Category: গল্প
News Headings
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Feb 4, 2009
Source: bdnews24.com
Source: bdnews24.com
হানাবাড়ির উন্মাদ
মূল : ইলেন এ. কিউল
অনুবাদ : অনীশ দাস অপু
এক
আমি মাইকেল ডেন, বয়স ১২, নিজেকে আমি পৃথিবীর সেরা ছাত্র বলে দাবি করি না। আমি এমনকী সেন্টারভিল জুনিয়র হাই স্কুলেরও সেরা ছাত্রটি নই। বরং আমি সেরা ছাত্রের প্রতিযোগিতার দৌড়ে অনেক পিছিয়ে আছি। অবশ্য ভালো ছাত্র হওয়ার জন্য সারা দিনরাত ঘাড় গুঁজে পড়াশোনা করতে আমার ভালোও লাগে না। আমার শিক্ষকরা মাঝেমধ্যে বলেন আমার মধ্যে নাকি সম্ভাবনা আছে। তবে যদি এরকম কথা শুনি, সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও তোমার নেই, তখন বড্ড রাগ হয়। আমি চিৎকার-চেঁচামেচি করে ঘর ফাটিয়ে ফেলি। আর আমার বাবা-মা যখন গতবারের রিপোর্ট কার্ড দেখলেন, তখন একই কাণ্ড করে বসলেন তাঁরা।
তোমরা হয়তো ভাবছ পড়াশোনার পেছনে প্রচুর আমার খাটনি করা উচিত। তাহলে কেউ আমাকে খোঁচা মেরে কথা বলার সুযোগ পাবে না। তবে আমার ব্যাখ্যাটা একটু অন্যরকম : পড়াশোনা তো সবসময়ই করা যাবে। অংক, বিজ্ঞান এবং ইতিহাস কখনোই পিছু ছাড়বে না। কিন্তু জেভি বাস্কেটবল খেলা, টিভিতে দারুণ কোন খেলা দেখা এসব সুযোগ তো আর বারবার আসে না। গত শুক্রবার আমাদের কোচ নেলসন বললেন আমার গ্রেড বাড়াতে হবে, নইলে দল থেকে বাদ পড়ে যাব। আর এমনটি হলে আমার বাবা-মা হয়তো আগামী ত্রিশ বছর আমার জন্য টিভি দেখাই বন্ধ করে দেবেন।
তবে একটা কাজ কখনও বাদ দেব না। তাহলো খবরের কাগজ বিলি করা। এটা আমার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন। বাবা প্রায়ই বলেন, পৃথিবীতে ফ্রি লাঞ্চ বলে কিছু নেই। কোনও কিছু কিনতে হলে ওটার জন্য তোমাকে পকেটের পয়সা খরচ করতে হবে এবং এ জন্য ইনকাম করা জরুরী। আমার চাহিদা অবশ্য খুব বেশি নয়- আমি বেসবল কার্ড জমাই, মাঝে মাঝে ফার্স্টফুড খাই (মা এসব খাবার কখনোই কিনে দিতে চান না), এ ছাড়া আরও ছোটখাট অনেক শখ আছে যেগুলো পূরণের জন্য পয়সাপাতি লাগে। তাই আমি প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগে ঘুম থেকে জাগি। সেন্টারভিলের বাসিন্দাদের বাড়িতে ভোরের কাগজ পৌঁছে দিতে বাই-সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়।
গতকাল সকালে আমার কাগজ সরবরাহের তালিকায় যোগ হয়েছে একটি নতুন নাম : অ্যাবনার হিকস। এ নামটা আগে কখনও শুনিনি। তবে ২০০, মেইন স্ট্রীটের ঠিকানাটা চেনা চেনা লাগছিল। এটা কি সেই ভুতুড়ে জায়গাটা যেখানে ভুলেও কেউ পা মাড়ায় না? ধ্যাত, ওরকম পরিত্যক্ত একটা বাড়িতে কে বাস করতে যাবে?
সাইকেলে লাফ মেরে উঠে পড়লাম আমি। বনবন করে প্যাডেল চাপতে লাগলাম। শুরু হয়ে গেছে আমার কাজ। কিন' শেষ স্টপেজে পৌঁছে ধক্ করে উঠল বুক। আরি, সেই বাড়িটাই তো। প্রাচীন, করুণ ম্লান চেহারার বাড়িটি। রং জ্বলে গেছে। সামনের উঠোনে এক হাত লম্বা আগাছা।
মেইন স্ট্রীটের একদম শেষ মাথায় বাড়িটি। শিশু-কিশোরদের ধারণা এটা হানা বাড়ি। আমিও ওদের দলে। বিলি স্মিথের বাবা একবার আমাদের নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছিল প্রমাণ করতে যে আমরা খামোকাই ভয় পাচ্ছি। সেদিন অবশ্য কিছুই ঘটেনি। তবে আমার মনের খচখচানি দূর হয়নি তাতে। দিনের বেলা তো আর ভূত দেখা যায় না। বিশেষ করে মি. স্মিথের মত মানুষ সঙ্গে থাকলে ভূতের বাপও ধারে কাছে ঘেঁষার সাহস পাবে না। লোকটা প্রায় সাত ফুট লম্বা। বেশ আমুদে স্বভাবের। তবে তুমি শয়তানের চেলা হলেও এই দৈত্যের সঙ্গে নিশ্চয় লাগতে যাবে না।
আমি বলছি না যে ভুতুড়ে বাড়ি-টাড়িতে আমার বিশ্বাস আছে। আমি ২০০, মেইন স্ট্রীটের সামনে এসে খবরের কাগজটা হাতের মধ্যে পাকিয়ে ভাঙাচোরা বারান্দায় ছুড়তে যাচ্ছি, থেমে গেলাম মাঝ পথে। জীর্ণ-শীর্ণ একটি দোলনা চেয়ারে বসে রয়েছে ধূসর চুলের, লম্বা দাড়িঅলা এক লোক। সন্দেহ নেই এই-ই অ্যাবনার হিকস।
গুড মর্নিং, মাইকেল, বলল সে।
জমে গেলাম আমি। আমার নাম জানে বলে নয়, নিউজ পেপারের সাবস্ক্রিপশন বিভাগের লোকেরা তাকে হয়তো আমার নামটা বলেছে। আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার কারণ লোকটার কণ্ঠ। এরকম ভয়ংকর, ঘ্যাসঘেসে গলা জীবনে শুনিনি। আমি প্রচুর হরর ছবি দেখেছি। এ লোকের কণ্ঠ সেসব ছবিকে ছাপিয়ে গেছে। ছবি দেখা এক জিনিস আর সেরকম ভীতিকর কারও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক জিনিস। এখান থেকে কেটে পড়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন' অ্যাবনারের পরের কথাটা আমাকে আঁঠার মত আটকে রাখল নিজের জায়গায়।
স্কুল নিয়ে খুব ঝামেলায় আছ, না? খুবই লজ্জার কথা। জ্ঞানই শক্তি। এ কথা ভুললে চলবে না।
এমন অবাক হয়েছি, মুখের জবান গেছে বন্ধ হয়ে। আমি যে স্কুলে খারাপ রেজাল্ট করছি এ লোক তা জানল কী করে? আমি বিষয়টি জিজ্ঞেস করব ভাবছি, এমন সময় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল অ্যাবনার, খুলল সামনের দরজা, ঢুকে গেল ভেতরে। তার হাতে একটা খবরের কাগজ। হঠাৎ মনে পড়ল, আরি, আমি তো লোকটাকে এখনও কাগজ দিইনি। তাহলে সে কাগজ পেল কোত্থেকে? আর কিছু ভাবতে চাইলাম না। যত দ্রুত সম্ভব প্যাডেল মেরে রওনা হয়ে গেলাম স্কুলে। দীর্ঘদিন পরে, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, স্কুলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
তবে সেদিন আরও অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
যারা অংক পারে না তাদের জন্য এ বিষয়টি মূর্তিমান আতংক। মিস রেনল্ডসকে বললাম হোমওয়ার্ক আনতে ভুলে গেছি। তিনি কান লাল হয়ে যাওয়া এমন সব মন্তব্য করলেন, কয়েকটা ছেলে হো হো করে হেসে উঠল। ক্লাসের সবার সামনে কাউকে অপমান করা শিক্ষকদের কখনোই উচিত নয়। ক্লাসের সবার উচিত হতভাগ্য ছাত্রটির জন্য সমবেদনা জানানো। নইলে ছাত্রটি আরও বেশি শরমিন্দা হয়। কোচ নেলসন যখন প্রাকটিসের সময় কোনও ছাত্রকে বকাবকি করেন নিশ্চিত একটি শট মিস করার জন্য, আমি ওই ছাত্রটিকে নিয়ে কখনো হাসাহাসি করি না।
মি. বেনটন ইতিহাস ক্লাসে একটা কুইজ দিয়েছিলেন। পড়া শিখে আসতে বলেছিলেন। মুশকিল হলো আমি ইতিহাস বইটি লকারে ফেলে এসেছি। একটা অধ্যায়ের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ার ইচ্ছেও তেমন করছিল না। আর কুইজটা হলো রচনামূলক প্রশ্নের মত। মাল্টিপল চয়েসের মত প্রশ্ন নয়।
প্রথম প্রশ্নটি দেখেই আমার ঘাম ছুটতে শুরু করল। যে জিনিস সম্পর্কে কিছুই জানি না তা জানার ভান করা মোটেই সহজ কাজ নয়। আর মি. বেনটনকে বোকা বানানোর চিন্তা করাটাই বোকামী। ইতিহাসের ব্যাপারে এই লোককে বলা চলে চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও কঠিন। আমি কীভাবে জবাব লিখব ভেবে মনে মনে মাথা কুটে মরছি, এমন সময় হলওয়েতে চোখ তুলে চাইতেই বেদম চমকে গেলাম। অন্ধকার কোনে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। অ্যাবনার হিকস। মুখে অদ্ভুত হাসি এঁটে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। এ লোক এখানে কী করছে? শিউরে উঠলাম। লোকটাকে দেখলেই ভয় লাগে।
আজ সারাদিন খুব খাটনি গেছে। তাই ক্লান্ত লাগছিল। ক্লাস রুমের দেয়ালগুলো যেন চেপে আসছিল চারদিক থেকে। তাজা বাতাসে নিশ্বাস নিতে হাঁকপাক করছিল বুক। কিন্তু দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে অ্যাবনার। কার জন্য অপেক্ষা করছে? আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। প্রায় শূন্য খাতা জমা দিলাম ইতিহাসের শিক্ষকের কাছে, ফিরে এলাম নিজের ডেস্কে। বসলাম। হাত দিয়ে চেপে ধরলাম মাথা। মাথাটা বেশ ব্যথা করছে।
খানিক পরে শুনলাম যেন মি. বেনটন আমার লেখার তারিফ করছেন। হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। চেয়ার থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। কেন জানি না, চোখ চলে গেল করিডরে। খালি। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম-হঠাৎ খিকখিক ভয়াল একটা হাসি ভেসে এল কানে। অ্যাবনার, কোনও সন্দেহ নেই। সে যেভাবেই হোক আমার খাতার লেখা বদলে দিয়েছে। কিন্তু কীভাবে? এবং কেন?
ঢং ঢং শব্দে ঘণ্টা পড়ল। আমার চিন্তার সুতোটা ছিড়ে গেল। চমৎকার লিখেছ, মাইকেল, শুনলাম বলছেন ইতিহাসের শিক্ষক। যেসব ছাত্র জীবনেও আমার দিকে ফিরে তাকায়নি তারাও আমার দিকে ফিরে মৃদু হাসল, প্রশংসার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। এদের মধ্যে ট্রেসি স্কটও রয়েছে, আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্রী। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বেশ ভালো লাগছিল আমার। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য অ্যাবনার হিকসের চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করে দিতে পারলাম।
তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়।
দুই
আমার খুব ঘনিষ্ঠ কোনও বন্ধু নেই। ছিল একজন। ল্যারি অ্যান্ড্রুজ। গত বছর নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে অন্য শহরে চলে গেছে ওরা। চাকরি, স্কুল এবং খেলাধুলা নিয়ে কেটে যাচ্ছে আমার ব্যস্ত সময়। খেলার টিমের সবার সঙ্গেই আমার বেশ ভালো একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। তবে ল্যারির মত মধুর সম্পর্ক নেই কারও সঙ্গে। ও ছিল আমার ভাইয়ের মতো। আমরা প্রায়ই দুজনে ফোনে কথা বলতাম। ও আমাদের পাশের বাসাতেই থাকত।
ল্যারিদের বাড়িটি যারা কিনে নিয়েছে সে পরিবারটি মন্দ নয়। যদিও ও বাড়ির মেয়ে কারার প্রতি আমি খুব একটা আকর্ষণ বোধ করি না। ওর বয়স এগার, এমন ভাব দেখায় যেন সবজান্তা শমসের। এরকম মেয়েরা কেমন হয় জানোই তো : এদেরকে সব জায়গায় দেখতে পাবে তুমি। বিরক্তিকর। আমি সেদিন সাইকেল নিয়ে ফিরছি, ঝট্ করে খুলে গেল কারাদের বাড়ির দরজা। বেরিয়ে এল ও। যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
করে তো ফেলেছই, আমি দ্রুত গ্যারেজে ঢোকালাম সাইকেল। কেটে পড়তে চাইছি তাড়াতাড়ি। আমার কাছে যে জিনিসটা সবচেয়ে বিরক্তিকর ঠেকে তা হলো লোকের প্রশ্নের জবাব দেয়া। তাছাড়া কারার সময় নির্বাচন ভুল হয়ে গেছে। আমার প্রিয় টিভি শো শুরু হয়ে যাবে যে কোনও মুহূর্তে।
যা বলার জলদি বলো, তাড়া লাগালাম আমি।
সেদিন কয়েকটা ছেলে বলল এখানে নাকি একটা হানাবাড়ি আছে। ভাবছিলাম ঠাট্টা করছে। কিন্তু চেহারা দেখে মনে হলো খুব সিরিয়াস।
হানা বাড়িটাড়িতে তুমি বিশ্বাস করো নাকি? প্রায় ঘেউ করে উঠলাম আমি। আমার স্মৃতিতে ভিড় করল অ্যাবনারের চেহারা- বারান্দায়, হলওয়েতে। এ চেহারাটা আমি ভুলে থাকতে চাই। কারাকেও কাছে ঘেঁষার সুযোগ দিতে চাই না।
তোমার কী হয়েছে? মনে হচ্ছে যেন ভূত দেখেছ।
আমি বড্ড ক্লান্ত। এবং ক্ষুধার্ত। এসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দাও গে।
এমন সময় মা উঁকি দিলেন দরজা দিয়ে। অ্যাই তোমরা ভেতরে এসো। তোমাদের জন্য কোকো বানিয়েছি।
কারা আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে হাসল।
আমি আজ বিকেলটা তোমাদের বাসায় থাকব। মা বেথকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে। বেথ কারার ছোট বোন। বয়স চার।
আমার খুব রাগ হলো। কিন্তু এখন রাগ দেখানো যাবে না। সারাটা দিন কারার সঙ্গে থাকা! উফ্, কল্পনাই করা যায় না। কোথায় ভাবলাম মজা করে টিভি দেখব। এখন মার জন্য এমন একজনের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলতে হবে যাকে এ মুহূর্তে আমার অসহ্য ঠেকছে।
কোকো খুব গরম, ঠোঁটে ছোঁয়ানো যায় না। নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। বরদাশত করবেন না মা। কারণ ঘরে অতিথি রেখে নিজের ঘরে বসে কোকো পান মার কাছে চরম অভদ্রতা। মা হয়তো আমাকে বকাঝকা করবেন। আমিও মাকে বলব কারাকে তো আর আমি দাওয়াত দিয়ে বাসায় নিয়ে আসিনি। তবে এসব কিছুই ঘটল না। কারণ পুরোটাই আমি কল্পনা করছিলাম।
যা হোক, বসে রইলাম আমি এবং শুনতে হলো কারা গর্ব করে বলছে কোন্ কোন্ বিষয়ে সে A পেয়েছে এবং Excellent পেয়েছে। কারা অবশ্য প্রচুর পড়াশোনা করে। আমার তো মনে হয় পড়ালেখা ছাড়া ও আর কিছুই করে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম ও আমার ইতিহাসের খাতার দিকে তাকিয়ে আছে। খাতাটা আমি নোটবুকে ঢুকিয়ে রেখেছি।
আমি ইতিহাসে এবারে A-Plus পেয়েছি, বললাম আমি। মা, সিঙ্কে একটা প্লেট ধুচ্ছিলেন, ঝট করে ঘুরলেন, মাইকেল, এমন খুশির খবর তুই আগে দিসনি কেন?
কারণ এতে আমার কোনও কৃতিত্ব নেই, মনে মনে বললাম আমি। যা ঘটেছে তার ব্যাখ্যা কী? আমি যদি পরীক্ষার পড়া পড়তামও তবু কি এত ভালো করতে পারতাম? উঁহু, পারতাম না। মা এখন থেকে আশা করবেন আমি সব বিষয়ে এরকম নাম্বার পাব। কিন' সেটা আর কখনও ঘটবে না। কারার ওপর খুব রাগ হচ্ছে আমার। ও ফরফর করে নিজের রেজাল্টের কথা বলতে গেল কেন? আর নিজেকে লাথি মারতে ইচ্ছে করল পরীক্ষার খাতাটা লুকিয়ে রাখিনি বলে। অবশ্য ওটাকে এখুনি ছিড়ে ফেলার ইচ্ছে আমার নেই। আগে পড়ব ওতে কী লেখা আছে।
মা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হাসিতে উজ্জ্বল মুখ। বাড়িয়ে দিয়েছেন হাত খাতা দেখার জন্য। আমি নোটবুক থেকে বের করলাম খাতা। অচেনা হাতের লেখা খাতায়। আমার লেখা নয়। তবে লেখাটা পড়া গেল না মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন বলে। খাতায় লেখা মন্তব্যে মার চোখ আটকে গেল।
জ্ঞানই শক্তি। A.H। ঠিকই লিখেছে। কিন্তু এই A.H টা কে?
আমি বিড়বিড় করে বললাম এ নামে নতুন একজন এসেছে স্কুলে। কথাটা কিন্তু পুরোপুরি মিথ্যা নয়।
পাজির পা ঝাড়া কারা গলা বাড়িয়ে খাতা দেখল। এটা কী রকম হাতের লেখা? যেন মধ্যযুগের কেউ লিখে দিয়েছে।
ধরে নাও এটা একটা জোক, আমি মার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিলাম খাতা। তারপর সিড়ি বেয়ে এক ছুটে দোতলায়, আমার ঘরে। বন্ধ করে দিলাম দরজা। তাকালাম আয়নায়। কারা ঠিকই বলেছে। আমাকে বিধ্বস্ত এবং ভীত দেখাচ্ছে। আমি তো সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম।
বিছানায় বসলাম। একা ঘরে স্বস্তি লাগছে। চোখ বুলালাম চারপাশে। ঘর যেমন রেখে গিয়েছিলাম তেমনই আছে। কিন্তু আমার মনটা ঠিক নেই। এরকম অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি জীবনে হইনি কোনদিন। পুরো ব্যাপারটা এখনও মাথায় ঢুকছে না। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার কেউ নেই।
দরজায় নক্ হওয়ার শব্দে লাফিয়ে উঠলাম। মা।
কী হয়েছে রে, মাইকেল?
কিছু হয়নি, মা। খুব ক্লান্ত লাগছে। একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম।
ঠিক আছে। রেস্ট নে। কিছু দরকার হলে জানাস।
আচ্ছা, পরীক্ষায় ভালো মার্কস পেলে কতকিছু থেকে সহজে উতরে আসা যায়। অন্য দিন হলে মা এত সহজে আমাকে ছাড়তেন না।
এ কথা সত্যি খুবই ক্লান্ত লাগছে শরীর। আমি বোধহয় বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে দেখি রাত নেমে গেছে। টেবিলে রাখা ঘড়িতে তাকালাম। রাত তিনটে বাজে! বাপরে, কুম্ভকর্ণের ঘুম বোধহয় একেই বলে।
খিদেয় চোঁ চোঁ করছে পেট। প্রায় নিশব্দে মুখ হাত ধুয়ে নিলাম যাতে কারও ঘুম না ভাঙে। মস্ত এক বাটি দুধ এবং সিরিয়াল নিলাম। আর বিছানায় যেতে ইচ্ছে করল না। তারচেয়ে আজ বরং একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি। খবরের কাগজগুলো দিয়ে আসি। এত সকালে কাগজ বিলি করতে চাওয়ার কারণ আমি অ্যাবনারের মুখোমুখি হতে চাই না। ওই লোকের এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই বলেই আমার ধারণা।
কাগজ বিলি করার জায়গায় আজ ভোরে সবার আগে পৌঁছালাম। আমার বাড়ি ফেরার রাস্তার উল্টো দিকে হলেও ২০০, মেইন স্ট্রীটে গেলাম। অ্যাবনারের চিহ্ন নেই। একটা খবরের কাগজ ছুঁড়ে দিলাম লোকটার বাড়ির সামনের বারান্দা লক্ষ্য করে। ওটা ঠিক জায়গায় পড়ল কিনা ফিরে দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না। চেপে রাখা গভীর একটা দম ফেললাম সশব্দে। বুদ্ধিটা মন্দ ছিল না আমার। নিজেই নিজেকে বাহবা দিলাম। মন বলছে আজ দিনটা ভালো যাবে আমার।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে উবে গেল খুশি। গত রাতে হোমওয়ার্ক না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। আতংক বোধ করলাম। ইংরেজি একটা রচনা লিখতে হবে, ১০টা অংক করা বাকি, বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের জন্য খসড়াও তৈরি করা হয়নি-এ বিষয়গুলো নিয়ে তো একদমই ভাবিনি। একটি হোমওয়ার্কও বাদ দেয়া যাবে না। এদিকে কাগজগুলোও বিলি করতে হবে।
আমাদের ইংরেজির শিক্ষয়িত্রী মিস ফ্রাংকলিন খুবই কড়া। ক্লাসে ঢুকে দেখি ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের হোমওয়ার্কের খাতা মিসের টেবিলের একটি ঝুড়িতে রেখে দিয়েছে। আমি মানসিক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে মিস ফ্রাংকলিনের কাছে গেলাম। বললাম অসুস্থ ছিলাম বলে রচনাটা লিখতে পারিনি।
মানে! অবাক হলেন মিস ফ্রাংকলিন। তোমার রচনাটা তো সবার ওপরে রেখেছ দেখছি।
নিজের চোখকে বিশ্বাস হলো না। আমারই হাতের লেখা, ঝরঝরে ভাষায় রচনাটি কেউ খাতায় লিখে রেখেছে। টের পেলাম টকটকে লাল হয়ে যাচ্ছে আমার মুখ। কারণ মিস ফ্রাংকলিন বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন আমার দিকে। মাইকেল, কী হয়েছে? তুমি কি কিছু বলবে আমাকে?
