাই নাকি? অদ্ভূত ব্যাপার তো! দুজনাই উল্টো কাজ করেছি আজ।”

“কী রকম?”, কৌতূহলী দুটো চোখ তুলে ঘুপু তাকালো টুনুর দিকে।
টুনু বললো, “তুমি ব্যাঙ হয়েও আগে উঠেছো আর আমি পাখি হয়েও পরে উঠেছি উল্টো কাজ না? আল্লাহ জানেন দিনটা আজ কেমন যাবে।”
ঘুপু বললো, “দিন ভালোই যাবে। যারা কখনো অন্যের ক্ষতি করে না, তাদের দিন খারাপ যায় না। তুমি খুব ভালো পাখি।”
“তুমি ও খুব সুন্দর ব্যাঙ।”,বললো টুনু।

সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো ঘুপু, “মিথ্যে বলো না টুনু দিদি। আমি সুন্দর নই।”
টুনু বললো, “নিজেকে তো নিজে দেখা যায় না, তাই ও কথা বলছো। আসলে খুব মিষ্টি হাসি হাসি চেহারা তোমার।”
ঘুপু বললো, “শুধু তোমার চোখেই সুন্দর। কিন্তু কাল যখন পুকুরে সাঁতার কাটছিলাম তখন সাদা হাঁসটা কি বলেছো জানো?” বলেছে, “তুই যেমন ব্যাঙ তোর চেহারাটাও হয়েছে তেমন ব্যাঙের মতো।” কথাটা শুনে খুব দুঃখ পেয়েছি।
টুনু বললো, “ব্যাঙের চেহারা তো ব্যাঙের মতো হবেই। এটা টিপ্পনী কেটে বলার কি আছে! আসলে অন্যকে দুঃখ দিয়ে অনেকেই আনন্দ পায়। এটা ভালো কথা নয়।”
ঘুপু বললো, “ভালো যে নয় শুধু তা নয়, অমন বলা অন্যায়ও।”
টুনু বললো, “বাদ দাও তো ওদের কথা। আমি তোমার বন্ধু। আমার কাছে তোমাকে সুন্দর লাগে, তাই তুমি সুন্দর।”
ঘুপু বললো, “আসলে তোমার মন সুন্দর তাই আমি সুন্দর।”
টুনু বললো, “ঘুপু দাদা! আজ কি কোথাও যাবে? আমি আজ বের হবো না।”
ঘুঘু বললো, “আমিও বের হবো না। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। একটু বুকডন দেবো।”
টুনু বললো, “দরকার নেই বুকডন দিয়ে। এসো গল্প করি। জানো ঘুপু দাদা, একেক সময় তোমাকে দেখে হিংসে হয়।”
“কেন?”, ঘুপু তাকানো টুনুর দিকে।
টুনু বললো, “হিংসে করার কারণ আছে। কী ভাগ্যবান তুমি। থপ্‌ থপ্‌ করে লাফাতে পারো। তিড়িং বিড়িং করে ছুটতে পারো। গাছে উঠতে পারো তর তর করে। আবার সাঁতারও কাটতে পারো। ছোট্ট একটা প্রাণী, অথচ কতো গুণ তোমার!”
ঘুপু বললো, “গুণ তোমারও কম নেই দিদি। কী সুন্দর ডালে ডালে নেচে বেড়াও! কী মিষ্টি সুরে গান গাও! তোমার গান শুনে কলিরা পাপড়ি মেলে ফুল হয়ে যায়। সবার ঘুম ভাঙে। আর....”

“আর? আর কী বলো? বানিয়ে বানিয়ে শুধু প্রশংসাই করে যাচ্ছো। বন্ধু হয়েছো বলে বুঝি বানিয়ে বলতে হবে?”, মিটি মিটি হেসে বললো টুনু।
ঘুপু বললো, “একটুও বানিয়ে বলছি না। যা সত্য তাই বলছি। একটা গুণের কথা বাদ আছে, এবার সে কথাটা বলি, তুমি কী সহজ ভাবে হাওয়ায় ভেসে বেড়াও! যখন পাখা মেলে ওড়াউড়ি করো, আমি তখন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি। কী করে বাতাসে ভেসে বেড়াও দিদি?”
টুনু বললো, “তুমি যেভাবে পানিতে ভেসে বেড়াও, ঠিক সেভাবে।”
কথাটা শুনে উচ্ছল হাসিতে ভেঙে পড়লো ঘুপু। হাসতে হাসতে বললো, “কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছো ? আল্লাহ প্রায় সমান ক্ষমতা দিযে বানিয়েছেন তোমাকে আর আমাকে। তুমি ডালে ডালে লাফাতে পারো - আমি মাঠে ঘাটে লাফাতে পারি। তুমি মিষ্টি কণ্ঠে গাইতে পারো - আমি মোটা কণ্ঠে গাইতে পারি। তুমি আকাশে ভেসে বেড়াও-আমি ভেসে বেড়াই পানিতে।”