আমি পিছিয়ে যেতে লাগলাম নিজের ডেস্কের দিকে যেন যত দূরে যেতে পারব, বিব্রতকর এ পরিস্থিতি থেকে ততই রক্ষা পাব। আ:, না, না। আমি ঠিক আছি। বোধহয় ভুলেই গেছিলাম যে রচনাটা লিখেছি। অসুস্থ হওয়ার আগে আসলে রচনাটা লিখে রেখেছিলাম।
আমার বিড়বিড়ানি বোধহয় কেউ শুনতে পায়নি। নিজেকে আমার হতবুদ্ধি এবং নির্বোধ মনে হচ্ছিল।
তবে ঘটনার শেষ এখানেই নয়। আমার অংকও কেউ কষে রেখেছে। বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের খসড়াও তাই। খেলার মাঠে প্রাকটিস শেষে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফিরছি, ভাবছিলাম কোন্ দেবদূত এসে আমার কাজগুলো করে দিয়ে গেল? অবশ্য কেউ করে দিতেও পারে। কারণ আমি তো ছেলে মন্দ নই। আমাকে দেবদূতরা পছন্দ করতেই পারে।
আমি সাধারণত স্কুল ছুটির পরে শটকার্ট একটা রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরি। এ রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। আমার বাবা-মাও জানেন না আমি শটকার্ট মেরে দিই। তবে নির্জন এ রাস্তায় ঢুকে আমার সাইকেলের গতি বেড়ে গেল। সূর্য ডুবছে। আর আঁধার ঘনাবার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা কেমন ভুতুড়ে হয়ে ওঠে।
সাইকেলের সামনের চাকায় ছেড়া এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে গেছে। ব্রেক কষলাম। টুকরোটা ফেলে দিতে সামনে ঝুঁকলাম। এমন সময় চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলাম গাছের পেছনে কেউ নড়ে উঠল। লোকটাকে দেখামাত্র পাঁজরের গায়ে দমাদম বাড়ি খেতে লাগল হৃৎপিণ্ড।
দুঃখিত, আজ সকালে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। হোমওয়ার্ক করতে প্রচুর সময় দরকার। এমনকী আমারও অনেক সময় লেগে যায়। তবে আশা করি, তোমার শিক্ষকরা তোমার হোমওয়ার্ক দেখে খুশিই হয়েছেন।
অস্বীকার করব না ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিল বুক। তবে অ্যাবনারকে বুঝতে দিলাম না ভয় পেয়েছি। আমি বুড়ো লোকটার চোখে চোখ রাখলাম। আপনি কে এবং কী চান? আপনি আমার হোমওয়ার্কগুলো কেন করে দিচ্ছেন? সেন্টারভিলে বাচ্চার তো অভাব নেই। কিন্তু আমি কেন?
খিকখিক হাসল লোকটা- করিডরে ঠিক এরকম বিশ্রী হাসির শব্দ শুনেছিলাম আমি। গায়ে কাঁটা দিল।
তোমার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় হয়নি আমার। তবে তুমি বোধহয় আমার নাম জান। আমি অ্যাবনার হিকস। এটা তোমার প্রথম প্রশ্নের জবাব। আর আমি কী চাই তা যথাসময়ে জানতে পারবে, খোকা। যথা সময়ে।
অদৃশ্য হয়ে গেল সে। সেই সঙ্গে আমার লোক দেখানো সাহসও। ভয়ের চোটে এমন কাঁপুনি উঠে গিয়েছিল শরীরে, সাইকেলেই চড়তে পারছিলাম না। প্যাডেল মেরে বাড়ি ফিরছি, মসি-ষ্কে বারবার ধাক্কা দিল অ্যাবনারের উন্মাদ হাসি।
তিন
বেদম হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরলাম। কারা ওর বেডরুমের জানালা দিয়ে উঁকি দিল।
কী ব্যাপার এমন হাঁপাচ্ছ কেন? তোমার হ্যা হ্যা শব্দে আমি পড়ায় মন দিতে পারছি না। বুড়োদের মত তুমি হাঁপাচ্ছ, মাইকেল।
ওরকম ভয়ানক একটা লোককে দেখলে প্রাণের দায়ে সাইকেল ছুটিয়ে এলে তুমিও কম হাঁপাতে না, মনে মনে বললাম আমি। ল্যারির কথা মনে পড়ে গেল আমার। এ মুহূর্তে ওকে খুব দরকার ছিল। ল্যারি থাকলে বিষয়টি নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলা যেত। মা-বাবা বলেছেন খুব বেশি প্রয়োজন হলে ল্যারিকে ফোন করতে পারি। ওকে ফোন করা খুবই দরকার।
প্রথম রিংয়েই সাড়া দিল ল্যারি। ওর গলা শুনে স্বস্তির ফল্গুধারা বইল শরীরে।
ল্যারি, আমি।
মিকি, কেমন আছ তুমি?
ভালো। তুমি?
চলছে একরকম। কথা বলার সময় হবে?
তোমার জন্য আমার সময় অফুরান। বলে ফেলো।
এই হলো ল্যারি। যখনই দরকার, কাছে পাওয়া যায় ওকে। দূরে থাকলেও ছুটে আসে। অ্যাবনারের কথা বললাম ওকে, অদ্ভুতুড়ে যেসব ঘটনা ঘটছে তার বিশদ বর্ণনা দিলাম। একটা কথাও অবিশ্বাস করল না ল্যারি। এই হলো ল্যারি।
তো তুমি এখন কী করতে বলো? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
আমার মনে হয় তোমার সাবধানে থাকা উচিত। লোকটা নির্ঘাত পাগল। তুমি বরং অন্য কোনও কাজের ধান্ধা খোঁজো।
ভুলে যাচ্ছ কেন যে এটা সেন্টারভিল। আর আমার বয়স মাত্র ১২। শিশু শ্রম আইন বলেও একটা জিনিস আছে, তুমি জানো।
বেবি সিটিং-এর চেষ্টা করে দেখতে পার।
বেবী সিটিং-এর কাজ একবারই জীবনে করেছিলাম আমি। বছর দুই আগে। জেঙ্কিন ভাইদেও বেবি সিটার হয়েছিলাম, ওদের একজনের বয়স তিন অপরজন পাঁচ। ওরা এমন দুষ্টু, ঘরদোর ভেঙে ফেলার জো করেছিল। তারপর আমার ওপর হামলে পড়ে। আমি দ্রুত ল্যারিকে ফোন করি আমাকে এ বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য। ল্যারি সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। বাচ্চা দুটোকে ভিডিওর সামনে বসিয়ে দেয়। দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে মিসেস জেঙ্কিনস বাড়ি ফিরে দেখেন তাঁর পুত্রধনরা টিভির সামনে বসে ঘুমাচ্ছে। তিনি খুশি হয়ে আমাদেরকে বকশিস দিয়েছিলেন। মিসেস জেঙ্কিনসের সুপারিশেই বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ পৌঁছে দেয়ার কাজটা আমি পেয়ে যাই।
শুনতে পেলাম লন্ড্রি রুম থেকে মা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। ল্যারির সঙ্গে আর কথা বলা যাবে না। তাই বললাম, হেই, লার, এখন ছাড়ছি। আবার পরে কথা হবে, কেমন?
শিওর। ফোন করেছ বলে খুশি হয়েছি। যা বললাম মস্তিস্কে গেঁথে রেখো। আর আমাকে সব খবর জানিয়ো।
দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে দিলাম রিসিভার। ফিরে এলাম নিজের ঘরে। ল্যারির সঙ্গে কথা বলে ভাল্লাগছে। তবে অ্যাবনারের সঙ্গে আমার একটা বোঝাপড়া করতে হবে। তোমরা হয়তো ভাবছ বাবা-মাকে ব্যাপারটা জানালেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু বলতে গেলে নিজেই ফেঁসে যাব। বাবা-মা জেনে যাবেন আমি স্কুলের হোমওয়ার্ক ফাঁকি দিচ্ছি। আর কেউ জাদুশক্তি দিয়ে আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো করে দিচ্ছে, এ কথা যদি বড়দের কাউকে বলতে যাই, নির্ঘাত আমাকে পাগল ঠাউরে বসবে। সোজা নিয়ে যাবে মনোবিজ্ঞানীর কাছে। নাহ্, আমার সমস্যার সমাধান আমার নিজেকেই করতে হবে।
মা হাঁক ছাড়লেন। মাইকেল, কারা এসেছে।
আমি গুঙিয়ে উঠলাম। তবে সাড়া দিলাম, আসছি এখুনি। এখন আবার ও কী চায়?
কারা আধিভৌতিক বিষয় নিয়ে একটি নোট তৈরি করছে। সে আমার সঙ্গে ওই হানা বাড়িটিতে যেতে চাইছে। এমনকী ঠিকানা পর্যন্ত লিখে নিয়েছে।
কারা এমনভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল যেন আমি তার বড় ভাই জাতীয় কিছু। কারার বড় ভাই হওয়ার বিন্দুমাত্র খায়েশ আমার নেই। আমি ওকে বলতে যাচ্ছিলাম সেন্টারভিলে কোনও হানা বাড়ি নেই, ২০০ মেইন স্ট্রীটের ঠিকানায় কোন ভূত বাস করে না। ওখানে এখন মানুষ থাকে। হঠাৎ বুদ্ধি এল মাথায়। আমার একজন সাক্ষী দরকার। কারাকে দিয়ে সাক্ষীর কাজটা চালিয়ে নেয়া যায়। অ্যাবনারের বুজরুকিগুলো ও নিজের চোখে দেখুক।
কারা চোখে মুখে নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, ২০০ মেইন স্ট্রীটে আমাকে কবে নিয়ে যাবে? এবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে?
ঠিক আছে, রাজি হয়ে গেলাম আমি। রোববার চলো। সকাল এগারোটার দিকে।
খুশিতে উদ্ভাসিত হলো কারা। সত্যি বলছ? ওহ্, অনেক ধন্যবাদ!
লাফাতে লাফাতে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল কারা। আমি নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম কাজটা কি ঠিক হলো? অ্যাবনার যদি সত্যি শয়তান প্রকৃতির লোক হয়ে থাকে তাহলে? কারার কোনও সমস্যা হলে সে দায়ভার তো আমার ওপর বর্তাবে। অবশ্য কারা একরকম বাধ্য করেছে আমাকে ওখানে নিয়ে যেতে। মাঝে মাঝে দুএকটা ঝুঁকি নিতেই হয়।
আরেকটা চিন্তা মাথায় এল। কারা তো সুপার ন্যাচারাল বিষয় নিয়ে কাজ করছে। অ্যাবনার হিকসকে আমার সাধারণ কোনও মানুষ বলে মনে হয়নি। ও আসলে কে জানতে পারলে মন্দ হয় না। সাধারণ মানুষের চেহারা অ্যাবনারের মত নয়, তারা তার মত ঢঙে কথাও বলে না, চলাফেরাও করে না। এ এমন এক টাইপের মানুষ যার সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানি না। এ লোক সম্পর্কে যত বেশি জানতে পারব ততই লাভ। আমি অবশ্য লোকের ওপর নজরদারিতে তেমন পটু নই, লোকের পিছু লেগে থাকতেও চাই না। তবে এ লোকের কথা আলাদা। এ বড্ড বেশি আমার সম্পর্কে জেনে ফেলেছে।
ল্যারির পরামর্শ মাফিক কাজ করব সিদ্ধান্ত নিলাম। অন্তত খানিকটা হলেও। আমি অ্যাবনারের ভয়ে খবরের কাগজ ডেলিভারির কাজটা ছাড়তে চাই না। বরং আমার বস মিসেস স্মিথকে বলব অন্য কাউকে ২০০ মেইনের ঠিকানায় কাগজ দিতে। বুদ্ধিটা খারাপ না, কী বলো?
কিন্তু অ্যাবনার হিকস সম্পর্কে কম্পিউটারে কোনও তথ্য পেলেন না মিসেস স্মিথ। ওই ঠিকানায় কোন গ্রাহকের নামও নেই।
২০০ মেইন স্ট্রীটের বাড়িটা না পরিত্যক্ত? জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ওখানে কেউ থাকে না বলেই জানি।
জ্বী। ঠিকই শুনেছেন। কোথাও বোধহয় একটা ভুল হয়ে গেছে। সরি। মিসেস স্মিথ আমাকে এ বিষয়ে আর কোনও প্রশ্ন করার আগেই রেখে দিলাম ফোন।
পরদিন সকালে আর ওদিকে যেতে হবে না, অ্যাবনারকে দেখার ভয়ও থাকবে না, এ ভাবনা স্বস্তি এনে দিল মনে।
স্কুলে অংক ক্লাস। অংকের খাতাটা আমার কাছে ফেরত এল। কোনও ভুল নেই। এখন আর অবাক হলাম না। মিস রেনল্ডস ব্লাকবোর্ডে একটা অংকের সমস্যা লিখে ওটার সমাধান করার জন্য আমাকে আহ্বান করলেন। জানি না হঠাৎ করে তিনি আমাকে আদর্শ ছাত্র ঠাউরে নিয়েছেন কিনা নাকি আমার নির্ভুল অংক খাতা দেখে তার মনে সন্দেহ জেগেছে আদৌ ওগুলো আমি করেছি কিনা।
চেয়ার ছাড়লাম আমি, ধীর পায়ে হেঁটে গেলাম বোর্ডে। মনে মনে ভাবছিলাম এখন যদি পালিয়ে যাওয়া যেত। চকটা হাতে নিলাম, খুক খুক কেশে পরিষ্কার করে নিলাম গলা। কাশতেই থাকলাম। যদি আমার কাশির দমক দেখে এ যাত্রা রেহাই দেন মিস রেনল্ডস।
পানি খাবে, মাইকেল?
মিস রেনল্ডসের দিকে চোখ তুলে চাইতে সাহস হলো না। আমার অভিনয় তিনি ধরে ফেলেছেন কিনা তাও বুঝতে পারছি না। আমি মাথা ঝাঁকালাম, প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। মিস রেনল্ডস আরেক ছাত্রকে ডাকলেন অংকটির সমস্যার সমাধানের জন্য।
ভয়াবহ টেনশন থেকে রক্ষা পেয়ে ঠাণ্ডা, নির্জন হলওয়েটা স্বর্গের মত লাগল। পানি খাওয়ার জন্য পানির কলের দিকে পা বাড়ালাম। ঝুঁকে পানির ট্যাপের নবে মোচড় দিলাম। পেছন থেকে ভেসে এল অ্যাবনার হিকসের কণ্ঠ।
তুমি ওখান থেকে চলে না এলেও পারতে।
পাঁই করে ঘুরলাম আমি।
আপনি এখানে কী করছেন?
উনি তোমাকে আবার ডাকবেন। মিস রেনল্ডস বুঝতে পেরেছেন তুমি কিছু একটা লুকোচুরি করছ। আমরা তিনজনেই জানি ওই অংক করা তোমার কম্ম নয়।
আপনি চলে যান, কণ্ঠে হুমকি ফোটানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।
আমার বরং এখানেই থাকা উচিত তোমাকে সাহায্য করার জন্য। আমি না থাকলে তো তুমি তোমার ক্লাসমেটদের সামনে বিব্রত হবে। তোমার শিক্ষক ভাববেন তোমার কাজ অন্য কেউ করে দিচ্ছে।
কিন্তু আমি- পায়ের শব্দ পেয়ে থেমে গেলাম।
মিস রেনল্ডস এসে দাঁড়িয়েছেন ক্লাসের দোরগোড়ায়।
কী হয়েছে, মাইকেল?
আমি বলতে যাচ্ছিলাম আমার পেট ব্যথা করছে, ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু মানসিকভাবে এমন বিপর্যস্ত লাগছিল আর চালাকি করতে সায় দিল না মন। বললাম কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছি। গম্ভীর মুখে ফিরে এলাম ক্লাসে।
তবে অ্যাবনার তখনও আমার পিছু ছাড়েনি।
চার
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই অ্যাবনার আমাকে বাঁচিয়েছে। আমি ব্লাকবোর্ডে অংকটা কষে ফেললাম। আমার ব্যাখ্যায় সন'ষ্ট মনে হলো মিস রেনল্ডসকে। আমাদের ম্যাথ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট টড হ্যারিসকেও খুশি লাগল। ওর সঙ্গে আগে আমার তেমন কথাটথা হয়নি, তবে এ ক্লাসের পরে সে আমাকে ক্লাবের পরবর্তী মিটিংয়ে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানাল। আমি খুব ভালোভাবেই জানতাম আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো অ্যাবনারই করে দিচ্ছে। তবে কীভাবে এটা সম্ভব হচ্ছে জানি না। আর কেনই বা সে কাজটা করছে তাও জানা নেই।
পরশু আমার ইংরেজি রচনা পড়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন মিস ফ্রাংকলিন। তিনি আমার ভূয়সী প্রশংসা করে বললেন আমি যেন রচনাটি ক্লাসের সবাইকে পড়ে শোনাই। আমি তাঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলাম না। তাছাড়া অ্যাবনার কী লিখেছে জানারও খুব আগ্রহ হচ্ছিল।
রচনা লেখার স্টাইল এবং ভাষা সত্যি চমৎকার। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মনে হচ্ছিল যেন আমিই ওটা লিখেছি। আমি লেখাটি পড়ে শোনাবার সময় কয়েকটি ছেলে হাততালিও দিল।
বিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্র কেন থম্পসন আমার প্রজেক্টের কথা শুনেছে। সে যখন অনুরোধ করল তাকে আমার পার্টনার হিসেবে নেয়ার জন্য, বেশ আমোদ বোধ করলাম। আমাদের দুজনের বিষয়ই এক- মানুষের হৎপিণ্ড।
তবে বাস্তবতা হলো এই যে আমি ছাত্র হিসেবে কেনের ধারে কাছে পৌঁছার যোগ্যতাও রাখি না। কেন যথেষ্ট চালাক চতুর, তবে ও কখনও বুঝতে পারবে না যে ভৌতিক কিছু একটা আমার জন্য পরিষ্কার একটি আউট লাইন তৈরি করে দিয়ে গেছে। নিজেকে আমি ওর চেয়ে খাটো করে তুলে ধরতে পারি, এতে বরং আমার খারাপই লাগবে। তবে কেন বিজ্ঞান মেলায় যে পুরস্কারটা পাবার আশা করছে তা থেকে ওকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। ও হতাশ হলে আমার ভালো লাগবে না, ওরও নিশ্চয় একই রকম অনুভূতি হবে।
স্কুল থেকে বাসায় ফিরলাম। মা যখন দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বিশাল হাসি দিলেন, বুঝতে পারলাম অনেক কিছুই এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মার চোখে চিকচিক করছে পানি। যেন মিলিয়ন ডলার পুরস্কার পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। আনন্দে কেঁদে ফেলবেন। আসল ব্যাপার হলো মিস ফ্রাংকলিন এবং মি. বেনটন মাকে ফোন করে বলেছেন ইদানিং ক্লাসে খুব ভালো করছি আমি। মা এত খুশি হয়েছেন, সাথে সাথে বাবাকে ফোন করেছেন। বাবা আমাদের সবাইকে নিয়ে ডিনারে যাবেন বলেছেন। উদ্দেশ্য, পড়ালেখায় আমার ইদানিং যে উন্নতি হচ্ছে সে বিষয়টি সেলিব্রেট করা। বুঝতে পারছি, সত্যি অনেক কিছু এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ওই রাতে রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরে আমি নিজের ঘরে যাচ্ছি, কিনারে ক্লজিটে কেউ বা কিছু একটা ধরা পড়ল চোখের কোণে। কাঁপা হাতে জ্বেলে দিলাম আলো।
যে জিনিসটা দেখে ভয় পেয়েছি তা আর কিছুই নয়, জিমনাশিয়ামে যাওয়ার ড্রেস। ঝুড়িতে রাখতে ভুলে গেছি। কাপড়গুলো তুলে চট করে ছুড়ে দিলাম ঝুড়িতে। ভাবছিলাম অ্যাবনার হিকসকে দেখার পর থেকে কীভাবে অল্পতেই আমি আজকাল ভয় পাই। সবসময় মনে হয় লোকটা বুঝি ঘাপটি মেরে আছে।
এই ভয়টা আমার তাড়াতেই হবে- যে ভাবেই হোক।
শুক্রবারটা ছিল অন্যরকম। অন্যরকম এ অর্থে যে ভীতিকর কিছু ঘটেনি সেদিন। সৃষ্টিছাড়া কোনও জীব আমাকে বিরক্ত করেনি, ক্লাসরুমে আকস্মিক কোন চমক ছিল না। তবে দিনটা তেমন উপভোগ করতে পারিনি কারণ সারাক্ষণ মনে একটা শংকা কাজ করছিল এই বুঝি কিছু হালুম করে লাফিয়ে পড়ল আমার ঘরে। সে রাতে ঘুমাতে যাবার সময় মনে মনে বললাম আশা করি শহর ছেড়ে চলে গেছে অ্যাবনার হিকস।
শনিবার সকালে ঝরঝরে মেজাজ নিয়ে ভাঙল ঘুম। আমাকে এ হপ্তা কাগজ ডেলিভারি দিতে হয়নি কারণ একটা ছেলে অতিরিক্ত কিছু পয়সা কামাবে বলে আমার কাজটা চেয়ে নিয়েছে। আমি খুশি মনেই সেদিনের কাজটা ওকে দিয়ে দিয়েছি।
বাবা মা রাতে এক পার্টিতে যাবেন। আমি ভিডিওর একটি দোকানে গেলাম ভিডিও ভাড়া নিয়ে আসতে।
মা অবশ্য আমাকে একা বাসায় রেখে যেতে ভরসা পান না। তবে আমি মাকে বলি যে একা বাড়িতে থাকার মত যথেষ্ট বড় হয়েছি। আমাকে নিয়ে এত টেনশন করতে হবে না। দরকার হলে একটা রাত একাই থাকতে পারব। আমার কথা শুনে মা খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েছেন বলে মনে হলো।
আমি সন্ধ্যাবেলায় প্রেটজেল আর পপকর্ন নিয়ে বসলাম খেতে। ফ্রিজ থেকে সোডার একটা ক্যান বের করলাম। পানীয়টা ঢাললাম একটা মগে। দুটো ছবি নিয়ে এসেছি ভিডিওর দোকান থেকে। প্রথমে কমেডি ছবিটা দেখব সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণটা নিশ্চয় বুঝতে পারছ।
ভিসিআর চালানোর প্রস'তি নিচ্ছি, কানে ভেসে এল নানান বিচিত্র শব্দ- সিঁড়িতে ক্যাঁচকোচ আওয়াজ, ছাদ, এমনকী দেয়াল থেকেও শোনা যেতে লাগল অদ্ভুত সব শব্দ। বাবা বলেন, নতুন বাড়িতে নাকি বিচিত্র অনেক শব্দ হয়। কিন্তু আমাদের বাড়িটি তো নতুন নয়, পুরানো।
ভিসিআর-এর ভল্যুম বাড়িয়ে রিল্যাক্স মুডে থাকার চেষ্টা করলাম। রাতের বেলা বাড়িতে একা থাকলে প্রায়ই ল্যারিকে বলতাম আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। হঠাৎ মনে পড়ে গেল কাল কারার সঙ্গে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। অ্যাবনার বোধহয় শহর ছেড়ে চলে গেছে। কারার ওখানে দেখার মত তো কিছু নেই। তবু বাইরে এক চক্কর ঘুরে এলেই হবে।
কারার কথা ভাবতে গিয়ে দেখছি সিনেমাতেই মনোযোগ দিতে পারছি না। আমি ভিসিআর-এর রিওয়াইন্ড বোতামটা টিপে দিলাম। আবার ওই শব্দগুলো শুনতে পেলাম। মাথার ওপরে ক্যাঁচ কোচ করে উঠল কাঠের মেঝে। কেউ যেন হাঁটাহাঁটি করছে।
ঘড়ি দেখলাম। আটটা বাজে। মা-বাবার ফিরতে এখনও অনেক দেরি। আমি আবার ছবিতে মনোযোগ দিলাম।
বাইরে শোঁ শোঁ শব্দে বইছে বাতাস। গাছের ডাল একটা আরেকটার ওপরে আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ আমার পেছনে, জানালার শার্সিতে কীসের যেন শব্দ হলো। লাফিয়ে উঠলাম আমি। ঘুরলাম। টেনে তুললাম জানালার খড়খড়ি। কিন্তু কিছু চোখে পড়ল না। শার্সিতে মুখ চেপে ধরে তাকালাম বাইরে। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
হঠাৎ আমার নিশ্বাসের বাষ্পে আকার নিতে লাগল একটি চেহারা। জানালার ডান পাশে আত্মপ্রকাশ করল একটি মুখ। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। অ্যাবনার হিকস।
পাঁচ
জানালার খড়খড়ি টেনে নামানোর জন্য মরিয়া হয়ে টানাটানি শুরু করে দিলাম। খড়খড়ি নামিয়ে বন্ধ করে দিলাম টিভি। এখন কমেডি ছবি দেখার সময় নয়। খিড়কির দরজায় ঠেস দিয়ে রাখলাম একখানা চেয়ার। পুলিশে ফোন করব? তাতে কোনও লাভ হবে না। পুলিশ এসে অ্যাবনারকে পাবে না। সে নিশ্চয় পুলিশ দেখেও এখানে ঘুরঘুর করবে না। কেমন হয় যদি সদর দরজা খুলে এক লাফে রাস্তায় উঠে বাঁচাও! বাঁচাও! বলে চিৎকার করতে থাকি? বুদ্ধি খারাপ না। তবে এরকম কিছু করার পরে মা আমাকে আর একা ঘরে রেখে কোথাও যাবেন না। আমার জন্য নির্ঘাত একজন বেবি-সিটার রেখে দেবেন। কাজেই যা করার নিজেকেই করতে হবে। কিন্তু এ জন্য একটা অস্ত্র দরকার। ঘরের চারপাশে চোখ বুলালাম। পাঁজরের গায়ে ধড়াস ধড়াস বাড়ি খাচ্ছে কলজে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।
ওটা কীসের শব্দ? ওপর তলায় মেঝেতে কেউ হাঁটছে। অ্যাবনার! না। ও দোতলায় যাবে কী করে? সে তো বাইরে। কেউ বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।
আত্মরক্ষা করার মত কোন কিছু এখনও খুঁজে পাইনি। হেসো না, তবে অস্ত্র হিসেবে নাই মামার চেয়ে কানা মামার মত হাতে তুলে নিলাম রিমোট কন্ট্রোল ইউনিট। কাউকে আঘাত করার ইচ্ছে আমার নেই। তবে বাধ্য হলে হয়তো কাজটা করতে হবে আমাকে।
পায়ের আওয়াজ এখন আসছে সিঁড়ি থেকে। ধীর পায়ে কেউ ডেড-এর দিকে চলেছে। লুকোবার একটা জায়গা দরকার আমার। লুকোবার জন্য বাবার লাউঞ্জ চেয়ারটা পছন্দ হলো। ঘরের কোনায় রাখা চেয়ারটার পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এলাম। কোনও অনুপ্রবেশকারী ঘরে ঢুকলে আমাকে লক্ষ করার আগেই তাকে দেখে ফেলব। আমি হাঁটু গেড়ে বসে রইলাম।
ক্রিইং ইং! টেলিফোনের শব্দে চমকে গেলাম রীতিমত। ফোনের ক্রিং ক্রিং থামছেই না, যেন চলবে অনন-কাল ধরে। অবশেষে থামল শব্দ। কিন্তু এক মিনিট পরে বাজতে লাগল আবার। যে-ই ফোন করুক সে যেন পণ করে আছে সাড়া না পাওয়া পর্যন্ত রিং করেই যাবে। কারা ফোন করেছে কি? কালকের যাত্রার কথা হয়তো জানতে চাইছে। তবে আগামীকাল বলে কোনও দিন আমার জীবনে আর কখনও আসবে কিনা কে জানে। নাকি ল্যারি ফোন করল আমার খবর দিতে? আমি মোটেই ভালো নেই, দোস্ত, তবে আমার কথা তুমি ভাবছ বলে ধন্যবাদ। মা-ও হতে পারে। কিন্তু তারা যেখানে গেছেন, আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র এক ঘণ্টার রাস্তা। ওরা হয়তো এখনও গাড়িতে।
ফোনের শব্দ থেমে গেল। সেই সঙ্গে নীরবতা নেমে এল বাড়িতে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রবল বাতাসের সঙ্গী হয়েছে ঝুম বৃষ্টি। আশা করলাম বৃষ্টির কারণে অ্যাবনার আমাকে রেহাই দিয়ে তার নিজের হানাবাড়িতে ফিরে যাবে।
হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকতে থাকতে খিঁচ ধরে গেছে পায়ে। কিন্তু নড়াচড়া করার সাহস পাচ্ছি না। এমন সময় নিভে গেল বাতি। বিদ্যুত চলে গেছে নাকি কেউ ফাজলামো করে বাতি নিভিয়ে দিয়েছে জানি না। রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি অন করার চেষ্টা করলাম। চলল না।
ভয়ে দিশেহারা দশা আমার। আমার জীবনে এমন ভয়াবহ রাত কোনদিন আসেনি। জানি না আমার ভাগ্যে এসব কেন ঘটছে।
সদর দরজায় নক্ হলো। পরপর দুবার। চেয়ারের পেছনে সিধে হলাম আমি। পা কাঁপছে থরথর করে। কে নক্ করছে? আবার নক্ হলো। তারপর কেউ আমার নাম ধরে ডাকল। বাবা নয়। অ্যাবনারও নয়।
মাইকেল, ঘরে আছ নাকি? আমি মি. মিলস।
কারার বাবা। উফ্, ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল। তবে তখুনি সাড়া দিলাম না। শত্রু ঘাপটি মেরে থাকতে পারে কোথাও। আর এ পরিস্থিতিতে সবদিকে সতর্ক নজর রাখাও সম্ভব নয়।
আমি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। মি. মিলস আমার নাম ধরে ডাকতেই লাগলেন। সেই সঙ্গে জোরে কড়া নেড়ে চলেছেন। অবশেষে চলে এলাম সদর দরজার সামনে। খুললাম কপাট।
মাইকেল, যা বাব্বা। বাঁচালে আমায়। তোমার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?
না। আ-আমি... কী জবাব দেব? বলব যে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন এক অদ্ভুত দর্শন বুড়োকে নিয়ে আমি ভয়ে আছি? বলব যে আমি ওই লোকটার ডরে লুকিয়ে ছিলাম?
তোমার মা ফোন করেছিলেন। তাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আজ আর বাড়ি ফিরতে পারবেন না। তোমাকে রাতে আমাদের সঙ্গে থাকতে বলেছেন।
আচ্ছা।
মি. মিলস বললেন, আমার ফ্লাশ লাইটটা নাও। তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে ফ্যালো। আমি অপেক্ষা করছি। তিনি ফয়েরের দিকে পা বাড়ালেন। তোমার বাবা-মা তোমাকেও ফোন করেছিলেন। কিন্তু কোনও সাড়া পাননি। ফোন বাজার শব্দ শোনোনি?
এ প্রশ্নের জবাবে আমি বিড়বিড় করে কী যেন বললাম। বিড়বিড় করে কিছু বলা মানে লোকে ধরে নেয় যাকে ফোন করা হয়েছে সে সম্ভবত তখন বাথরুম-টুমে ছিল। আমাকে নিশ্চয় বিব্রত দেখাচ্ছিল তাই মি মিলস এ প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ালেন না। আমি পাজামা, রোববারে পরার জন্য জামাকাপড় এবং টুথ ব্রাশ নিয়ে প্লাস্টিকের একটা ব্যাগে ঢোকালাম। তারপর এক ছুটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম নিচে।
আমি রেডি।
জ্যাকেট নেবে না?
ও, হ্যাঁ। ভুলেই গেছিলাম। কোট ক্লজিট খুলে একটা জ্যাকেট নিলাম। চলুন।
কারা এবং মিসেস মিলস রান্নাঘরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিস্কিট আর দুধ খেতে খেতে বিশ্রী ঝড়টা নিয়ে কথা বলতে লাগলাম আমরা। বাবা-মাকে ফোন করে মি. মিলস বললেন আমি এখন তাদের বাড়িতে আছি। তারপর ফোনটা আমাকে দিলেন তিনি। মা বললেন কাল বিকেলের মধ্যে চলে আসবেন ওরা।
মিসেস মিলস লিভিংরুমে আমার জন্য বিছানা করে দিলেন। কারা আর আমি রান্নাঘরে বসে গল্প করলাম।
আমি কারাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার রিপোর্টের খবর কী? আধিভৌতিক যে বিষয়টা নিয়ে লিখছ?
ভালোই। লাইব্রেরির বই ঘেঁটে প্রচুর তথ্য জোগাড় করেছি। গলা নামাল কারা। তুমি কাল আমার সঙ্গে যাচ্ছ তো মেইন স্ট্রীটের ওই বাড়িতে?
আবহাওয়া ভালো থাকলে অবশ্যই যাব, ফিসফিস করে জবাব দিলাম।
শোনো। আমার এক বন্ধু আছে। ছেলে খারাপ না। তবে মাঝে মাঝে বিচিত্র সব কথা বলে। তবে ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। আমার নিজেরই তো বিশ্বাস হয়নি।
বড় বড় হয়ে গেল কারার চোখ। সে তোমাকে কী বলেছে?
এক অদ্ভুত কিসিমের বুড়োর সঙ্গে নাকি তার পরিচয় হয়েছে। তার নাকি...অলৌকিক ক্ষমতা আছে। কথাটা হাস্যকর শোনাচ্ছে জানি তবে ওই লোক নাকি হঠাৎ করে ভোজবাজির মত উদয় হয়, আবার অদৃশ্যও হয়ে যায় চোখের নিমিষে। পলক ফেলার আগেই হাজির করে ফেলে নানান জিনিস।
ওয়াও!
তবু ভালো মেয়েটা আমাকে পাগল ভেবে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়নি। আসল কথা তো এখনও বলিনি। আমার বন্ধু হোমওয়ার্ক করতে ভুলে গেলে বুড়োটা তার কাজ করে দেয়। বন্ধু কোনদিন যেসব পড়া পারত না, বুড়োর দৌলতে সে এখন সব পড়া পারে। শুনে হয়তো তোমার মজা লাগছে কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মানে? জিজ্ঞেস করল কারা।
মেয়েটা গোগ্রাসে গিলছে আমার কথা। আমার বন্ধু তার বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা ক্লাসমেটদের কাছে মিথ্যা বলতে চায় না। এই অদ্ভুত লোকটা ইতিমধ্যে আমার বন্ধুকে ইঙ্গিত দিয়েছে বিনিময়ে তারও কিছু চাই। সময় হলেই আদায় করে নেবে। গভীর দম নিলাম আমি। তুমি কি এরকম কোনও অদ্ভুত বুড়োর কথা তোমার রিসার্চ বইতে পড়েছ?
হুঁ। শুনে মনে হচ্ছে তুমি একটা উন্মাদের পাল্লায় পড়েছ। এরা যা খুশি করতে পারে।
যেমন! প্রশ্ন করলাম আমি।
অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, অলৌকিক কাণ্ড ঘটানো-
আমি পাল্লায় পড়িনি পড়েছে আমার বন্ধু।
তুমিও পাল্লায় পড়তে পার। তোমার টেস্ট পেপার আমি দেখেছি। খুব ভালো রেজাল্ট ছিল তোমার। তোমার মার কথা শুনে মনে হলো সচরাচর এরকম ফলাফল তুমি কর না। আমার কথায় আবার কিছু মনে কোরো না।
না, কিছু মনে করিনি।
মিসেস মিলস কিচেনে ঢুকে ঘোষণার সুরে বললেন আমার কিছানা রেডি। তিনি ঘুমাতে যেতে বললেন। আমি ঘুমাতে চললাম।
ঘুমে দুচোখ প্রায় জড়িয়ে এসেছে, এমন সময় কানের পাশে বেজে উঠল অ্যাবনার হিকসের ভৌতিক কণ্ঠ।
ছয়
ধড়মড় করে উঠে বসলাম আমি। সত্যি সে।
গুড ইভনিং, মাইকেল। তোমার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায় খুশি হয়েছি।
কিন্তু আপনাকে দেখে আমি খুশি হতে পারিনি। আমার পিছু লেগেছেন কেন? আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে ঘুমাতে দিন।
খলখলে গলায় হেসে উঠল অ্যাবনার! ঘুমাবে? তুমি তো এখানে ঘুমাতে আসনি।
মানে? আমি চারপাশে চোখ বুলালাম। সিংহাসনের মত একটা চেয়ারে বসে আছি আমি, পড়শীর লিভিংরুমের সোফার বিছানায় নয়। একটা অন্ধকার, গুমোট প্রাসাদে চলে এসেছি- পাতালঘরের চেয়েও ভয়ানক। পরনে আমার পাজামা নয়, হুডঅলা একটি বাদামী রোব। কোমরে সোনালি রশি, ডগার দিকে সামান্য বেঁকে যাওয়া সোনালি চপ্পল পায়ে।
এখানে হচ্ছেটা কী? আমি কোথায়?
তুমি আমার ঘরে। ভাবলাম তোমার ভালোই লাগবে। তোমাকে সম্মান দেখাচ্ছি।
অন্য কাউকে সম্মান দেখান গে। এটা কি সেন্টারভিল?
ফোনের জন্য চারপাশে তাকালাম। সুযোগ পেলেই পুলিশে ফোন করব।
অবশ্যই না। আমার মত শক্তিধর মানুষ তোমাকে কেন সাধারণ একটা জায়গায় নিয়ে আসবে?
যুক্তির কথাই বটে ভাবলাম আমি। কারা ঠিকই বলেছে। অ্যাবনারটা আসলে উন্মাদ। কীসের সঙ্গে আছি বুঝতে পারছি বটে তবে কী করব মাথায় ঢুকছে না।
ভয় পেয়েছি যে সেটা লোকটাকে টের পেতে দেয়া যাবে না, মনে মনে বললাম আমি। বুকে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, আপনি আসলে আমার কাছে কী চান খোলাসা করে বলুন তো।
বলার জন্য আমার কোনও তাড়া নেই। তুমি কোথাও যাচ্ছ না। তবু জানতে যখন চাইছ তাই বলছি আমার একজন সহকারী দরকার। যে আমাকে আমার কাজে সাহায্য করবে। যে কাজ করার জন্যে আমি কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এ লোক কী কাজের জন্য কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে? লোকটাকে দেখে মনে হয় তিনশো বছর আগে তার জন্ম। অবশ্য এতে কিছু এসে যায় না। আমার এখান থেকে কেটে পড়া দরকার। চারপাশে তাকালাম পালাবার যদি কোনও রাস্তা পাওয়া যায়। কিন' এ ঘরে একটা জানালা পর্যন্ত নেই।
জানালা খুঁজছ? লোকটা যেন আমার মনের খবর পড়ে ফেলল। এ লোকের প্রতিটি আচরণই ভীতিকর। হাত নাড়ল সে। ফু: জানালা। কর্কশ গলায় বলে উঠল অ্যাবনার। এমন বিশ্রী গলার স্বর, কানে বাজে।
চেয়ার থেকে নামলাম আমি। উঁকি দিলাম বাইরে। না, এটা সেন্টারভিল নয়। এমনকী আমরা মাটিতেও নেই। আমরা মেঘের রাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছি।
যাও, পালাবার চেষ্টা করো। যা খুশি করতে পার তুমি। কেউ তোমার কথা শুনতে পাবে না, কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না। সুচাল আঙুল তুলল আমার দিকে। তুমি চলে যেতে চেয়েছ শুনি আমি কিছুটা অপমানিত বোধ করেছি।
ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। আমার বাবা-মা আমার জন্য চিন্তা করবেন বলে চলে যেতে চাইছি। তাছাড়া স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় আমার বন্ধুর সঙ্গে একটা প্রজেক্ট করার কথা। সে আমার ওপর ভরসা করে আছে।
যদি কোনদিন এখান থেকে সেন্টারভিলে ফিরে যেতে পার তাহলে প্রজেক্ট করতে পারবে। হা হা হা! বলে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল অ্যাবনার।
আমি কিন' হাল ছাড়লাম না। এর একটা সমাধান আমার চাই-ই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমি এর মধ্যে ঢুকলাম কী করে? আরি, ওটা কী?
শ্শ্শ্, মাইকেল। এদিকে তাকাও।
ল্যারি! পাঁই করে ঘুরলাম আমি। কাউকে দেখতে পেলাম না তবে আমার বন্ধুর কণ্ঠ যেন ভেসে এসেছে দেয়ালে ঝোলানো অ্যাবনারের একটি ছবির পেছন থেকে। ছবিতে অ্যাবনারের চেহারা ভালোই দেখাচ্ছে। কোথায় তুমি? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জলদি! একদম সময় নেই হাতে। অ্যাবনারের ছবিটা নামাও। ওটার পেছনে একটা চাবি আছে। জবাব দিল ল্যারি।
ভারী ছবিটা নামালাম। ধুলোয় দম বন্ধ হওয়ার দশা, মাকড়সার ফিরফিরে জাল হাওয়ায় উড়ছে। ছবি পরিষ্কার করার কেউ নেই নাকি? ক্যানভাসের পেছনে পুরানো একটা চাবি দেখতে পেলাম। টেনে খুলতে হলো ওটাকে।
চাবি পেয়েছি, বললাম আমি।
আস্তে কথা বলো, বলল ল্যারি। নইলে ওরা তোমার গলা শুনে ফেলবে। বুকশেলফের বইগুলোর দিকে তাকাও। বুকশেলফগুলো আগে লক্ষ করিনি। এখন দেখলাম গোটা দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে বইয়ের তাক। তিন নম্বর শেলফে, বইয়ের পেছনে একটা তালা দেখতে পাবে। চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে বাম দিকে মোচড় দাও।
নির্দেশ দিয়ে চলল ল্যারি।
ও যা বলল তেমনটিই করলাম আমি। তালায় চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই আমাকে অবাক করে দিয়ে ধীরে ধীরে খুলে গেল দেয়াল। ল্যারি বেরিয়ে এল দেয়ালের ওপাশ থেকে।
তোমাকে দেখে যে কী ভাল্লাগছে আমার! বললাম আমি।
আমারও। তবে নষ্ট করার মত সময় একেবারেই নেই। দরজা বন্ধ করে দাও।
আমরা কী করছি? জানতে চাইলাম আমি।
এই প্যাসেজওয়েটা একটা টানেলের মত। এই টানেল ধরে আমরা পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব।
তুমি এত কথা জানলে কী করে? ল্যারি এত জোরে হাঁটছে যে ওর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাকে প্রায় ছুটতে হলো। তুমি এখানে কদ্দিন ধরে আছ? তোমার সঙ্গে তো মাত্র সেদিন ফোনে কথা হলো।
পরে সব কথা বলব। এখন এসো। জলদি।
জায়গাটা অন্ধকার। স্যাঁতসেঁতে। গা ছমছম করছে আমার। জানি ল্যারিরও একই অবস্থা। হঠাৎ কানের পাশে বোমা ফাটল যেন। তোমরা কোথায় যাচ্ছ শুনি?