“ঠিক বলেছো। এই যে পাখি আর ব্যাঙের মিল, সুবিধা অসুবিধার সমতা-এ থেকে কিন্তু একটা কথা বোঝা যায়, আল্লাহ কাউকে কম আর কাউকে বেশি গুণ দেননি। যার যা দরকার তাই দিয়েছেন।”
খুব বুদ্ধিমানের মতো কথাটা বললো টুনু। একটু থেমে আবার বললো, “পাখির সাথে ব্যাঙের বন্ধুত্ব হয়, এমন কিন' হয়নি কখনো। হি.... হি.... হি....”

টুনু আর ঘুপুদের ঝোপের উল্টো দিকে একটা শিমুল গাছ। সেই গাছে বাসা বেঁধে থাকে একটা খয়েরি চিল। টুনুর হাসির শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেলো সেই চিলের। চোখ রগড়ে এদিক-ওদিক তাকালো সে। এক সময় ওর চোখ পড়লো টুনুর ওপর। দেখলো টুনু হাসছে আর ঘুপু হাত তালি দিয়ে নাচছে।

ঘুপুর সঙ্গে টুনুর বন্ধুত্বটাকে কখনো ভালো চোখে দেখেনি চিল। আজ আবার দুজন মিলে তন্দ্রাভেঙে দিয়েছে, তাই চিলের মেজাজটা সপ্তমে চড়ে গেলো। চিল বললো, “এই নোংরা ডোবার ব্যাঙ! সাতসকালে এমন চেঁচামেচি করছিস কেন?”
ঘুপু বললো, “চেঁচামেচি করছি না । একটু আনন্দ করছি।”
চিল বললো, “পরের ঘুম নষ্ট করে আনন্দ করা উচিত নয়, তা জানিস ?”
ঘুপু বললো, “ভালো করেই জানি। কিন' এতো বেলাতেও তুমি ঘুম থেকে ওঠোনি, তা জানতাম না।”
ঘুপু এমন করে কথাটা বললো যে, টুনু আর হাসি চেপে রাখতে পালো না। আবার কিট কিট করে হেসে উঠলো সে। আর সেই হাসি শুনে আবার মেজাজ বিগড়ে গেলো চিলের চিল বললো, দাঁড়া। ঠোকর মেরে তোদের দেশছাড়া করব।

চিল ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই টুনু চেঁচিয়ে বললো, “সাবধান চিল ভাইয়া। আমার বন্ধুর গায়ে হাত দেবেনা। তাহলে কিন্তু আমিও ছেড়ে কথা কইবো না।”
চিল ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলো। কিন্তু টুনুর কথায় থমকে গেলো সে। তারপর বললো, “ওই পচা ডোবার ব্যাঙটার জন্য তোর এতো মায়া কেনরে ?”
টুনু বললো, “ঘুপু আমার বন্ধু। বন্ধুর জন্য বন্ধুরতো মায়া লাগবেই।”
চিল ছ্যা ছ্যা করে উঠলো টুনুর কথা শুনে, “ওই ব্যাঙটা তোর বন্ধু ?”
“কী উদ্ভট রুচিরে তোর ! পাখি হয়ে বন্ধুত্ব করেছিস একটা ব্যাঙের সঙ্গে?”