হতাশায় মুচড়ে উঠল বুক। ভোজবাজির মত উদয় হয়েছে অ্যাবনার। রাগে গনগনে মুখ, বুকে দুই হাত আড়াআড়িভাবে রাখা। আগে লক্ষ করিনি তার আঙুলে মস্ত একটা হীরের আংটি। আংটি থেকে জোরালো আলো ফুড়ে বেরুচ্ছে। ধাঁধিয়ে দেয় চোখ। আমি চোখে হাত চাপা দিলাম।
আমার পেছন পেছন এসো।
সাত
না! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। কিছুতেই যাব না।
মাইকেল? মাইকেল কী হয়েছে? ওঠো।
আমি চোখ মেলে চাইলাম। শুয়ে আছি সোফায়। আমার দিকে উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন মি. এবং মিসেস মিলস, কারা, এমনকী ছোট্ট বেথ পর্যন্ত। দ্রুত বিছানায় উঠে বসলাম। উষ্ণ রোদের স্পর্শ পেলাম পিঠে। আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে।
নিশ্চয় দুঃস্বপ্ন দেখেছে, মন্তব্য করল কারা।
তুমি ঠিক আছ তো, মাইকেল? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস মিলস।
জবাবে শুধু মাথা ঝাঁকালাম। হঠাৎ বাবা মার কাছে যেতে খুব মন চাইল। দুঃস্বপ্ন দেখে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার জন্য নিজের বাড়ি এবং পরিবার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা।
ওঠো, মাইকেল। নাশতা খাবে চলো, বললেন মি. মিলস।
সবাই চলো।
সবার শেষে গেল কারা, আজ ঝড়বৃষ্টি নেই, মাইকেল। ফিসফিস করর ও। হানাবাড়িতে হানা দেয়ার উপযুক্ত সময়।
গুঙিয়ে উঠলাম আমি। এ মেয়েকে কী করে বোঝাব ওখানকার ছায়া মারাতেও চাই না আমি?
একবার ভাবি বলি বাবা-মা বাসায় না ফেরা পর্যন্ত আমি কোথাও যাচ্ছি না। তারপর বাবা মা বাসায় এলে বলব এখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না, বাড়িতেই থাকব। কিন' কারা মেয়েটা খুব ভালো। ওর সঙ্গে ছলচাতুরী করা ঠিক হবে না। মুখ হাত ধুয়ে, পরিষ্কার কাপড় পরে, পেট ভরে নাশতা খাওয়ার পরে বেশ ঝরঝরে লাগল নিজেকে।
আমার বাই সাইকেলটা বাড়িতে। কারাকে বললাম ওদের ড্রাইভওয়ের সামনে ওর সঙ্গে দেখা করব। আমি আমাদের গ্যারেজে পা বাড়ালাম। আমাদের গ্যারেজের দরজা সিকিউরিটি নাম্বার লাগে। সিকিউরিটি নাম্বার আমি কখনও ভুলি না। ওটা আমার জন্মদিনের তারিখ। গ্যারেজ খুলে খাওয়ার ব্যাপারটা আমার কাছে ম্যাজিকের মত মনে হয়। কয়েকটা বোতাম টেপো, তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গড়গড় করে ভারী ইস্পাতের দরজাটা খুলে যাবে, তোমাকে একটা আঙুলও আর ছোঁয়াতে হবে না।
আমি গ্যারেজের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। সাইকেলটা বের করে নিয়ে আসব, এমন সময় খটাং করে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। এভাবে তো দরজা বন্ধ হবার কথা না। গ্যারেজের ভেতরটা এখন অন্ধকার। আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
কোথাও ঘুরতে যাচ্ছিলে বুঝি? সেই ভয়ংকর কণ্ঠটি আবার!
আমি অ্যাবনারকে দেখতে পাচ্ছি না। তবে ও যে এখানে আছে তা বুঝতে পারছি। দেখুন, এটা প্রাইভেট প্রোপার্টি। এখান থেকে চলে যান। আর কখনও আসবেন না। নয়তো আমি পুলিশ ডাকব। বললাম আমি।
কিন্তু আমি তো তোমার বন্ধু, খোকা। সবচেয়ে সেরা বন্ধু। তোমার কী কী উপকার করেছি ভুলে যাওনি নিশ্চয়।
আমি আপনার খোকা কিংবা অন্য কিছু নই, বললাম আমি। আর আমি আপনার কাছে কখনও উপকার চাইতেও যাইনি।
তুমি চাওনি বলেই যে আমি তোমার উপকার করব না এ কেমন কথা।
আমি জানি আমি আপনার বন্ধু নই। কিন' আপনি এভাবে আমার পিছু লেগেছেন কেন? আমার বেতনের টাকাগুলোর ওপর চোখ পড়েছে? আমি ও টাকা কবেই খরচ করে ফেলেছি।
বলেই বুঝলাম কথাটা বলা একদম উচিত হয়নি। অ্যাবনার আমার কথায় খুবই অপমান বোধ করল। ঝাড়া এক মিনিট চুপ করে থাকল। তারপর সিরিয়াস গলায় বলল, আমি খবরের কাগজের কম্পিউটারে প্রবেশের গোপন কোড নাম্বারটা চাই।
কেন?
বলা যাবে না।
আমি কম্পিউটার অ্যাকসেস কোড সম্পর্কে কিছু জানি না।
বড়দের কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে।
তারা যদি জানতে চায়, কম্পিউটার অ্যাকসেস কোড দিয়ে আমি কী করব।
তখন বানিয়ে যা হোক কিছু একটা বলে দেবে। তুমি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পার আমি জানি।
মাইকেল! তুমি কী ভেতরে? কারার গলা।
আসছি এখুনি, সাড়া দিলাম জোর গলায়। অ্যাবনারকে উদ্দেশ্য করে বললাম, যদি আপনার কাজ না করি?
তুমি পরীক্ষায় ফেল করবে। তোমার বাবা-মা মনে খুবই দুঃখ পাবেন। গুজব ছড়িয়ে পড়বে কেউ তোমার হোমওয়ার্ক করে দিত। বলবে তুমি একটা চিট। সবাই তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।
হুঁ, রীতিমত ঘামছি আমি। বুঝতে পারছি আমি। এখন দয়া করে দরজাটা খুলে দিন। প্লীজ।
যা বললাম তা হেলায় উড়িয়ে দিয়ো না। এর ওপরে অনেক কিছুই নির্ভর করছে। আর একটা কথা মনে রেখো : আমি ভালোর ভালো মন্দের মন্দ।
আট
খুলে গেল দরজা, ঝকঝকে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হলো গ্যারেজ। চলে গেছে অ্যাবনার। আমি বাইরে চলে এলাম। দম নিলাম বুক ভরে।
এতক্ষণ কী করছিলে? জিজ্ঞেস করল কারা।
সরি, ওকে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। কারা, ওই বাড়িতে না যাওয়াই ভালো।
কেন? তুমি না বললে-
বলেছি। কিন্তু তুমি জান না ওখানে গেলে বিপদ হবে কিনা। কারার চেহারায় নিখাঁদ বিস্ময় ফুটল। শেষে বাধ্য হলাম অ্যাবনারের ঘটনা ওকে বলতে।
কারা বলল, মাইকেল, তোমার পুলিশে খবর দেয়া উচিত।
ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি বললেই বিশ্বাস করছে কে?
আমি তোমার সঙ্গে যাব।
গিয়ে কী লাভ? আমি ছাড়া কেউ অ্যাবনারকে দেখেনি। ওরা ভাববে আমি ওদেরকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছি।
আরে চলো তো, বলল কারা। আমরা কোনও পেট্রল অফিসারকে পটিয়ে ওই বাড়িতে নিয়ে যাব। আমার রিপোর্ট লেখার মত একটা বিষয় পেয়ে যাব। হয়তো গিয়ে দেখব অ্যাবনার বাড়িতে নেই। চলে গেছে অন্য কোনও শহরে।
ওর কথায় যুক্তি আছে, স্বীকার করলাম মনে মনে। ওকে বললাম, তবে একটা কথা, কারা। এ বিষয়টি নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না। তাহলে আরও বেশি সমস্যায় পড়ে যাব।
আচ্ছা। এখন থানায় চলো। তুমি শুরু করো। আমি পেছন পেছন আসছি।
সাইকেল চালাতে চালাতে ভাবছিলাম আসলে আমরা কী করছি। সেন্টারভিল থানায় আগে কখনও যাইনি আমি। কোনওদিন যেতেও চাইনি। ধরো, থানায় কখনও উঁকি দিতে গেলাম, এমন সময় চোয়াড়ে চেহারার কোনও লোক এবং তার বাচ্চা যদি আমাকে দেখিয়ে বলে, ওই যে ও। ও-ই আমার বাই সাইকেল চুরি করেছে! এমনটি ঘটতেই পারে। উদোর পিণ্ডি অনেক সময় বুধোর ঘাড়ে চেপে যায়। তবে আজ ঝুঁকিটা নিয়েই যেতে হচ্ছে আমাকে।
কারাকে নিয়ে পৌঁছে গেলাম থানায়। তালা মেরে রাখলাম বাইক। চুরি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কে নিতে চায়? যা হোক, ভেতরে ঢুকলাম দুজনে। চলে এলাম মূল ডেস্কে। টেলর নামে এক অফিসার ফোনে কথা বলছে। ফোন রেখে জিজ্ঞেস করল আমাদের আগমনের কারণ। আমি ঢোক গিলে বললাম, আমরা একটা নালিশ- হঠাৎ অসাড় হয়ে গেল জিভ, টেলরকে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে।
এগিয়ে এল কারা। আমরা নালিশ করতে এসেছি- খুক খুক কাশল ও। এক অদ্ভুত লোকের বিরুদ্ধে।
কপালে হাত ঘষল অফিসার টেলর। কেউ তোমাদেরকে বিরক্ত করছে, বাচ্চারা?
আমি এক লাফে সামনে চলে এলাম। শুধু আমাকে।
লোকটার নাম কী?
অ্যাবনার হিকস।
নামটা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।
শহরে নতুন এসেছে, বলল কারা।
সে কীভাবে বিরক্ত করছে?
আবার বলল কারা। মাইকেলের হোমওয়ার্ক করে দিচ্ছে, পরীক্ষা... আমি চিমটি দিলাম কারাকে। অফিসার টেলরের চোখ সরু হয়ে আসছে। লক্ষণ ভালো না। লোকটা আমাকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে।
তোমার মা-বাবাকে বলেছ? অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য বাবা-মা কিংবা কোনও গার্জিয়ান লাগবে।
ওর বাবা-মা শহরের বাইরে, জানাল কারা।
অঃ। কিন্তু এখন তো কিছু করতে পারব না। তবে এই মি. হিকসের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেব। ওর ঠিকানা জানো?
সে ২০০ মেইন স্ট্রীটে থাকে।
সেই পোড়োবাড়িটা? হুম্ম্। ঠিক আছে। আমরা আমাদের চোখ-কান খোলা রাখব। তোমরা একটু সাবধানে থেকো। ঠিক আছে?
সাবধানে থাকব বলে আমরা চলে এলাম থানা থেকে। স্বস্তি লাগছে এখন। একটা কাজের মত কাজ করেছি।
পুলিশের কাছে অ্যাবনারের কথা বলে দিয়েছি। আমি লাফ মেরে বাইকে উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে থমকে গেলাম।
অ্যাই, কারা, অ্যাবনার যদি জেনে যায় আমরা এখানে এসেছিলাম, তাহলে? তার অগোচরে তো কিছুই থাকে না। রেগে গিয়ে যদি কিছু করে বসে?
কারা আমার দিকে তাকাল। সে কি পুলিশে ভয় পায়?
আমাদের মত বোধহয় ভয় পায় না। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি জানলে সে রেগে যেতে পারে।
তা অবশ্য পারে, ভাবছে কারা। হঠাৎ বলে উঠল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। এতে ঝুঁকি আছে। তবে কাজ হবে বলে মনে হয়। অন্তত চেষ্টা করে দেখতে দোষ নেই।
শুনি তো বুদ্ধিটা কী।
অ্যাবনারকে বলে দাও কীভাবে সে কম্পিউটার অ্যাকসেস কোডের সন্ধান পাবে।
কিন্তু এ কথা তাকে বলতে যাব কেন?
ওকে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসতে হবে। আর এটা সম্ভব হলেই ওর বিরুদ্ধে নানান ক্লু পেয়ে যাব আমরা।
কিন্তু ওকে কী বলব?
একটা কোড বানাবে, কয়েকটি অক্ষর, দুএকটি সংখ্যা। সে যখন এই ভুয়া কোড দিয়ে কম্পিউটারে ঢুকতে পারবে না এবং অভিযোগ করবে, বলবে ভুলটা তোমার, তুমিই ঠিকমত কোডটা দিতে পারনি।
কিন্তু ও তো সারাক্ষণ আমার পিছু লেগেই থাকছে।
তুমি বলবে তুমি যদি এ ব্যাপারটা নিয়ে খবরের কাগজের লোকদের আবার বিরক্ত কর, চাকরিটা হারাবে। আর চাকরি হারালে বিপদে পড়ে যাবে।
কারার পরিকল্পনা মন্দ নয়। এখন এটাকে কাজে লাগাতে পারলেই হলো। আর যদি ব্যর্থ হই তো আমার কপালে কী আছে ভাবতেই শিরশির করে উঠল গা।
নয়
কাজে লেগে গেলাম আমরা। কারা এবং আমি কতগুলো ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। দেখলাম অ্যাবনার মেইন স্ট্রীটের বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে। কাজটা খুব সহজ মনে হচ্ছিল আমার কাছে। সহজই তো-অ্যাবনারের বাড়ির সামনের দরজায় একটা চিরকুট রেখে বেল টিপেই এক লাফে চড়ে বসব আমার বাইকে, সে দেখে ফেলার আগেই। লোকটার মুখোমুখি হতে চাই না আমি।
অ্যাবনার চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর এক ছুটে চলে এলাম বাড়ির পেছন দিকে। পা বাড়ালাম দরজায়। নবে মোচড় দিতেই খুলে গেল কপাট!
ফিসফিস করল কারা, যদি ধরা খাই?
অ্যাবনার এখুনি ফিরছে না। কাজেই ভয় নেই। বললাম আমি। তবু পা টিপে টিপে দুজনে ঢুকলাম ঘরে। চাই না অ্যাবনারের কোনও আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধব আমাদের আগমন টের পেয়ে যাক। অবশ্য তার যদি এমন কেউ থেকে থাকে!
শেষবার যে রকম দেখেছিলাম তারচেয়েও হতচ্ছাড়া দশা ঘরের ভেতরটা। ছাদ থেকে মাকড়সার জাল ঝুলছে। কয়েকটি আসবাবের গায়ে জমেছে ধুলো। কোন কোনটির গায়ে এক ইঞ্চি পুরু হয়ে আছে। বাতাসে ভাপসা, পচা একটা গন্ধ। যেন বহুদিন জানালা খোলা হয় না। ভাগ্যিস সঙ্গে ফ্লাশ লাইট নিয়ে এসেছিলাম। বাইরে চড়া রোদ থাকলেও এ বাড়ির অন্দরমহল অন্ধকার। রাত-দিন দুটোই এখানে সমান।
আমরা এখন বাড়ির সামনে চলে এসেছি। লম্বা একসার সিঁড়ি উঠে গেছে টপ ফ্লোরে। কারার দিকে তাকালাম। যাব ওপরে? কারার কথা ভেবে দোটানায় ভুগছি। মি. এবং মিসেস মিলস আমাকে খুব আদর করেন। কারার যদি কিছু হয়ে যায় কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না নিজেকে...
কারা ঠেলা দিল আমাকে। ওই যে দ্যাখো। ওদিকে একটা স্টাডি রুম আছে।
কারা ঠিকই বলেছে। স্টাডি রুমই বটে। গাদাগাদা বই ছড়ানো সর্বত্র। শেলফের ওপরে বড় বড় মোমদানি। রয়েছে বুক কেস এবং প্রকাণ্ড একখানা ডেস্ক। অ্যাবনার হয়তো এখানেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেয়।
ডেস্কে পা বাড়ালাম অ্যাবনার কী পড়ছে দেখতে। মানুষের হৃৎপিণ্ডের ওপর লেখা বই লোকটার ডেস্কে। আমার সায়েন্স প্রজেক্টে নিশ্চয় কাজে লেগেছে এ বই। মি. মেইন ইতিহাসের ক্লাসে যা পড়াচ্ছেন সে বিষয়ের ওপরেও একটি বই দেখতে পেলাম। আমার হোমওয়ার্ক করে দেয়ার জন্য অ্যাবনারের নিজের কম হোমওয়ার্ক করতে হয়নি।
এসব কী ভাবছি আমি? ও তো আমাকে সাহায্য করার জন্য কিছু করেনি। ও চেয়েছে আমি যেন ওর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করি, অনুগত থাকি, ওকে যেন ভয় পাই। এসবই তার কূটকৌশলের অংশ মাত্র। আমাকে সে তার সহযোগী বানানোর মতলব করেছে।
কিন্তু আমার পেছনে ও লাগল কেন? এ প্রশ্নের জবাব এখন আমি জানি। যেহেতু আমি ঠিক মত নিজের কাজগুলো করতে পারছিলাম না তাই আমি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলাম। আর বেপরোয়া মানুষ সব কিছু করতে পারে। অ্যাবনার তো আমার মত ছেলেকেই তার শিষ্য বানানোর জন্য উঠে পড়ে লাগবে।
আমাকে বর্তমানের দুনিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে এল কারা।
এটা দ্যাখো! একটা খোলা নোটবুকে ইঙ্গিত করল ও। সামনের পৃষ্ঠায় অ্যাবনারের পুরানো দিনের হাতের লেখার ঢঙে লেখা সেন্টারভিল শাসনের পরিকল্পনা দেখে কারার মতই চমকে গেলাম। আমি অনুমান করছিলাম কিছু একটা বদ মতলব আছে অ্যাবনারের। কিন্তু সে যে এসব চিন্তা করেছে তা ভাবিনি।
নোটবুকের পৃষ্ঠা উল্টে চললাম দ্রুত। অ্যাবনারের উন্মাদ পরিকল্পনার একটা ছবি ফুটে উঠল : সে সেন্টারভিলের অধিবাসীদের কব্জা করতে চায় খবরের কাগজের মাধ্যমে। গোপনে কম্পিউটারের মাধ্যমে সে এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সে সেন্টারভিলের মানুষদেরকে বলবে তাকে মেয়র হিসেবে নির্বাচন করা হলে শহরের কোনও বেকার থাকবে না, থাকবে না অপরাধ, রইবে শুধু নিরবচ্ছিন্ন শান্তি।
তোমাকে পড়তে দেখে খুশি হলাম, মাইকেল। তবে গোপন এবং ব্যক্তিগত কারও লেখা লুকিয়ে পড়া ঠিক নয়।
অ্যাবনারের গলা শুনে চমকে উঠলাম। অবশ্য চমকানোর কোনও কারণ ছিল না। কারণ তার অভ্যাসই হলো হুটহাট করে চলে আসা। তবে লোকটার আকস্মিক আগমনে এমন ভয় পেলাম, হাত দিয়ে পড়ে গেল নোট বুক।
কারা ভান করল ভয় পায়নি। ফুঁসে উঠল ও। ব্যক্তিগত? আপনি সেন্টারভিল শহর দখলের পাঁয়তারা করছেন আর এটাকে বলছেন ব্যক্তিগত? গোটা একটা কম্যুনিটিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার ষড়যন্ত্র একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে হতে পারে না।
হ্যাঁ, কারার সুরে সুর মেলালাম আমি হারানো সাহস ফিরে পেয়ে।
আমি এ পর্যন্ত যে কটি শহরে গেছি এ শহরটিকে সব থেকে ভালো লেগেছে। তবে এটি আরও ভাল শহর হতে পারত। মাইকেলের মত এখানে প্রতিভাবানদের অভাব নেই কোনও। আর প্রতিভাবানদের দিয়েই গড়ে তোলা যায় সুখের রাজ্য। যে শহরে সবসময় বিরাজ করবে সুখ এবং শান্তি।
কারা বলল, সুখ-শান্তি পাবার জন্য শহরের মানুষদের কী করতে হবে?
আমার কর্তৃত্ব মেনে চলতে হবে। আমার প্রতি আনুগত্য দেখাতে হবে।
আমার দিকে ফিরল অ্যাবনার। আমি কিন্তু তোমার ওপরে খুব রেগে আছি, মাইকেল। তোমাকে নির্বাচন করেছিলাম আমাকে সাহায্য করার জন্য। উল্টো তুমি আমার পরিকল্পনা ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছ। আমি এখন তোমার বান্ধবী এবং তোমাকে ধ্বংস করব।
দশ
অ্যাবনার হাত নাড়তেই হাতে চলে এল একটি জ্বলন্ত মোমবাতি। আমার ভয়গুলো বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। আমি কারার দিকে তাকালাম। ওর চোখে পানি।
ওকে ছেড়ে দাও, অ্যাবনার, এবারে আর আপনি বলে সম্মান দেখানোর প্রয়োজন বোধ করলাম না। মেয়েটা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না, নিজের কথা ভাবি না আমি। শুধু ওকে যেতে দাও।
বান্ধবীর জন্য অনেক দরদ দেখছি। আমি সত্যি অভিভূত। অ্যাবনার তাকাল কারার দিকে। দুঃখের বিষয় হলো মেয়েটির বয়স খুবই কম। তবে সমস্যা হলো এ বয়সেই সে অনেক কিছু জেনে এবং বুঝে ফেলেছে। কঠোর হয়ে উঠল লোকটার চেহারা। এসো আমার সঙ্গে।
অ্যাবনার আমাদেরকে নিয়ে সরু সিঁড়িতে পা বাড়াল। আমি কারার হাত ধরলাম। এ ছাড়া আর কিইবা করার ছিল আমার।
হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে টগবগ করে ফুটতে লাগল রক্ত। ভয় ছাপিয়ে ক্রোধ যেন গ্রাস করল আমাকে। অ্যাবনারের মত একটা পাগল আমাদের ধ্বংস করে দেয়ার কে? সে নিজেকে কী ভাবে?
রাগে জ্বলতে জ্বলতে আমি হাতের ফ্লাশ লাইট দিয়ে খটাশ করে এক বাড়ি মেরে বসলাম অ্যাবনারের মাথায়। কিন্তু ওর মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। বোধহয় টেরই পায়নি। আশ্চর্য! জাদুকররা নিশ্চয় ভিন্ন ধাতুতে গড়া। যদি অ্যাবনার দেখতে পেত কিংবা টের পেত আমি তাকে আঘাত করেছি, এতক্ষণে আমাদের দশা যে কী করে ফেলত বলা বাহুল্য।
অ্যাবনার আমাদেরকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একটি সেলারে চলে এল। অন্ধকার ঘর। অ্যাবনার আমাদেরকে মেঝেতে বসতে বলল। কিন্তু কারা গোঁ ধরে রইল সে মেঝেতে বসবে না। অ্যাবনারকে চেয়ার নিয়ে আসতে বলল। অ্যাবনারের জন্য এসব কোনও সমস্যাই নয়। সে হাততালি দিতেই হাজির হয়ে গেল দুটো চেয়ার।
আমাদেরকে নিয়ে কী করবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম অ্যাবনারকে।
তোমার প্রশ্নের জবাব এখন দেয়া যাবে না, বলল অ্যাবনার। কারণ এখনও ঠিক করিনি তোমাদেরকে নিয়ে কী করব। ভাবছি তোমাদেরকে জিম্মি বানালে কেমন হয়। আমি নিশ্চিত দুটি শিশুর জীবনের বিনিময়ে আমার হাতে নগরের ক্ষমতা তুলে দিতে দ্বিধা করবে না শহরবাসী।
অ্যাবনারের কথা শুনে একটু ভরসা পেলাম। যাক, ও তবু হাততালি দিয়ে আমাদেরকে অদৃশ্য করে ফেলছে না। এখন যত সময় ক্ষেপণ করতে পারব ততই আমাদের পালাবার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
কোনও কিছুর প্রয়োজন হলে হাঁক দিও। তবে চিৎকার চেঁচামেচি করলেও লাভ হবে না। বাইরের কেউ শুনতে পাবে না। খিকখিক শয়তানি হাসি হাসল অ্যাবনার। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল ওপরে। কাঁদো কাঁদো গলায় কারা বলল, সব আমার দোষ, মাইকেল। আমি অত্যন্ত দুঃখিত।
না, সব দোষ অ্যাবনারের। ও একটা ক্ষমতালোভী উন্মাদ, একটা পাগল জাদুকর। অ্যাই মেয়ে, মন খারাপ কোরো না তো। আমাদের বাবা-মা শীঘ্রি হয়তো আমাদের খোঁজে বেরুবেন। হয়তো থানায় ফোন করবেন। হয়তো অফিসার টেলরের সঙ্গে তাদের কথাও হয়ে যেতে পারে। সে হয়তো তার সহকর্মীদের সঙ্গে আমাদের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে কথাও বলেছে। হয়তো ওরা এতক্ষণে তদন্তে নেমেও গেছে।
শুধু হয়তো আর হয়তো।
আশার দিকটার কথা আগে ভাবতে হয়। তুমি তোমার রিপোর্ট লেখার জন্য কিছু উপাদান পেয়ে যাবে।
আমি এখন রিপোর্ট নিয়ে কিছু ভাবছি না।
ভাবা উচিত।
তুমি কি সিরিয়াস? আমরা এখন ঘোর বিপদে রয়েছি, মাইকেল।
আচ্ছা, তুমি তো তোমার প্রজেক্টের জন্য অনেক পড়াশোনা করেছ, তাই না?
নিশ্চয়।
ওর মধ্যে পাগল জাদুকরকে কীভাবে হত্যা করা যায় সেসব নিয়ে কিছু লেখা ছিল?
একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিল কারা। না। তবে সিনেমার ওই ডাইনির কথা মনে আছে যার গায়ে পানি ছুড়ে মারার পরে সে ছোট হতে হতে একসময় নেই হয়ে গিয়েছিল? এ লোকটার গায়েও পানি ছুড়ে মারা যায়।
মনে পড়ে গেল গত ঝড়ের রাতে, অ্যাবনার যখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ ওকে আর দেখতে পাইনি। শুনে তো সহজই মনে হচ্ছে। একবার চেষ্টা করে দেখা যায়, বললাম আমি।
যত সহজ ভাবছ অত সহজ নয় কাজ। এ বাড়িতে পানি আছে। এবং অ্যাবনার হয়তো সে পানি ব্যবহারও করে।
বুঝতে পারছি খুব ঝামেলার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি। ফ্লাশলাইট জ্বেলে নিশব্দে পায়চারি শুরু করে দিলাম ঘরে। স্যাঁতসেঁতে ঘর। দুঃস্বপ্নের মত পাতালঘর।
হঠাৎ চরকির মত ঘুরে দাঁড়ালাম।
কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকল। কান পাতলাম। হ্যাঁ! কী আশ্চর্য! ও এখানে- আমার বন্ধু, আমার জানি দোস্ত। ও এখানে এসেছে এবং আমাদেরকে দেখেছে!
আমরা এখানে, ল্যারি। বেযমেন্টে! হাঁক ছাড়লাম আমি। কিন্তু চিৎকার করে লাভ কী। মস্ত বিপদে আছি আমরা। শহরের মানুষও নিরাপদ নয় এই উন্মাদের কবল থেকে।
ল্যারির গলা কাছিয়ে এল। ঠিক আছে। আমি জানি তোমরা কোথায় আছ। আমি আসছি ওখানে।
কারার সঙ্গে ল্যারির আগেই পরিচয় হয়েছে। ওর বাবা-মা যখন ল্যারিদের বাড়ি কিনতে এলেন, সেই সময়। ল্যারির গলা শুনে স্বস্তি ফুটল কারার চেহারায়।
ল্যারি। আমার দোস্তো ল্যারি। কেউ যদি এখান থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে যেতে পারে তো সে এই ল্যারি।
কারা এবং আমি ল্যারির জন্য অপেক্ষা করছি। মনে হলো অনন্তকাল ধরে। এমন সময় খুলে গেল সেলারের দরজা। আমার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো যখন দেখলাম ল্যারিকে সিঁড়িতে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে আসছে অ্যাবনার।
এগার
ল্যারির হাঁটার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রতিদিনই একজন করে জাদুকর তাকে অপহরণ করে এবং এটা তার জন্য কোনও বিষয়ই নয়। তবে হাতে ধরা কমলার রসের কন্টেনারটা লক্ষ করলাম ঠকঠক কাঁপছে।
তোমাদের জন্য একজন সঙ্গী জোগাড় করে নিয়ে এলাম, বলল অ্যাবনার। বিষয়টি সে উপভোগ করছে চেহারা দেখে বোঝা যায়। এ কুকুরছানাটাকে দেখলাম আমার বাড়ির পাশে ঘুরঘুর করছে।
ল্যারিকে ও কুকুরছানা বলল? রাগে লোকটার গায়ে কিছু একটা ছুড়ে মারতে ইচ্ছে করল।
আরাম করো, ছোকরা। তোমাদের সঙ্গে বসে আড্ডা জমাতে পারলে ভালোই লাগত। কিন্তু আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। অ্যাবনার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল ওপরে। ওকে চলে যেতে দেখে খুব খুশি হলাম।
ল্যারি আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ওকে দেখে খুব ভাল্লাগছে। তুমি লোকটা সম্পর্কে ঠিক কথাই বলেছ, মাইকেল। বদ্ধ উন্মাদ একটা। ওর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে উঠলাম। তারপর হ্যান্ডশেক করলাম দুবন্ধু।
আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তুমি এসেছ। কী করছিলে এখানে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
তোমাদের জন্য একই প্রশ্ন তো আমারও। বাবা মার সঙ্গে শহরে এসেছিলাম দাদীকে দেখতে। তোমার বাসায় ফোন করেছিলাম। কিন্তু কেউ ফোন ধরেনি। তোমাদের বাসায় তখন ছুটে যাই। তোমার বাবা-মা তখন বাড়ি ফিরছেন। বললেন তুমি নাকি কারাদের বাসায় আছ। কিন্তু কারাদের বাসায় গিয়ে শুনি তোমরা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছ। তখন কেমন সন্দেহ জাগল মনে। ভাবলাম এখানে একবার ঢুঁ মেরে যাই।
আর এসেই অ্যাবনারের খপ্পরে পড়ে গেলে, মন্তব্য করলাম আমি। যাকগে, এখন এখান থেকে কী করে কেটে পড়ব সে বুদ্ধি বের করা যাক। তোমার মাথায় খেলছে কিছু?
অ্যাবনারকে ধরে ধোলাই লাগাতে হবে, বলল ল্যারি।
ও কিন্তু জাদুকর ভুলে যেয়ো না। সাবধান করে দিল কারা। আর উন্মাদ।
ওই জানালাটা ভাঙব, বললাম আমি। ফ্লাশলাইট দিয়ে কাজটা করব।
কাচ ভাঙার বিকট শব্দ হবে, বলল ল্যারি।
ট্রাপডোর-টোর আছে কিনা একবার চক্কর লাগিয়ে দেখি।
কীভাবে এখান থেকে পালাব সে চেষ্টায় লেগে গেলাম। আমার খুব লজ্জা লাগছিল। আমার জন্যই তো ওরা বিপদে পড়েছে। ওদেরকে আসলে অ্যাবনারের ব্যাপারে কিছু বলা উচিত হয়নি। পুরো ব্যাপারটাই গোপন রেখে অ্যাবনারের সঙ্গে একাই লড়তে যাওয়া উচিত ছিল। তবে যা হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আমার কর্তব্য হলো কারা এবং ল্যারিকে বিপদের কবল থেকে রক্ষা করা।
ল্যারিকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়ার পরে সেলারের দরজায় তালা লাগিয়ে রেখেছে কিনা অ্যাবনার কে জানে। আমি নিশ্বাস বন্ধ করে, পা টিপে টিপে সিঁড়ি বাইতে লাগলাম। মোচড় দিলাম দরজার নবে। বন্ধ। তবে দরজার কব্জা খুব একটা মজবুত মনে হচ্ছে না। কব্জা খুলে ফেলার চেষ্টা করা যায়।
আবার নিচে নামার সাহস হলো না যদি সিঁড়িতে ক্যাচকোচ আওয়াজ ওঠে। আমি কারা এবং ল্যারিকে ফিসফিস করে বললাম কিছু একটা খুঁজে আনতে যা দিয়ে দরজা খোলা যাবে। কারা একটা ব্যারেট নিয়ে এল। কিন্তু ও দিয়ে দরজা খোলা গেল না।
ল্যারির চোখে পড়ল একটা পাইপ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরছে। পানিটা ধরে রাখি, বলল ও।
খাওয়া যাবে না। তবে অন্য কোনও কাজে লাগতে পারে।
আমি টিনের একটা বালতি পেয়ে গেলাম। কারাকে বালতিটা দিয়ে বললাম, তোমার পানি থিওরি পরীক্ষা করে দেখব।
আচ্ছা, পাইপের নিচে বালতি বসিয়ে দিল কারা। টিনের বালতির তলায় টপ টপ করে পানি পড়ছে। তবে শব্দটা বড্ড বাজছে কানে। কারা একটা ছেড়া ত্যানা পেতে দিল বালতির তলায়। পানি পড়ার শব্দ এবার ভোঁতা শোনাল। কারার চেহারা শুকনো। আমি জানি ও কী ভাবছে। ও আমার মতই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ আদৌ কি আমরা এখান থেকে কোনদিন ছাড়া পাব?
তীব্র হতাশায় আমি একটা কড়িকাঠে লাথি কষালাম। লাথিটা এত জোরে লাগল, থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা বাড়ি। শব্দ শুনে অ্যাবনার ছুটে এল সেলারে। রেগে বোম।
এখানে এত চেঁচামেচি কীসের? তোমাদেরকে কিছু বলছি না বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ?
কিছু বলছ না-? রাগে আমার গলা বুজে এল।
এখন আর কৈফিয়ত দিতে হবে না, বাধা দিল অ্যাবনার। যথেষ্ট হয়েছে, আর না।
অ্যাবনার হাত নাড়তেই হাতে চলে এল লম্বা একটি রশি। কোচকানো চামড়ার একটা আঙুল তুলল সে কারার দিকে। এগিয়ে আসতে বলছে। কারা আমার পেছনে লুকাল।
অ্যাবনার, তোমাকে বলেছি না ওকে ছেড়ে দিতে।
আচ্ছা, তাই নাকি, মাইকেল? তোমরা এখনও বুঝতে পারনি যে চাইলে বহু আগেই তোমাদেরকে আমি আঘাত করতে পারতাম? এসব করছি তোমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই। তোমরা বিপদমুক্ত থাকবে। কদম বাড়াল সে, কারার দিকে বাড়িয়ে দিল হাত। এদিকে এসো, ডিয়ার।
ল্যারিও আমার পাশে চলে এসেছে। হাতে এখনও কমলার রসের ক্যান। আমার হাতে ধরা ফ্লাশলাইটের দিকে ইশারা করল। জানি ও কী করতে চাইছে-
অ্যাবনারের মাথায় ধাঁই করে ওটা বসিয়ে দেয়ার মতলব করেছে ল্যারি। কিন্তু ওকে বলতে পারলাম না যে এতে কোনও লাভ হবে না।
ল্যারি যাতে ফ্লাশলাইটটা না নিতে পারে সেজন্য ওটা মুঠিতে আরও শক্ত করে ধরলাম। তবে আমার উদ্দেশ্যটা ও বুঝতে পারেনি। তাই খামোকা টানাটানি করতে লাগল ফ্লাশলাইট ধরে। আর এটা করতে গিয়ে কন্টেনারের সমস্ত কমলার রস ছলকে গিয়ে পড়ল অ্যাবনারের গায়ে।
যন্ত্রণা এবং ব্যথায় তারস্বরে চিৎকার দিল অ্যাবনার। মোচড় খাচ্ছে শরীর। বাঁচাও! কোনমতে বলল সে। আমার গায়ে আগুন ধরে গেল!
আমরা আগুন দেখতে পেলাম না তবে কাঠ পোড়ার সময় যেমন পটপট শব্দ হয় তেমন আওয়াজ শুনতে পেলাম, সেইসঙ্গে মাংস পোড়ার গন্ধ। আমাদের চোখের সামনে কুঁচকে যেতে লাগল অ্যাবনারের শরীর। এসিড! আর্তনাদ করছে সে। এসিড আমার মাংস পুড়িয়ে দিল!
দৃশ্যটা ভীতিকর। আমরা তিনজনই বাক্যহারা হয়ে গেছি। নড়াচড়া করতে পারছি না। অবশেষে কারা ড্রিংকের খালি কন্টেনারের লেবেল পরীক্ষা করে দেখে বলল, ওটা এসিড ছিল। কমলার রসে অ্যাক্সকরবিক এসিড আছে। অ্যাবনারের শরীর- মানুষের মত নয়। তরল পদার্থটা ওর গা পুড়িয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ল্যারি। চলো, বেরিয়ে পড়ি। জানালাটা যেন কোনদিকে?
নোংরা জানালাটার নিচে হাবিজাবি অনেক জিনিস পড়ে ছিল। আমরা ওগুলো সরিয়ে ফেললাম। তারপর চেয়ারগুলো নিয়ে এলাম জানালার নিচে। কিন্তু ওগুলো কেমন ল্যাগব্যাগ করে কাঁপতে লাগল। যেন খাদে পড়েছে। আমি মেঝেতে ফ্লাশলাইটের আলো ফেললাম। দেখলাম চেয়ারগুলো যেখানে রেখেছি তার নিচে একটি পুরানো কবর। ঝুঁকে বসলাম। কবরের গায়ে খোদাই করা কয়েকটি কথা : এখানে ঘুমিয়ে আছে অ্যাবনার হিকসের আদি আত্মা। কোন সন-তারিখ কিছু নেই।
ভাবলাম জাদুকর অ্যাবনার কি এখানেই থাকত? সে কি অন্য কোন অ্যাবনার হিকসের আত্মীয় ছিল? নাকি সে মৃত কোনও ব্যক্তির নাম নিয়েছিল একটা পরিচয় পাবার জন্য?
কারা এবং আমি মিলে শক্ত করে ধরলাম চেয়ার। ল্যারি চেয়ারে উঠে জানালার হুড়কো খুঁজে বের করল। হুড়কো বন্ধ নয়, শুধু বহুদিন খোলা হয় না বলে জং ধরে ধুলোয় আটকে রয়েছে। ওটাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পরে খোলা গেল জানালা।
জানালা গলে প্রথমে বেরুল ল্যারি, তারপর কারা। আমি বেরুবার আগে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। যেখানে অ্যাবনার দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে তার কোনও চিহ্ন নেই। এক্কেবারে কিছু নেই।
সে যে এখানে ছিল তার সামান্যতম নিশানাও নেই।
বারো
অ্যাবনারের মত সুপার ন্যাচারাল জিনিসের বোধহয় কোনদিন মৃত্যু হয় না। হয়তো এরা বেঁচে থাকে অনন্তকাল।
যা ঘটেছে সব অ্যাবনারের জন্য। তার সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়েছে বলে আমি আফসোস করছি না। সে আমাকে আরেকটি ডাইমেনশন সম্পর্কে জানিয়ে দিয়ে গেছে, পৃথিবীর একটি অংশ যার অস্তিত্বে আমি এখন বিশ্বাসী।
সে কি সত্যি আমার এবং আমার বন্ধুদের ক্ষতি করত? আমি জানি না। সে সেন্টারভিলের মত ছোট শহরের শাসনকর্তা হতে চেয়েছিল। এ জন্য লোকটাকে দোষ দেয়া যায় না। কারণ আমাদের শহরটি খুব সুন্দর, মানুষজনও চমৎকার। তার উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ ছিল, সে তার লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তবে সে যা চেয়েছে চাওয়াটা ভুল ছিল। পদ্ধতিটিও ছিল ভুল।
হয়তো অ্যাবনার মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান চেয়েছে। আশা করেছে গোটা একটা শহরের মানুষ তার প্রতি অনুগত রইবে। এরকম মানুষের অভাবও নেই। আমার প্রতি তার রুষ্ট হওয়ার কারণ আমি তার স্বপ্নটাকে চুরচুর করে দিয়েছি, যে জাদুর বাসত্মবায়ন সে করতে পারেনি।
অ্যাবনারের একটা কথা খুব মনে পড়ছে। সে প্রায়ই বলত জ্ঞানই শক্তি। শক্তিই আসলে আসল কথা।
আমি এখন প্রচুর খেটে পড়াশোনা করি। আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো যথাসময়ে সেরে ফেলি। আমি, মাইকেল ডেন, পৃথিবীর সেরা ছাত্রটি এখনও নই, তবে বুড়ো অ্যাবনারকে ধন্যবাদ, আমি এখন পড়াশোনায় আগের চেয়ে ভালো করছি।
অনুবাদ : অনীশ দাস অপু
এক
আমি মাইকেল ডেন, বয়স ১২, নিজেকে আমি পৃথিবীর সেরা ছাত্র বলে দাবি করি না। আমি এমনকী সেন্টারভিল জুনিয়র হাই স্কুলেরও সেরা ছাত্রটি নই। বরং আমি সেরা ছাত্রের প্রতিযোগিতার দৌড়ে অনেক পিছিয়ে আছি। অবশ্য ভালো ছাত্র হওয়ার জন্য সারা দিনরাত ঘাড় গুঁজে পড়াশোনা করতে আমার ভালোও লাগে না। আমার শিক্ষকরা মাঝেমধ্যে বলেন আমার মধ্যে নাকি সম্ভাবনা আছে। তবে যদি এরকম কথা শুনি, সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও তোমার নেই, তখন বড্ড রাগ হয়। আমি চিৎকার-চেঁচামেচি করে ঘর ফাটিয়ে ফেলি। আর আমার বাবা-মা যখন গতবারের রিপোর্ট কার্ড দেখলেন, তখন একই কাণ্ড করে বসলেন তাঁরা।
তোমরা হয়তো ভাবছ পড়াশোনার পেছনে প্রচুর আমার খাটনি করা উচিত। তাহলে কেউ আমাকে খোঁচা মেরে কথা বলার সুযোগ পাবে না। তবে আমার ব্যাখ্যাটা একটু অন্যরকম : পড়াশোনা তো সবসময়ই করা যাবে। অংক, বিজ্ঞান এবং ইতিহাস কখনোই পিছু ছাড়বে না। কিন্তু জেভি বাস্কেটবল খেলা, টিভিতে দারুণ কোন খেলা দেখা এসব সুযোগ তো আর বারবার আসে না। গত শুক্রবার আমাদের কোচ নেলসন বললেন আমার গ্রেড বাড়াতে হবে, নইলে দল থেকে বাদ পড়ে যাব। আর এমনটি হলে আমার বাবা-মা হয়তো আগামী ত্রিশ বছর আমার জন্য টিভি দেখাই বন্ধ করে দেবেন।
তবে একটা কাজ কখনও বাদ দেব না। তাহলো খবরের কাগজ বিলি করা। এটা আমার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন। বাবা প্রায়ই বলেন, পৃথিবীতে ফ্রি লাঞ্চ বলে কিছু নেই। কোনও কিছু কিনতে হলে ওটার জন্য তোমাকে পকেটের পয়সা খরচ করতে হবে এবং এ জন্য ইনকাম করা জরুরী। আমার চাহিদা অবশ্য খুব বেশি নয়- আমি বেসবল কার্ড জমাই, মাঝে মাঝে ফার্স্টফুড খাই (মা এসব খাবার কখনোই কিনে দিতে চান না), এ ছাড়া আরও ছোটখাট অনেক শখ আছে যেগুলো পূরণের জন্য পয়সাপাতি লাগে। তাই আমি প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগে ঘুম থেকে জাগি। সেন্টারভিলের বাসিন্দাদের বাড়িতে ভোরের কাগজ পৌঁছে দিতে বাই-সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়।
গতকাল সকালে আমার কাগজ সরবরাহের তালিকায় যোগ হয়েছে একটি নতুন নাম : অ্যাবনার হিকস। এ নামটা আগে কখনও শুনিনি। তবে ২০০, মেইন স্ট্রীটের ঠিকানাটা চেনা চেনা লাগছিল। এটা কি সেই ভুতুড়ে জায়গাটা যেখানে ভুলেও কেউ পা মাড়ায় না? ধ্যাত, ওরকম পরিত্যক্ত একটা বাড়িতে কে বাস করতে যাবে?