টুনু বললো, “ব্যাঙের সঙ্গে নয়, আমি বন্ধুত্ব করেছি একটা সুন্দর মনের সঙ্গে।”
ঘুপু বললো, “আর আমি বন্ধুত্ব করেছি একটা মিষ্টি মনের সঙ্গে।”
“ব্যাঙে আর পাখিতে বন্ধুত্ব হয় ?”, বিস্ময় ঝরে পড়লো চিলের কণ্ঠে।
ঘুপু বললো, “হয় ভাই হয়। আসলে বন্ধুত্ব হয় মনের সঙ্গে- জাতের সঙ্গে নয়।”
“বুঝলাম না। বুঝিয়ে বল”, খুব আগ্রহ নিয়ে চিল নেমে বসলো ঝোপের কাছাকাছি ডালে।
ঘুপু বললো, “আসল কথা কি জানো ? বন্ধুত্ব করার জন্য কে ব্যাঙ আর কে পাখি, কে মানুষ আর কে ঘোড়া-ওটা কোনো সমস্যাই নয়। দুজনার মনের মিল থাকলেই হলো- বন্ধুত্ব হয়ে যায়। টুনু দিদির সঙ্গে আমার খুব মনের মিল। তাই আমরা দুজন বন্ধু।”
“বন্ধু হয়ে কি লাভ হয়েছে তোদের ?”, আবার কৌতূহল করে পড়লো চিলের কণ্ঠে।
ঘুপু বললো, “লাভ তো হয়েছেই। আমরা সুখ-দু:খের কথা বলে সময় কাটাতে পারছি। একজন অন্য জনার বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারছি। বন্ধুত্ব করার কারণে আমাদের জীবন দুটো অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।”
টুনু বললো, “এখন আমরা শুধু নিজের কথা ভাবিনা, ভাবি অন্যজনার কথা। দেখলে না, ঘুপু দাদার হয়ে তোমাকে কী রকম ধমকে দিলাম ? এটা করেছি শুধু ঘুপু দাদা আমার বন্ধু হয় বলে।”
“বন্ধুর জন্য তুই আমার মতো একটা বড়ো পাখিকে ধমক দিতে পারলি?”
“পারব না কেন? বন্ধুর জন্য বন্ধু জীবনও দিতে পারে”, পাখার ডগা দিয়ে বুক ঠুকে বললো টুনু।
আর সেই কথা শুনে বিস্ময়ে থির হয়ে গেলো চিলের চোখ দুটো চিল বললো, “কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুললে এতো লাভ?”
টুনু বললো, “সত্যিকারের বন্ধুত্ব গড়ে তুললে।”

চিল ভাবলো এক মুহুর্ত। তারপর বললো, “মনে করো অন্য কেউ তোদের বন্ধু হতে চাইলো। তোরা কি তাকে ফিরিয়ে দিবি?”
ঘুপু বললো, “বন্ধু হতে চাইলে আমরা কাউকে ফিরিয়ে দেবো না।”
চিল বললো, “তাহলে আমাকেও তোদের বন্ধু করে নে।”
টুনু বললো, “এতো খুব ভালো কথা। আমাদের বন্ধু হলে আমরাও খুব খুশি হোব। কিন্তু ...”
“কিন্তু কী?” দুরু দুরু বুক নিয়ে চিল তাকালো টুনুর দিকে।
টুনু বললো, “কিন্তু যাদের মনে হিংসে আছে, তারা কারো বন্ধু হতে পারে না। আমাদের বন্ধু হতে চাইলে তোমার মন থেকে হিংসে মুছে ফেলতে হবে।”
চিল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললো, “ওহ্‌ এই কথা ! হিংসে তো বাদ দেবই । বন্ধুর জন্যে বন্ধু জীবন দিতে পারে আর আমি হিংসে ভুলতে পারব না? অবশ্যই পারব।”
ঘুপু বললো, “খুব খুশি হলাম তোমার কথা শুনে। তোমার নাম আছে ?”
চিল বললো, না, কোনো নাম নেই।
ঘুপু বললো, “আমার নাম ঘুপু, দিদির নাম টুনু আর তোমার নাম চি। শুধু চি। পছন্দ হয়েছে?”
“খু-উ-ব পছন্দ হয়েছে। এখন থেকে আমিও তোদের বন্ধু হয়ে গেলাম।”
এ কথা বলে চিল এসে বসলো ঘুপু আর টুনুর পাশে। সঙ্গে সঙ্গে ওরা বন্ধু হয়ে গেলো।