সাইকেলে লাফ মেরে উঠে পড়লাম আমি। বনবন করে প্যাডেল চাপতে লাগলাম। শুরু হয়ে গেছে আমার কাজ। কিন' শেষ স্টপেজে পৌঁছে ধক্ করে উঠল বুক। আরি, সেই বাড়িটাই তো। প্রাচীন, করুণ ম্লান চেহারার বাড়িটি। রং জ্বলে গেছে। সামনের উঠোনে এক হাত লম্বা আগাছা।
মেইন স্ট্রীটের একদম শেষ মাথায় বাড়িটি। শিশু-কিশোরদের ধারণা এটা হানা বাড়ি। আমিও ওদের দলে। বিলি স্মিথের বাবা একবার আমাদের নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছিল প্রমাণ করতে যে আমরা খামোকাই ভয় পাচ্ছি। সেদিন অবশ্য কিছুই ঘটেনি। তবে আমার মনের খচখচানি দূর হয়নি তাতে। দিনের বেলা তো আর ভূত দেখা যায় না। বিশেষ করে মি. স্মিথের মত মানুষ সঙ্গে থাকলে ভূতের বাপও ধারে কাছে ঘেঁষার সাহস পাবে না। লোকটা প্রায় সাত ফুট লম্বা। বেশ আমুদে স্বভাবের। তবে তুমি শয়তানের চেলা হলেও এই দৈত্যের সঙ্গে নিশ্চয় লাগতে যাবে না।
আমি বলছি না যে ভুতুড়ে বাড়ি-টাড়িতে আমার বিশ্বাস আছে। আমি ২০০, মেইন স্ট্রীটের সামনে এসে খবরের কাগজটা হাতের মধ্যে পাকিয়ে ভাঙাচোরা বারান্দায় ছুড়তে যাচ্ছি, থেমে গেলাম মাঝ পথে। জীর্ণ-শীর্ণ একটি দোলনা চেয়ারে বসে রয়েছে ধূসর চুলের, লম্বা দাড়িঅলা এক লোক। সন্দেহ নেই এই-ই অ্যাবনার হিকস।
গুড মর্নিং, মাইকেল, বলল সে।
জমে গেলাম আমি। আমার নাম জানে বলে নয়, নিউজ পেপারের সাবস্ক্রিপশন বিভাগের লোকেরা তাকে হয়তো আমার নামটা বলেছে। আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার কারণ লোকটার কণ্ঠ। এরকম ভয়ংকর, ঘ্যাসঘেসে গলা জীবনে শুনিনি। আমি প্রচুর হরর ছবি দেখেছি। এ লোকের কণ্ঠ সেসব ছবিকে ছাপিয়ে গেছে। ছবি দেখা এক জিনিস আর সেরকম ভীতিকর কারও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক জিনিস। এখান থেকে কেটে পড়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন' অ্যাবনারের পরের কথাটা আমাকে আঁঠার মত আটকে রাখল নিজের জায়গায়।
স্কুল নিয়ে খুব ঝামেলায় আছ, না? খুবই লজ্জার কথা। জ্ঞানই শক্তি। এ কথা ভুললে চলবে না।
এমন অবাক হয়েছি, মুখের জবান গেছে বন্ধ হয়ে। আমি যে স্কুলে খারাপ রেজাল্ট করছি এ লোক তা জানল কী করে? আমি বিষয়টি জিজ্ঞেস করব ভাবছি, এমন সময় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল অ্যাবনার, খুলল সামনের দরজা, ঢুকে গেল ভেতরে। তার হাতে একটা খবরের কাগজ। হঠাৎ মনে পড়ল, আরি, আমি তো লোকটাকে এখনও কাগজ দিইনি। তাহলে সে কাগজ পেল কোত্থেকে? আর কিছু ভাবতে চাইলাম না। যত দ্রুত সম্ভব প্যাডেল মেরে রওনা হয়ে গেলাম স্কুলে। দীর্ঘদিন পরে, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, স্কুলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
তবে সেদিন আরও অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
যারা অংক পারে না তাদের জন্য এ বিষয়টি মূর্তিমান আতংক। মিস রেনল্ডসকে বললাম হোমওয়ার্ক আনতে ভুলে গেছি। তিনি কান লাল হয়ে যাওয়া এমন সব মন্তব্য করলেন, কয়েকটা ছেলে হো হো করে হেসে উঠল। ক্লাসের সবার সামনে কাউকে অপমান করা শিক্ষকদের কখনোই উচিত নয়। ক্লাসের সবার উচিত হতভাগ্য ছাত্রটির জন্য সমবেদনা জানানো। নইলে ছাত্রটি আরও বেশি শরমিন্দা হয়। কোচ নেলসন যখন প্রাকটিসের সময় কোনও ছাত্রকে বকাবকি করেন নিশ্চিত একটি শট মিস করার জন্য, আমি ওই ছাত্রটিকে নিয়ে কখনো হাসাহাসি করি না।
মি. বেনটন ইতিহাস ক্লাসে একটা কুইজ দিয়েছিলেন। পড়া শিখে আসতে বলেছিলেন। মুশকিল হলো আমি ইতিহাস বইটি লকারে ফেলে এসেছি। একটা অধ্যায়ের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ার ইচ্ছেও তেমন করছিল না। আর কুইজটা হলো রচনামূলক প্রশ্নের মত। মাল্টিপল চয়েসের মত প্রশ্ন নয়।
প্রথম প্রশ্নটি দেখেই আমার ঘাম ছুটতে শুরু করল। যে জিনিস সম্পর্কে কিছুই জানি না তা জানার ভান করা মোটেই সহজ কাজ নয়। আর মি. বেনটনকে বোকা বানানোর চিন্তা করাটাই বোকামী। ইতিহাসের ব্যাপারে এই লোককে বলা চলে চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও কঠিন। আমি কীভাবে জবাব লিখব ভেবে মনে মনে মাথা কুটে মরছি, এমন সময় হলওয়েতে চোখ তুলে চাইতেই বেদম চমকে গেলাম। অন্ধকার কোনে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। অ্যাবনার হিকস। মুখে অদ্ভুত হাসি এঁটে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। এ লোক এখানে কী করছে? শিউরে উঠলাম। লোকটাকে দেখলেই ভয় লাগে।
আজ সারাদিন খুব খাটনি গেছে। তাই ক্লান্ত লাগছিল। ক্লাস রুমের দেয়ালগুলো যেন চেপে আসছিল চারদিক থেকে। তাজা বাতাসে নিশ্বাস নিতে হাঁকপাক করছিল বুক। কিন্তু দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে অ্যাবনার। কার জন্য অপেক্ষা করছে? আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। প্রায় শূন্য খাতা জমা দিলাম ইতিহাসের শিক্ষকের কাছে, ফিরে এলাম নিজের ডেস্কে। বসলাম। হাত দিয়ে চেপে ধরলাম মাথা। মাথাটা বেশ ব্যথা করছে।
খানিক পরে শুনলাম যেন মি. বেনটন আমার লেখার তারিফ করছেন। হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। চেয়ার থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। কেন জানি না, চোখ চলে গেল করিডরে। খালি। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম-হঠাৎ খিকখিক ভয়াল একটা হাসি ভেসে এল কানে। অ্যাবনার, কোনও সন্দেহ নেই। সে যেভাবেই হোক আমার খাতার লেখা বদলে দিয়েছে। কিন্তু কীভাবে? এবং কেন?
ঢং ঢং শব্দে ঘণ্টা পড়ল। আমার চিন্তার সুতোটা ছিড়ে গেল। চমৎকার লিখেছ, মাইকেল, শুনলাম বলছেন ইতিহাসের শিক্ষক। যেসব ছাত্র জীবনেও আমার দিকে ফিরে তাকায়নি তারাও আমার দিকে ফিরে মৃদু হাসল, প্রশংসার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। এদের মধ্যে ট্রেসি স্কটও রয়েছে, আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্রী। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বেশ ভালো লাগছিল আমার। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য অ্যাবনার হিকসের চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করে দিতে পারলাম।
তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়।
দুই
আমার খুব ঘনিষ্ঠ কোনও বন্ধু নেই। ছিল একজন। ল্যারি অ্যান্ড্রুজ। গত বছর নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে অন্য শহরে চলে গেছে ওরা। চাকরি, স্কুল এবং খেলাধুলা নিয়ে কেটে যাচ্ছে আমার ব্যস্ত সময়। খেলার টিমের সবার সঙ্গেই আমার বেশ ভালো একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। তবে ল্যারির মত মধুর সম্পর্ক নেই কারও সঙ্গে। ও ছিল আমার ভাইয়ের মতো। আমরা প্রায়ই দুজনে ফোনে কথা বলতাম। ও আমাদের পাশের বাসাতেই থাকত।
ল্যারিদের বাড়িটি যারা কিনে নিয়েছে সে পরিবারটি মন্দ নয়। যদিও ও বাড়ির মেয়ে কারার প্রতি আমি খুব একটা আকর্ষণ বোধ করি না। ওর বয়স এগার, এমন ভাব দেখায় যেন সবজান্তা শমসের। এরকম মেয়েরা কেমন হয় জানোই তো : এদেরকে সব জায়গায় দেখতে পাবে তুমি। বিরক্তিকর। আমি সেদিন সাইকেল নিয়ে ফিরছি, ঝট্ করে খুলে গেল কারাদের বাড়ির দরজা। বেরিয়ে এল ও। যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
করে তো ফেলেছই, আমি দ্রুত গ্যারেজে ঢোকালাম সাইকেল। কেটে পড়তে চাইছি তাড়াতাড়ি। আমার কাছে যে জিনিসটা সবচেয়ে বিরক্তিকর ঠেকে তা হলো লোকের প্রশ্নের জবাব দেয়া। তাছাড়া কারার সময় নির্বাচন ভুল হয়ে গেছে। আমার প্রিয় টিভি শো শুরু হয়ে যাবে যে কোনও মুহূর্তে।
যা বলার জলদি বলো, তাড়া লাগালাম আমি।
সেদিন কয়েকটা ছেলে বলল এখানে নাকি একটা হানাবাড়ি আছে। ভাবছিলাম ঠাট্টা করছে। কিন্তু চেহারা দেখে মনে হলো খুব সিরিয়াস।
হানা বাড়িটাড়িতে তুমি বিশ্বাস করো নাকি? প্রায় ঘেউ করে উঠলাম আমি। আমার স্মৃতিতে ভিড় করল অ্যাবনারের চেহারা- বারান্দায়, হলওয়েতে। এ চেহারাটা আমি ভুলে থাকতে চাই। কারাকেও কাছে ঘেঁষার সুযোগ দিতে চাই না।
তোমার কী হয়েছে? মনে হচ্ছে যেন ভূত দেখেছ।
আমি বড্ড ক্লান্ত। এবং ক্ষুধার্ত। এসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দাও গে।
এমন সময় মা উঁকি দিলেন দরজা দিয়ে। অ্যাই তোমরা ভেতরে এসো। তোমাদের জন্য কোকো বানিয়েছি।
কারা আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে হাসল।
আমি আজ বিকেলটা তোমাদের বাসায় থাকব। মা বেথকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে। বেথ কারার ছোট বোন। বয়স চার।
আমার খুব রাগ হলো। কিন্তু এখন রাগ দেখানো যাবে না। সারাটা দিন কারার সঙ্গে থাকা! উফ্, কল্পনাই করা যায় না। কোথায় ভাবলাম মজা করে টিভি দেখব। এখন মার জন্য এমন একজনের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলতে হবে যাকে এ মুহূর্তে আমার অসহ্য ঠেকছে।
কোকো খুব গরম, ঠোঁটে ছোঁয়ানো যায় না। নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। বরদাশত করবেন না মা। কারণ ঘরে অতিথি রেখে নিজের ঘরে বসে কোকো পান মার কাছে চরম অভদ্রতা। মা হয়তো আমাকে বকাঝকা করবেন। আমিও মাকে বলব কারাকে তো আর আমি দাওয়াত দিয়ে বাসায় নিয়ে আসিনি। তবে এসব কিছুই ঘটল না। কারণ পুরোটাই আমি কল্পনা করছিলাম।
যা হোক, বসে রইলাম আমি এবং শুনতে হলো কারা গর্ব করে বলছে কোন্ কোন্ বিষয়ে সে A পেয়েছে এবং Excellent পেয়েছে। কারা অবশ্য প্রচুর পড়াশোনা করে। আমার তো মনে হয় পড়ালেখা ছাড়া ও আর কিছুই করে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম ও আমার ইতিহাসের খাতার দিকে তাকিয়ে আছে। খাতাটা আমি নোটবুকে ঢুকিয়ে রেখেছি।
আমি ইতিহাসে এবারে A-Plus পেয়েছি, বললাম আমি। মা, সিঙ্কে একটা প্লেট ধুচ্ছিলেন, ঝট করে ঘুরলেন, মাইকেল, এমন খুশির খবর তুই আগে দিসনি কেন?
কারণ এতে আমার কোনও কৃতিত্ব নেই, মনে মনে বললাম আমি। যা ঘটেছে তার ব্যাখ্যা কী? আমি যদি পরীক্ষার পড়া পড়তামও তবু কি এত ভালো করতে পারতাম? উঁহু, পারতাম না। মা এখন থেকে আশা করবেন আমি সব বিষয়ে এরকম নাম্বার পাব। কিন' সেটা আর কখনও ঘটবে না। কারার ওপর খুব রাগ হচ্ছে আমার। ও ফরফর করে নিজের রেজাল্টের কথা বলতে গেল কেন? আর নিজেকে লাথি মারতে ইচ্ছে করল পরীক্ষার খাতাটা লুকিয়ে রাখিনি বলে। অবশ্য ওটাকে এখুনি ছিড়ে ফেলার ইচ্ছে আমার নেই। আগে পড়ব ওতে কী লেখা আছে।
মা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হাসিতে উজ্জ্বল মুখ। বাড়িয়ে দিয়েছেন হাত খাতা দেখার জন্য। আমি নোটবুক থেকে বের করলাম খাতা। অচেনা হাতের লেখা খাতায়। আমার লেখা নয়। তবে লেখাটা পড়া গেল না মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন বলে। খাতায় লেখা মন্তব্যে মার চোখ আটকে গেল।
জ্ঞানই শক্তি। A.H। ঠিকই লিখেছে। কিন্তু এই A.H টা কে?
আমি বিড়বিড় করে বললাম এ নামে নতুন একজন এসেছে স্কুলে। কথাটা কিন্তু পুরোপুরি মিথ্যা নয়।
পাজির পা ঝাড়া কারা গলা বাড়িয়ে খাতা দেখল। এটা কী রকম হাতের লেখা? যেন মধ্যযুগের কেউ লিখে দিয়েছে।
ধরে নাও এটা একটা জোক, আমি মার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিলাম খাতা। তারপর সিড়ি বেয়ে এক ছুটে দোতলায়, আমার ঘরে। বন্ধ করে দিলাম দরজা। তাকালাম আয়নায়। কারা ঠিকই বলেছে। আমাকে বিধ্বস্ত এবং ভীত দেখাচ্ছে। আমি তো সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম।
বিছানায় বসলাম। একা ঘরে স্বস্তি লাগছে। চোখ বুলালাম চারপাশে। ঘর যেমন রেখে গিয়েছিলাম তেমনই আছে। কিন্তু আমার মনটা ঠিক নেই। এরকম অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি জীবনে হইনি কোনদিন। পুরো ব্যাপারটা এখনও মাথায় ঢুকছে না। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার কেউ নেই।
দরজায় নক্ হওয়ার শব্দে লাফিয়ে উঠলাম। মা।
কী হয়েছে রে, মাইকেল?
কিছু হয়নি, মা। খুব ক্লান্ত লাগছে। একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম।
ঠিক আছে। রেস্ট নে। কিছু দরকার হলে জানাস।
আচ্ছা, পরীক্ষায় ভালো মার্কস পেলে কতকিছু থেকে সহজে উতরে আসা যায়। অন্য দিন হলে মা এত সহজে আমাকে ছাড়তেন না।
এ কথা সত্যি খুবই ক্লান্ত লাগছে শরীর। আমি বোধহয় বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে দেখি রাত নেমে গেছে। টেবিলে রাখা ঘড়িতে তাকালাম। রাত তিনটে বাজে! বাপরে, কুম্ভকর্ণের ঘুম বোধহয় একেই বলে।
খিদেয় চোঁ চোঁ করছে পেট। প্রায় নিশব্দে মুখ হাত ধুয়ে নিলাম যাতে কারও ঘুম না ভাঙে। মস্ত এক বাটি দুধ এবং সিরিয়াল নিলাম। আর বিছানায় যেতে ইচ্ছে করল না। তারচেয়ে আজ বরং একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি। খবরের কাগজগুলো দিয়ে আসি। এত সকালে কাগজ বিলি করতে চাওয়ার কারণ আমি অ্যাবনারের মুখোমুখি হতে চাই না। ওই লোকের এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই বলেই আমার ধারণা।
কাগজ বিলি করার জায়গায় আজ ভোরে সবার আগে পৌঁছালাম। আমার বাড়ি ফেরার রাস্তার উল্টো দিকে হলেও ২০০, মেইন স্ট্রীটে গেলাম। অ্যাবনারের চিহ্ন নেই। একটা খবরের কাগজ ছুঁড়ে দিলাম লোকটার বাড়ির সামনের বারান্দা লক্ষ্য করে। ওটা ঠিক জায়গায় পড়ল কিনা ফিরে দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না। চেপে রাখা গভীর একটা দম ফেললাম সশব্দে। বুদ্ধিটা মন্দ ছিল না আমার। নিজেই নিজেকে বাহবা দিলাম। মন বলছে আজ দিনটা ভালো যাবে আমার।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে উবে গেল খুশি। গত রাতে হোমওয়ার্ক না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। আতংক বোধ করলাম। ইংরেজি একটা রচনা লিখতে হবে, ১০টা অংক করা বাকি, বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের জন্য খসড়াও তৈরি করা হয়নি-এ বিষয়গুলো নিয়ে তো একদমই ভাবিনি। একটি হোমওয়ার্কও বাদ দেয়া যাবে না। এদিকে কাগজগুলোও বিলি করতে হবে।
আমাদের ইংরেজির শিক্ষয়িত্রী মিস ফ্রাংকলিন খুবই কড়া। ক্লাসে ঢুকে দেখি ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের হোমওয়ার্কের খাতা মিসের টেবিলের একটি ঝুড়িতে রেখে দিয়েছে। আমি মানসিক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে মিস ফ্রাংকলিনের কাছে গেলাম। বললাম অসুস্থ ছিলাম বলে রচনাটা লিখতে পারিনি।
মানে! অবাক হলেন মিস ফ্রাংকলিন। তোমার রচনাটা তো সবার ওপরে রেখেছ দেখছি।
নিজের চোখকে বিশ্বাস হলো না। আমারই হাতের লেখা, ঝরঝরে ভাষায় রচনাটি কেউ খাতায় লিখে রেখেছে। টের পেলাম টকটকে লাল হয়ে যাচ্ছে আমার মুখ। কারণ মিস ফ্রাংকলিন বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন আমার দিকে। মাইকেল, কী হয়েছে? তুমি কি কিছু বলবে আমাকে?
আমি পিছিয়ে যেতে লাগলাম নিজের ডেস্কের দিকে যেন যত দূরে যেতে পারব, বিব্রতকর এ পরিস্থিতি থেকে ততই রক্ষা পাব। আ:, না, না। আমি ঠিক আছি। বোধহয় ভুলেই গেছিলাম যে রচনাটা লিখেছি। অসুস্থ হওয়ার আগে আসলে রচনাটা লিখে রেখেছিলাম।
আমার বিড়বিড়ানি বোধহয় কেউ শুনতে পায়নি। নিজেকে আমার হতবুদ্ধি এবং নির্বোধ মনে হচ্ছিল।
তবে ঘটনার শেষ এখানেই নয়। আমার অংকও কেউ কষে রেখেছে। বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের খসড়াও তাই। খেলার মাঠে প্রাকটিস শেষে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফিরছি, ভাবছিলাম কোন্ দেবদূত এসে আমার কাজগুলো করে দিয়ে গেল? অবশ্য কেউ করে দিতেও পারে। কারণ আমি তো ছেলে মন্দ নই। আমাকে দেবদূতরা পছন্দ করতেই পারে।
আমি সাধারণত স্কুল ছুটির পরে শটকার্ট একটা রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরি। এ রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। আমার বাবা-মাও জানেন না আমি শটকার্ট মেরে দিই। তবে নির্জন এ রাস্তায় ঢুকে আমার সাইকেলের গতি বেড়ে গেল। সূর্য ডুবছে। আর আঁধার ঘনাবার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা কেমন ভুতুড়ে হয়ে ওঠে।
সাইকেলের সামনের চাকায় ছেড়া এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে গেছে। ব্রেক কষলাম। টুকরোটা ফেলে দিতে সামনে ঝুঁকলাম। এমন সময় চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলাম গাছের পেছনে কেউ নড়ে উঠল। লোকটাকে দেখামাত্র পাঁজরের গায়ে দমাদম বাড়ি খেতে লাগল হৃৎপিণ্ড।
দুঃখিত, আজ সকালে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। হোমওয়ার্ক করতে প্রচুর সময় দরকার। এমনকী আমারও অনেক সময় লেগে যায়। তবে আশা করি, তোমার শিক্ষকরা তোমার হোমওয়ার্ক দেখে খুশিই হয়েছেন।
অস্বীকার করব না ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিল বুক। তবে অ্যাবনারকে বুঝতে দিলাম না ভয় পেয়েছি। আমি বুড়ো লোকটার চোখে চোখ রাখলাম। আপনি কে এবং কী চান? আপনি আমার হোমওয়ার্কগুলো কেন করে দিচ্ছেন? সেন্টারভিলে বাচ্চার তো অভাব নেই। কিন্তু আমি কেন?
খিকখিক হাসল লোকটা- করিডরে ঠিক এরকম বিশ্রী হাসির শব্দ শুনেছিলাম আমি। গায়ে কাঁটা দিল।
তোমার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় হয়নি আমার। তবে তুমি বোধহয় আমার নাম জান। আমি অ্যাবনার হিকস। এটা তোমার প্রথম প্রশ্নের জবাব। আর আমি কী চাই তা যথাসময়ে জানতে পারবে, খোকা। যথা সময়ে।
অদৃশ্য হয়ে গেল সে। সেই সঙ্গে আমার লোক দেখানো সাহসও। ভয়ের চোটে এমন কাঁপুনি উঠে গিয়েছিল শরীরে, সাইকেলেই চড়তে পারছিলাম না। প্যাডেল মেরে বাড়ি ফিরছি, মসি-ষ্কে বারবার ধাক্কা দিল অ্যাবনারের উন্মাদ হাসি।
তিন
বেদম হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরলাম। কারা ওর বেডরুমের জানালা দিয়ে উঁকি দিল।
কী ব্যাপার এমন হাঁপাচ্ছ কেন? তোমার হ্যা হ্যা শব্দে আমি পড়ায় মন দিতে পারছি না। বুড়োদের মত তুমি হাঁপাচ্ছ, মাইকেল।
ওরকম ভয়ানক একটা লোককে দেখলে প্রাণের দায়ে সাইকেল ছুটিয়ে এলে তুমিও কম হাঁপাতে না, মনে মনে বললাম আমি। ল্যারির কথা মনে পড়ে গেল আমার। এ মুহূর্তে ওকে খুব দরকার ছিল। ল্যারি থাকলে বিষয়টি নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলা যেত। মা-বাবা বলেছেন খুব বেশি প্রয়োজন হলে ল্যারিকে ফোন করতে পারি। ওকে ফোন করা খুবই দরকার।
প্রথম রিংয়েই সাড়া দিল ল্যারি। ওর গলা শুনে স্বস্তির ফল্গুধারা বইল শরীরে।
ল্যারি, আমি।
মিকি, কেমন আছ তুমি?
ভালো। তুমি?
চলছে একরকম। কথা বলার সময় হবে?
তোমার জন্য আমার সময় অফুরান। বলে ফেলো।
এই হলো ল্যারি। যখনই দরকার, কাছে পাওয়া যায় ওকে। দূরে থাকলেও ছুটে আসে। অ্যাবনারের কথা বললাম ওকে, অদ্ভুতুড়ে যেসব ঘটনা ঘটছে তার বিশদ বর্ণনা দিলাম। একটা কথাও অবিশ্বাস করল না ল্যারি। এই হলো ল্যারি।
তো তুমি এখন কী করতে বলো? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
আমার মনে হয় তোমার সাবধানে থাকা উচিত। লোকটা নির্ঘাত পাগল। তুমি বরং অন্য কোনও কাজের ধান্ধা খোঁজো।
ভুলে যাচ্ছ কেন যে এটা সেন্টারভিল। আর আমার বয়স মাত্র ১২। শিশু শ্রম আইন বলেও একটা জিনিস আছে, তুমি জানো।
বেবি সিটিং-এর চেষ্টা করে দেখতে পার।
বেবী সিটিং-এর কাজ একবারই জীবনে করেছিলাম আমি। বছর দুই আগে। জেঙ্কিন ভাইদেও বেবি সিটার হয়েছিলাম, ওদের একজনের বয়স তিন অপরজন পাঁচ। ওরা এমন দুষ্টু, ঘরদোর ভেঙে ফেলার জো করেছিল। তারপর আমার ওপর হামলে পড়ে। আমি দ্রুত ল্যারিকে ফোন করি আমাকে এ বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য। ল্যারি সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। বাচ্চা দুটোকে ভিডিওর সামনে বসিয়ে দেয়। দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে মিসেস জেঙ্কিনস বাড়ি ফিরে দেখেন তাঁর পুত্রধনরা টিভির সামনে বসে ঘুমাচ্ছে। তিনি খুশি হয়ে আমাদেরকে বকশিস দিয়েছিলেন। মিসেস জেঙ্কিনসের সুপারিশেই বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ পৌঁছে দেয়ার কাজটা আমি পেয়ে যাই।
শুনতে পেলাম লন্ড্রি রুম থেকে মা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। ল্যারির সঙ্গে আর কথা বলা যাবে না। তাই বললাম, হেই, লার, এখন ছাড়ছি। আবার পরে কথা হবে, কেমন?
শিওর। ফোন করেছ বলে খুশি হয়েছি। যা বললাম মস্তিস্কে গেঁথে রেখো। আর আমাকে সব খবর জানিয়ো।
দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে দিলাম রিসিভার। ফিরে এলাম নিজের ঘরে। ল্যারির সঙ্গে কথা বলে ভাল্লাগছে। তবে অ্যাবনারের সঙ্গে আমার একটা বোঝাপড়া করতে হবে। তোমরা হয়তো ভাবছ বাবা-মাকে ব্যাপারটা জানালেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু বলতে গেলে নিজেই ফেঁসে যাব। বাবা-মা জেনে যাবেন আমি স্কুলের হোমওয়ার্ক ফাঁকি দিচ্ছি। আর কেউ জাদুশক্তি দিয়ে আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো করে দিচ্ছে, এ কথা যদি বড়দের কাউকে বলতে যাই, নির্ঘাত আমাকে পাগল ঠাউরে বসবে। সোজা নিয়ে যাবে মনোবিজ্ঞানীর কাছে। নাহ্, আমার সমস্যার সমাধান আমার নিজেকেই করতে হবে।
মা হাঁক ছাড়লেন। মাইকেল, কারা এসেছে।
আমি গুঙিয়ে উঠলাম। তবে সাড়া দিলাম, আসছি এখুনি। এখন আবার ও কী চায়?
কারা আধিভৌতিক বিষয় নিয়ে একটি নোট তৈরি করছে। সে আমার সঙ্গে ওই হানা বাড়িটিতে যেতে চাইছে। এমনকী ঠিকানা পর্যন্ত লিখে নিয়েছে।
কারা এমনভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল যেন আমি তার বড় ভাই জাতীয় কিছু। কারার বড় ভাই হওয়ার বিন্দুমাত্র খায়েশ আমার নেই। আমি ওকে বলতে যাচ্ছিলাম সেন্টারভিলে কোনও হানা বাড়ি নেই, ২০০ মেইন স্ট্রীটের ঠিকানায় কোন ভূত বাস করে না। ওখানে এখন মানুষ থাকে। হঠাৎ বুদ্ধি এল মাথায়। আমার একজন সাক্ষী দরকার। কারাকে দিয়ে সাক্ষীর কাজটা চালিয়ে নেয়া যায়। অ্যাবনারের বুজরুকিগুলো ও নিজের চোখে দেখুক।
কারা চোখে মুখে নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, ২০০ মেইন স্ট্রীটে আমাকে কবে নিয়ে যাবে? এবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে?
ঠিক আছে, রাজি হয়ে গেলাম আমি। রোববার চলো। সকাল এগারোটার দিকে।
খুশিতে উদ্ভাসিত হলো কারা। সত্যি বলছ? ওহ্, অনেক ধন্যবাদ!
লাফাতে লাফাতে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল কারা। আমি নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম কাজটা কি ঠিক হলো? অ্যাবনার যদি সত্যি শয়তান প্রকৃতির লোক হয়ে থাকে তাহলে? কারার কোনও সমস্যা হলে সে দায়ভার তো আমার ওপর বর্তাবে। অবশ্য কারা একরকম বাধ্য করেছে আমাকে ওখানে নিয়ে যেতে। মাঝে মাঝে দুএকটা ঝুঁকি নিতেই হয়।
আরেকটা চিন্তা মাথায় এল। কারা তো সুপার ন্যাচারাল বিষয় নিয়ে কাজ করছে। অ্যাবনার হিকসকে আমার সাধারণ কোনও মানুষ বলে মনে হয়নি। ও আসলে কে জানতে পারলে মন্দ হয় না। সাধারণ মানুষের চেহারা অ্যাবনারের মত নয়, তারা তার মত ঢঙে কথাও বলে না, চলাফেরাও করে না। এ এমন এক টাইপের মানুষ যার সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানি না। এ লোক সম্পর্কে যত বেশি জানতে পারব ততই লাভ। আমি অবশ্য লোকের ওপর নজরদারিতে তেমন পটু নই, লোকের পিছু লেগে থাকতেও চাই না। তবে এ লোকের কথা আলাদা। এ বড্ড বেশি আমার সম্পর্কে জেনে ফেলেছে।
ল্যারির পরামর্শ মাফিক কাজ করব সিদ্ধান্ত নিলাম। অন্তত খানিকটা হলেও। আমি অ্যাবনারের ভয়ে খবরের কাগজ ডেলিভারির কাজটা ছাড়তে চাই না। বরং আমার বস মিসেস স্মিথকে বলব অন্য কাউকে ২০০ মেইনের ঠিকানায় কাগজ দিতে। বুদ্ধিটা খারাপ না, কী বলো?
কিন্তু অ্যাবনার হিকস সম্পর্কে কম্পিউটারে কোনও তথ্য পেলেন না মিসেস স্মিথ। ওই ঠিকানায় কোন গ্রাহকের নামও নেই।
২০০ মেইন স্ট্রীটের বাড়িটা না পরিত্যক্ত? জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ওখানে কেউ থাকে না বলেই জানি।
জ্বী। ঠিকই শুনেছেন। কোথাও বোধহয় একটা ভুল হয়ে গেছে। সরি। মিসেস স্মিথ আমাকে এ বিষয়ে আর কোনও প্রশ্ন করার আগেই রেখে দিলাম ফোন।
পরদিন সকালে আর ওদিকে যেতে হবে না, অ্যাবনারকে দেখার ভয়ও থাকবে না, এ ভাবনা স্বস্তি এনে দিল মনে।
স্কুলে অংক ক্লাস। অংকের খাতাটা আমার কাছে ফেরত এল। কোনও ভুল নেই। এখন আর অবাক হলাম না। মিস রেনল্ডস ব্লাকবোর্ডে একটা অংকের সমস্যা লিখে ওটার সমাধান করার জন্য আমাকে আহ্বান করলেন। জানি না হঠাৎ করে তিনি আমাকে আদর্শ ছাত্র ঠাউরে নিয়েছেন কিনা নাকি আমার নির্ভুল অংক খাতা দেখে তার মনে সন্দেহ জেগেছে আদৌ ওগুলো আমি করেছি কিনা।
চেয়ার ছাড়লাম আমি, ধীর পায়ে হেঁটে গেলাম বোর্ডে। মনে মনে ভাবছিলাম এখন যদি পালিয়ে যাওয়া যেত। চকটা হাতে নিলাম, খুক খুক কেশে পরিষ্কার করে নিলাম গলা। কাশতেই থাকলাম। যদি আমার কাশির দমক দেখে এ যাত্রা রেহাই দেন মিস রেনল্ডস।
পানি খাবে, মাইকেল?
মিস রেনল্ডসের দিকে চোখ তুলে চাইতে সাহস হলো না। আমার অভিনয় তিনি ধরে ফেলেছেন কিনা তাও বুঝতে পারছি না। আমি মাথা ঝাঁকালাম, প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। মিস রেনল্ডস আরেক ছাত্রকে ডাকলেন অংকটির সমস্যার সমাধানের জন্য।
ভয়াবহ টেনশন থেকে রক্ষা পেয়ে ঠাণ্ডা, নির্জন হলওয়েটা স্বর্গের মত লাগল। পানি খাওয়ার জন্য পানির কলের দিকে পা বাড়ালাম। ঝুঁকে পানির ট্যাপের নবে মোচড় দিলাম। পেছন থেকে ভেসে এল অ্যাবনার হিকসের কণ্ঠ।
তুমি ওখান থেকে চলে না এলেও পারতে।
পাঁই করে ঘুরলাম আমি।
আপনি এখানে কী করছেন?
উনি তোমাকে আবার ডাকবেন। মিস রেনল্ডস বুঝতে পেরেছেন তুমি কিছু একটা লুকোচুরি করছ। আমরা তিনজনেই জানি ওই অংক করা তোমার কম্ম নয়।
আপনি চলে যান, কণ্ঠে হুমকি ফোটানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।
আমার বরং এখানেই থাকা উচিত তোমাকে সাহায্য করার জন্য। আমি না থাকলে তো তুমি তোমার ক্লাসমেটদের সামনে বিব্রত হবে। তোমার শিক্ষক ভাববেন তোমার কাজ অন্য কেউ করে দিচ্ছে।
কিন্তু আমি- পায়ের শব্দ পেয়ে থেমে গেলাম।
মিস রেনল্ডস এসে দাঁড়িয়েছেন ক্লাসের দোরগোড়ায়।
কী হয়েছে, মাইকেল?
আমি বলতে যাচ্ছিলাম আমার পেট ব্যথা করছে, ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু মানসিকভাবে এমন বিপর্যস্ত লাগছিল আর চালাকি করতে সায় দিল না মন। বললাম কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছি। গম্ভীর মুখে ফিরে এলাম ক্লাসে।
তবে অ্যাবনার তখনও আমার পিছু ছাড়েনি।
চার
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই অ্যাবনার আমাকে বাঁচিয়েছে। আমি ব্লাকবোর্ডে অংকটা কষে ফেললাম। আমার ব্যাখ্যায় সন'ষ্ট মনে হলো মিস রেনল্ডসকে। আমাদের ম্যাথ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট টড হ্যারিসকেও খুশি লাগল। ওর সঙ্গে আগে আমার তেমন কথাটথা হয়নি, তবে এ ক্লাসের পরে সে আমাকে ক্লাবের পরবর্তী মিটিংয়ে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানাল। আমি খুব ভালোভাবেই জানতাম আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো অ্যাবনারই করে দিচ্ছে। তবে কীভাবে এটা সম্ভব হচ্ছে জানি না। আর কেনই বা সে কাজটা করছে তাও জানা নেই।
পরশু আমার ইংরেজি রচনা পড়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন মিস ফ্রাংকলিন। তিনি আমার ভূয়সী প্রশংসা করে বললেন আমি যেন রচনাটি ক্লাসের সবাইকে পড়ে শোনাই। আমি তাঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলাম না। তাছাড়া অ্যাবনার কী লিখেছে জানারও খুব আগ্রহ হচ্ছিল।
রচনা লেখার স্টাইল এবং ভাষা সত্যি চমৎকার। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মনে হচ্ছিল যেন আমিই ওটা লিখেছি। আমি লেখাটি পড়ে শোনাবার সময় কয়েকটি ছেলে হাততালিও দিল।
বিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্র কেন থম্পসন আমার প্রজেক্টের কথা শুনেছে। সে যখন অনুরোধ করল তাকে আমার পার্টনার হিসেবে নেয়ার জন্য, বেশ আমোদ বোধ করলাম। আমাদের দুজনের বিষয়ই এক- মানুষের হৎপিণ্ড।
তবে বাস্তবতা হলো এই যে আমি ছাত্র হিসেবে কেনের ধারে কাছে পৌঁছার যোগ্যতাও রাখি না। কেন যথেষ্ট চালাক চতুর, তবে ও কখনও বুঝতে পারবে না যে ভৌতিক কিছু একটা আমার জন্য পরিষ্কার একটি আউট লাইন তৈরি করে দিয়ে গেছে। নিজেকে আমি ওর চেয়ে খাটো করে তুলে ধরতে পারি, এতে বরং আমার খারাপই লাগবে। তবে কেন বিজ্ঞান মেলায় যে পুরস্কারটা পাবার আশা করছে তা থেকে ওকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। ও হতাশ হলে আমার ভালো লাগবে না, ওরও নিশ্চয় একই রকম অনুভূতি হবে।
স্কুল থেকে বাসায় ফিরলাম। মা যখন দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বিশাল হাসি দিলেন, বুঝতে পারলাম অনেক কিছুই এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মার চোখে চিকচিক করছে পানি। যেন মিলিয়ন ডলার পুরস্কার পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। আনন্দে কেঁদে ফেলবেন। আসল ব্যাপার হলো মিস ফ্রাংকলিন এবং মি. বেনটন মাকে ফোন করে বলেছেন ইদানিং ক্লাসে খুব ভালো করছি আমি। মা এত খুশি হয়েছেন, সাথে সাথে বাবাকে ফোন করেছেন। বাবা আমাদের সবাইকে নিয়ে ডিনারে যাবেন বলেছেন। উদ্দেশ্য, পড়ালেখায় আমার ইদানিং যে উন্নতি হচ্ছে সে বিষয়টি সেলিব্রেট করা। বুঝতে পারছি, সত্যি অনেক কিছু এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ওই রাতে রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরে আমি নিজের ঘরে যাচ্ছি, কিনারে ক্লজিটে কেউ বা কিছু একটা ধরা পড়ল চোখের কোণে। কাঁপা হাতে জ্বেলে দিলাম আলো।
যে জিনিসটা দেখে ভয় পেয়েছি তা আর কিছুই নয়, জিমনাশিয়ামে যাওয়ার ড্রেস। ঝুড়িতে রাখতে ভুলে গেছি। কাপড়গুলো তুলে চট করে ছুড়ে দিলাম ঝুড়িতে। ভাবছিলাম অ্যাবনার হিকসকে দেখার পর থেকে কীভাবে অল্পতেই আমি আজকাল ভয় পাই। সবসময় মনে হয় লোকটা বুঝি ঘাপটি মেরে আছে।
এই ভয়টা আমার তাড়াতেই হবে- যে ভাবেই হোক।
শুক্রবারটা ছিল অন্যরকম। অন্যরকম এ অর্থে যে ভীতিকর কিছু ঘটেনি সেদিন। সৃষ্টিছাড়া কোনও জীব আমাকে বিরক্ত করেনি, ক্লাসরুমে আকস্মিক কোন চমক ছিল না। তবে দিনটা তেমন উপভোগ করতে পারিনি কারণ সারাক্ষণ মনে একটা শংকা কাজ করছিল এই বুঝি কিছু হালুম করে লাফিয়ে পড়ল আমার ঘরে। সে রাতে ঘুমাতে যাবার সময় মনে মনে বললাম আশা করি শহর ছেড়ে চলে গেছে অ্যাবনার হিকস।
শনিবার সকালে ঝরঝরে মেজাজ নিয়ে ভাঙল ঘুম। আমাকে এ হপ্তা কাগজ ডেলিভারি দিতে হয়নি কারণ একটা ছেলে অতিরিক্ত কিছু পয়সা কামাবে বলে আমার কাজটা চেয়ে নিয়েছে। আমি খুশি মনেই সেদিনের কাজটা ওকে দিয়ে দিয়েছি।
বাবা মা রাতে এক পার্টিতে যাবেন। আমি ভিডিওর একটি দোকানে গেলাম ভিডিও ভাড়া নিয়ে আসতে।
মা অবশ্য আমাকে একা বাসায় রেখে যেতে ভরসা পান না। তবে আমি মাকে বলি যে একা বাড়িতে থাকার মত যথেষ্ট বড় হয়েছি। আমাকে নিয়ে এত টেনশন করতে হবে না। দরকার হলে একটা রাত একাই থাকতে পারব। আমার কথা শুনে মা খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েছেন বলে মনে হলো।
আমি সন্ধ্যাবেলায় প্রেটজেল আর পপকর্ন নিয়ে বসলাম খেতে। ফ্রিজ থেকে সোডার একটা ক্যান বের করলাম। পানীয়টা ঢাললাম একটা মগে। দুটো ছবি নিয়ে এসেছি ভিডিওর দোকান থেকে। প্রথমে কমেডি ছবিটা দেখব সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণটা নিশ্চয় বুঝতে পারছ।
ভিসিআর চালানোর প্রস'তি নিচ্ছি, কানে ভেসে এল নানান বিচিত্র শব্দ- সিঁড়িতে ক্যাঁচকোচ আওয়াজ, ছাদ, এমনকী দেয়াল থেকেও শোনা যেতে লাগল অদ্ভুত সব শব্দ। বাবা বলেন, নতুন বাড়িতে নাকি বিচিত্র অনেক শব্দ হয়। কিন্তু আমাদের বাড়িটি তো নতুন নয়, পুরানো।
ভিসিআর-এর ভল্যুম বাড়িয়ে রিল্যাক্স মুডে থাকার চেষ্টা করলাম। রাতের বেলা বাড়িতে একা থাকলে প্রায়ই ল্যারিকে বলতাম আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। হঠাৎ মনে পড়ে গেল কাল কারার সঙ্গে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। অ্যাবনার বোধহয় শহর ছেড়ে চলে গেছে। কারার ওখানে দেখার মত তো কিছু নেই। তবু বাইরে এক চক্কর ঘুরে এলেই হবে।
কারার কথা ভাবতে গিয়ে দেখছি সিনেমাতেই মনোযোগ দিতে পারছি না। আমি ভিসিআর-এর রিওয়াইন্ড বোতামটা টিপে দিলাম। আবার ওই শব্দগুলো শুনতে পেলাম। মাথার ওপরে ক্যাঁচ কোচ করে উঠল কাঠের মেঝে। কেউ যেন হাঁটাহাঁটি করছে।
ঘড়ি দেখলাম। আটটা বাজে। মা-বাবার ফিরতে এখনও অনেক দেরি। আমি আবার ছবিতে মনোযোগ দিলাম।
বাইরে শোঁ শোঁ শব্দে বইছে বাতাস। গাছের ডাল একটা আরেকটার ওপরে আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ আমার পেছনে, জানালার শার্সিতে কীসের যেন শব্দ হলো। লাফিয়ে উঠলাম আমি। ঘুরলাম। টেনে তুললাম জানালার খড়খড়ি। কিন্তু কিছু চোখে পড়ল না। শার্সিতে মুখ চেপে ধরে তাকালাম বাইরে। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
হঠাৎ আমার নিশ্বাসের বাষ্পে আকার নিতে লাগল একটি চেহারা। জানালার ডান পাশে আত্মপ্রকাশ করল একটি মুখ। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। অ্যাবনার হিকস।
পাঁচ
জানালার খড়খড়ি টেনে নামানোর জন্য মরিয়া হয়ে টানাটানি শুরু করে দিলাম। খড়খড়ি নামিয়ে বন্ধ করে দিলাম টিভি। এখন কমেডি ছবি দেখার সময় নয়। খিড়কির দরজায় ঠেস দিয়ে রাখলাম একখানা চেয়ার। পুলিশে ফোন করব? তাতে কোনও লাভ হবে না। পুলিশ এসে অ্যাবনারকে পাবে না। সে নিশ্চয় পুলিশ দেখেও এখানে ঘুরঘুর করবে না। কেমন হয় যদি সদর দরজা খুলে এক লাফে রাস্তায় উঠে বাঁচাও! বাঁচাও! বলে চিৎকার করতে থাকি? বুদ্ধি খারাপ না। তবে এরকম কিছু করার পরে মা আমাকে আর একা ঘরে রেখে কোথাও যাবেন না। আমার জন্য নির্ঘাত একজন বেবি-সিটার রেখে দেবেন। কাজেই যা করার নিজেকেই করতে হবে। কিন্তু এ জন্য একটা অস্ত্র দরকার। ঘরের চারপাশে চোখ বুলালাম। পাঁজরের গায়ে ধড়াস ধড়াস বাড়ি খাচ্ছে কলজে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।
ওটা কীসের শব্দ? ওপর তলায় মেঝেতে কেউ হাঁটছে। অ্যাবনার! না। ও দোতলায় যাবে কী করে? সে তো বাইরে। কেউ বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।
আত্মরক্ষা করার মত কোন কিছু এখনও খুঁজে পাইনি। হেসো না, তবে অস্ত্র হিসেবে নাই মামার চেয়ে কানা মামার মত হাতে তুলে নিলাম রিমোট কন্ট্রোল ইউনিট। কাউকে আঘাত করার ইচ্ছে আমার নেই। তবে বাধ্য হলে হয়তো কাজটা করতে হবে আমাকে।
পায়ের আওয়াজ এখন আসছে সিঁড়ি থেকে। ধীর পায়ে কেউ ডেড-এর দিকে চলেছে। লুকোবার একটা জায়গা দরকার আমার। লুকোবার জন্য বাবার লাউঞ্জ চেয়ারটা পছন্দ হলো। ঘরের কোনায় রাখা চেয়ারটার পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এলাম। কোনও অনুপ্রবেশকারী ঘরে ঢুকলে আমাকে লক্ষ করার আগেই তাকে দেখে ফেলব। আমি হাঁটু গেড়ে বসে রইলাম।
ক্রিইং ইং! টেলিফোনের শব্দে চমকে গেলাম রীতিমত। ফোনের ক্রিং ক্রিং থামছেই না, যেন চলবে অনন-কাল ধরে। অবশেষে থামল শব্দ। কিন্তু এক মিনিট পরে বাজতে লাগল আবার। যে-ই ফোন করুক সে যেন পণ করে আছে সাড়া না পাওয়া পর্যন্ত রিং করেই যাবে। কারা ফোন করেছে কি? কালকের যাত্রার কথা হয়তো জানতে চাইছে। তবে আগামীকাল বলে কোনও দিন আমার জীবনে আর কখনও আসবে কিনা কে জানে। নাকি ল্যারি ফোন করল আমার খবর দিতে? আমি মোটেই ভালো নেই, দোস্ত, তবে আমার কথা তুমি ভাবছ বলে ধন্যবাদ। মা-ও হতে পারে। কিন্তু তারা যেখানে গেছেন, আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র এক ঘণ্টার রাস্তা। ওরা হয়তো এখনও গাড়িতে।
ফোনের শব্দ থেমে গেল। সেই সঙ্গে নীরবতা নেমে এল বাড়িতে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রবল বাতাসের সঙ্গী হয়েছে ঝুম বৃষ্টি। আশা করলাম বৃষ্টির কারণে অ্যাবনার আমাকে রেহাই দিয়ে তার নিজের হানাবাড়িতে ফিরে যাবে।
হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকতে থাকতে খিঁচ ধরে গেছে পায়ে। কিন্তু নড়াচড়া করার সাহস পাচ্ছি না। এমন সময় নিভে গেল বাতি। বিদ্যুত চলে গেছে নাকি কেউ ফাজলামো করে বাতি নিভিয়ে দিয়েছে জানি না। রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি অন করার চেষ্টা করলাম। চলল না।
ভয়ে দিশেহারা দশা আমার। আমার জীবনে এমন ভয়াবহ রাত কোনদিন আসেনি। জানি না আমার ভাগ্যে এসব কেন ঘটছে।
সদর দরজায় নক্ হলো। পরপর দুবার। চেয়ারের পেছনে সিধে হলাম আমি। পা কাঁপছে থরথর করে। কে নক্ করছে? আবার নক্ হলো। তারপর কেউ আমার নাম ধরে ডাকল। বাবা নয়। অ্যাবনারও নয়।
মাইকেল, ঘরে আছ নাকি? আমি মি. মিলস।
কারার বাবা। উফ্, ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল। তবে তখুনি সাড়া দিলাম না। শত্রু ঘাপটি মেরে থাকতে পারে কোথাও। আর এ পরিস্থিতিতে সবদিকে সতর্ক নজর রাখাও সম্ভব নয়।
আমি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। মি. মিলস আমার নাম ধরে ডাকতেই লাগলেন। সেই সঙ্গে জোরে কড়া নেড়ে চলেছেন। অবশেষে চলে এলাম সদর দরজার সামনে। খুললাম কপাট।
মাইকেল, যা বাব্বা। বাঁচালে আমায়। তোমার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?
না। আ-আমি... কী জবাব দেব? বলব যে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন এক অদ্ভুত দর্শন বুড়োকে নিয়ে আমি ভয়ে আছি? বলব যে আমি ওই লোকটার ডরে লুকিয়ে ছিলাম?
তোমার মা ফোন করেছিলেন। তাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আজ আর বাড়ি ফিরতে পারবেন না। তোমাকে রাতে আমাদের সঙ্গে থাকতে বলেছেন।
আচ্ছা।
মি. মিলস বললেন, আমার ফ্লাশ লাইটটা নাও। তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে ফ্যালো। আমি অপেক্ষা করছি। তিনি ফয়েরের দিকে পা বাড়ালেন। তোমার বাবা-মা তোমাকেও ফোন করেছিলেন। কিন্তু কোনও সাড়া পাননি। ফোন বাজার শব্দ শোনোনি?
এ প্রশ্নের জবাবে আমি বিড়বিড় করে কী যেন বললাম। বিড়বিড় করে কিছু বলা মানে লোকে ধরে নেয় যাকে ফোন করা হয়েছে সে সম্ভবত তখন বাথরুম-টুমে ছিল। আমাকে নিশ্চয় বিব্রত দেখাচ্ছিল তাই মি মিলস এ প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ালেন না। আমি পাজামা, রোববারে পরার জন্য জামাকাপড় এবং টুথ ব্রাশ নিয়ে প্লাস্টিকের একটা ব্যাগে ঢোকালাম। তারপর এক ছুটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম নিচে।
আমি রেডি।
জ্যাকেট নেবে না?
ও, হ্যাঁ। ভুলেই গেছিলাম। কোট ক্লজিট খুলে একটা জ্যাকেট নিলাম। চলুন।
কারা এবং মিসেস মিলস রান্নাঘরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিস্কিট আর দুধ খেতে খেতে বিশ্রী ঝড়টা নিয়ে কথা বলতে লাগলাম আমরা। বাবা-মাকে ফোন করে মি. মিলস বললেন আমি এখন তাদের বাড়িতে আছি। তারপর ফোনটা আমাকে দিলেন তিনি। মা বললেন কাল বিকেলের মধ্যে চলে আসবেন ওরা।
মিসেস মিলস লিভিংরুমে আমার জন্য বিছানা করে দিলেন। কারা আর আমি রান্নাঘরে বসে গল্প করলাম।
আমি কারাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার রিপোর্টের খবর কী? আধিভৌতিক যে বিষয়টা নিয়ে লিখছ?
ভালোই। লাইব্রেরির বই ঘেঁটে প্রচুর তথ্য জোগাড় করেছি। গলা নামাল কারা। তুমি কাল আমার সঙ্গে যাচ্ছ তো মেইন স্ট্রীটের ওই বাড়িতে?
আবহাওয়া ভালো থাকলে অবশ্যই যাব, ফিসফিস করে জবাব দিলাম।
শোনো। আমার এক বন্ধু আছে। ছেলে খারাপ না। তবে মাঝে মাঝে বিচিত্র সব কথা বলে। তবে ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। আমার নিজেরই তো বিশ্বাস হয়নি।
বড় বড় হয়ে গেল কারার চোখ। সে তোমাকে কী বলেছে?
এক অদ্ভুত কিসিমের বুড়োর সঙ্গে নাকি তার পরিচয় হয়েছে। তার নাকি...অলৌকিক ক্ষমতা আছে। কথাটা হাস্যকর শোনাচ্ছে জানি তবে ওই লোক নাকি হঠাৎ করে ভোজবাজির মত উদয় হয়, আবার অদৃশ্যও হয়ে যায় চোখের নিমিষে। পলক ফেলার আগেই হাজির করে ফেলে নানান জিনিস।
ওয়াও!
তবু ভালো মেয়েটা আমাকে পাগল ভেবে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়নি। আসল কথা তো এখনও বলিনি। আমার বন্ধু হোমওয়ার্ক করতে ভুলে গেলে বুড়োটা তার কাজ করে দেয়। বন্ধু কোনদিন যেসব পড়া পারত না, বুড়োর দৌলতে সে এখন সব পড়া পারে। শুনে হয়তো তোমার মজা লাগছে কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মানে? জিজ্ঞেস করল কারা।
মেয়েটা গোগ্রাসে গিলছে আমার কথা। আমার বন্ধু তার বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা ক্লাসমেটদের কাছে মিথ্যা বলতে চায় না। এই অদ্ভুত লোকটা ইতিমধ্যে আমার বন্ধুকে ইঙ্গিত দিয়েছে বিনিময়ে তারও কিছু চাই। সময় হলেই আদায় করে নেবে। গভীর দম নিলাম আমি। তুমি কি এরকম কোনও অদ্ভুত বুড়োর কথা তোমার রিসার্চ বইতে পড়েছ?
হুঁ। শুনে মনে হচ্ছে তুমি একটা উন্মাদের পাল্লায় পড়েছ। এরা যা খুশি করতে পারে।
যেমন! প্রশ্ন করলাম আমি।
অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, অলৌকিক কাণ্ড ঘটানো-
আমি পাল্লায় পড়িনি পড়েছে আমার বন্ধু।
তুমিও পাল্লায় পড়তে পার। তোমার টেস্ট পেপার আমি দেখেছি। খুব ভালো রেজাল্ট ছিল তোমার। তোমার মার কথা শুনে মনে হলো সচরাচর এরকম ফলাফল তুমি কর না। আমার কথায় আবার কিছু মনে কোরো না।
না, কিছু মনে করিনি।
মিসেস মিলস কিচেনে ঢুকে ঘোষণার সুরে বললেন আমার কিছানা রেডি। তিনি ঘুমাতে যেতে বললেন। আমি ঘুমাতে চললাম।
ঘুমে দুচোখ প্রায় জড়িয়ে এসেছে, এমন সময় কানের পাশে বেজে উঠল অ্যাবনার হিকসের ভৌতিক কণ্ঠ।
ছয়
ধড়মড় করে উঠে বসলাম আমি। সত্যি সে।
গুড ইভনিং, মাইকেল। তোমার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায় খুশি হয়েছি।
কিন্তু আপনাকে দেখে আমি খুশি হতে পারিনি। আমার পিছু লেগেছেন কেন? আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে ঘুমাতে দিন।
খলখলে গলায় হেসে উঠল অ্যাবনার! ঘুমাবে? তুমি তো এখানে ঘুমাতে আসনি।
মানে? আমি চারপাশে চোখ বুলালাম। সিংহাসনের মত একটা চেয়ারে বসে আছি আমি, পড়শীর লিভিংরুমের সোফার বিছানায় নয়। একটা অন্ধকার, গুমোট প্রাসাদে চলে এসেছি- পাতালঘরের চেয়েও ভয়ানক। পরনে আমার পাজামা নয়, হুডঅলা একটি বাদামী রোব। কোমরে সোনালি রশি, ডগার দিকে সামান্য বেঁকে যাওয়া সোনালি চপ্পল পায়ে।
এখানে হচ্ছেটা কী? আমি কোথায়?
তুমি আমার ঘরে। ভাবলাম তোমার ভালোই লাগবে। তোমাকে সম্মান দেখাচ্ছি।
অন্য কাউকে সম্মান দেখান গে। এটা কি সেন্টারভিল?
ফোনের জন্য চারপাশে তাকালাম। সুযোগ পেলেই পুলিশে ফোন করব।
অবশ্যই না। আমার মত শক্তিধর মানুষ তোমাকে কেন সাধারণ একটা জায়গায় নিয়ে আসবে?
যুক্তির কথাই বটে ভাবলাম আমি। কারা ঠিকই বলেছে। অ্যাবনারটা আসলে উন্মাদ। কীসের সঙ্গে আছি বুঝতে পারছি বটে তবে কী করব মাথায় ঢুকছে না।
ভয় পেয়েছি যে সেটা লোকটাকে টের পেতে দেয়া যাবে না, মনে মনে বললাম আমি। বুকে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, আপনি আসলে আমার কাছে কী চান খোলাসা করে বলুন তো।
বলার জন্য আমার কোনও তাড়া নেই। তুমি কোথাও যাচ্ছ না। তবু জানতে যখন চাইছ তাই বলছি আমার একজন সহকারী দরকার। যে আমাকে আমার কাজে সাহায্য করবে। যে কাজ করার জন্যে আমি কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এ লোক কী কাজের জন্য কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে? লোকটাকে দেখে মনে হয় তিনশো বছর আগে তার জন্ম। অবশ্য এতে কিছু এসে যায় না। আমার এখান থেকে কেটে পড়া দরকার। চারপাশে তাকালাম পালাবার যদি কোনও রাস্তা পাওয়া যায়। কিন' এ ঘরে একটা জানালা পর্যন্ত নেই।
জানালা খুঁজছ? লোকটা যেন আমার মনের খবর পড়ে ফেলল। এ লোকের প্রতিটি আচরণই ভীতিকর। হাত নাড়ল সে। ফু: জানালা। কর্কশ গলায় বলে উঠল অ্যাবনার। এমন বিশ্রী গলার স্বর, কানে বাজে।
চেয়ার থেকে নামলাম আমি। উঁকি দিলাম বাইরে। না, এটা সেন্টারভিল নয়। এমনকী আমরা মাটিতেও নেই। আমরা মেঘের রাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছি।
যাও, পালাবার চেষ্টা করো। যা খুশি করতে পার তুমি। কেউ তোমার কথা শুনতে পাবে না, কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না। সুচাল আঙুল তুলল আমার দিকে। তুমি চলে যেতে চেয়েছ শুনি আমি কিছুটা অপমানিত বোধ করেছি।
ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। আমার বাবা-মা আমার জন্য চিন্তা করবেন বলে চলে যেতে চাইছি। তাছাড়া স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় আমার বন্ধুর সঙ্গে একটা প্রজেক্ট করার কথা। সে আমার ওপর ভরসা করে আছে।
যদি কোনদিন এখান থেকে সেন্টারভিলে ফিরে যেতে পার তাহলে প্রজেক্ট করতে পারবে। হা হা হা! বলে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল অ্যাবনার।
আমি কিন' হাল ছাড়লাম না। এর একটা সমাধান আমার চাই-ই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমি এর মধ্যে ঢুকলাম কী করে? আরি, ওটা কী?
শ্শ্শ্, মাইকেল। এদিকে তাকাও।
ল্যারি! পাঁই করে ঘুরলাম আমি। কাউকে দেখতে পেলাম না তবে আমার বন্ধুর কণ্ঠ যেন ভেসে এসেছে দেয়ালে ঝোলানো অ্যাবনারের একটি ছবির পেছন থেকে। ছবিতে অ্যাবনারের চেহারা ভালোই দেখাচ্ছে। কোথায় তুমি? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জলদি! একদম সময় নেই হাতে। অ্যাবনারের ছবিটা নামাও। ওটার পেছনে একটা চাবি আছে। জবাব দিল ল্যারি।
ভারী ছবিটা নামালাম। ধুলোয় দম বন্ধ হওয়ার দশা, মাকড়সার ফিরফিরে জাল হাওয়ায় উড়ছে। ছবি পরিষ্কার করার কেউ নেই নাকি? ক্যানভাসের পেছনে পুরানো একটা চাবি দেখতে পেলাম। টেনে খুলতে হলো ওটাকে।
চাবি পেয়েছি, বললাম আমি।
আস্তে কথা বলো, বলল ল্যারি। নইলে ওরা তোমার গলা শুনে ফেলবে। বুকশেলফের বইগুলোর দিকে তাকাও। বুকশেলফগুলো আগে লক্ষ করিনি। এখন দেখলাম গোটা দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে বইয়ের তাক। তিন নম্বর শেলফে, বইয়ের পেছনে একটা তালা দেখতে পাবে। চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে বাম দিকে মোচড় দাও।
নির্দেশ দিয়ে চলল ল্যারি।
ও যা বলল তেমনটিই করলাম আমি। তালায় চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই আমাকে অবাক করে দিয়ে ধীরে ধীরে খুলে গেল দেয়াল। ল্যারি বেরিয়ে এল দেয়ালের ওপাশ থেকে।
তোমাকে দেখে যে কী ভাল্লাগছে আমার! বললাম আমি।
আমারও। তবে নষ্ট করার মত সময় একেবারেই নেই। দরজা বন্ধ করে দাও।
আমরা কী করছি? জানতে চাইলাম আমি।
এই প্যাসেজওয়েটা একটা টানেলের মত। এই টানেল ধরে আমরা পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব।
তুমি এত কথা জানলে কী করে? ল্যারি এত জোরে হাঁটছে যে ওর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাকে প্রায় ছুটতে হলো। তুমি এখানে কদ্দিন ধরে আছ? তোমার সঙ্গে তো মাত্র সেদিন ফোনে কথা হলো।
পরে সব কথা বলব। এখন এসো। জলদি।
জায়গাটা অন্ধকার। স্যাঁতসেঁতে। গা ছমছম করছে আমার। জানি ল্যারিরও একই অবস্থা। হঠাৎ কানের পাশে বোমা ফাটল যেন। তোমরা কোথায় যাচ্ছ শুনি?
হতাশায় মুচড়ে উঠল বুক। ভোজবাজির মত উদয় হয়েছে অ্যাবনার। রাগে গনগনে মুখ, বুকে দুই হাত আড়াআড়িভাবে রাখা। আগে লক্ষ করিনি তার আঙুলে মস্ত একটা হীরের আংটি। আংটি থেকে জোরালো আলো ফুড়ে বেরুচ্ছে। ধাঁধিয়ে দেয় চোখ। আমি চোখে হাত চাপা দিলাম।
আমার পেছন পেছন এসো।
সাত
না! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। কিছুতেই যাব না।
মাইকেল? মাইকেল কী হয়েছে? ওঠো।
আমি চোখ মেলে চাইলাম। শুয়ে আছি সোফায়। আমার দিকে উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন মি. এবং মিসেস মিলস, কারা, এমনকী ছোট্ট বেথ পর্যন্ত। দ্রুত বিছানায় উঠে বসলাম। উষ্ণ রোদের স্পর্শ পেলাম পিঠে। আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে।
নিশ্চয় দুঃস্বপ্ন দেখেছে, মন্তব্য করল কারা।
তুমি ঠিক আছ তো, মাইকেল? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস মিলস।
জবাবে শুধু মাথা ঝাঁকালাম। হঠাৎ বাবা মার কাছে যেতে খুব মন চাইল। দুঃস্বপ্ন দেখে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার জন্য নিজের বাড়ি এবং পরিবার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা।
ওঠো, মাইকেল। নাশতা খাবে চলো, বললেন মি. মিলস।
সবাই চলো।
সবার শেষে গেল কারা, আজ ঝড়বৃষ্টি নেই, মাইকেল। ফিসফিস করর ও। হানাবাড়িতে হানা দেয়ার উপযুক্ত সময়।
গুঙিয়ে উঠলাম আমি। এ মেয়েকে কী করে বোঝাব ওখানকার ছায়া মারাতেও চাই না আমি?
একবার ভাবি বলি বাবা-মা বাসায় না ফেরা পর্যন্ত আমি কোথাও যাচ্ছি না। তারপর বাবা মা বাসায় এলে বলব এখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না, বাড়িতেই থাকব। কিন' কারা মেয়েটা খুব ভালো। ওর সঙ্গে ছলচাতুরী করা ঠিক হবে না। মুখ হাত ধুয়ে, পরিষ্কার কাপড় পরে, পেট ভরে নাশতা খাওয়ার পরে বেশ ঝরঝরে লাগল নিজেকে।
আমার বাই সাইকেলটা বাড়িতে। কারাকে বললাম ওদের ড্রাইভওয়ের সামনে ওর সঙ্গে দেখা করব। আমি আমাদের গ্যারেজে পা বাড়ালাম। আমাদের গ্যারেজের দরজা সিকিউরিটি নাম্বার লাগে। সিকিউরিটি নাম্বার আমি কখনও ভুলি না। ওটা আমার জন্মদিনের তারিখ। গ্যারেজ খুলে খাওয়ার ব্যাপারটা আমার কাছে ম্যাজিকের মত মনে হয়। কয়েকটা বোতাম টেপো, তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গড়গড় করে ভারী ইস্পাতের দরজাটা খুলে যাবে, তোমাকে একটা আঙুলও আর ছোঁয়াতে হবে না।
আমি গ্যারেজের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। সাইকেলটা বের করে নিয়ে আসব, এমন সময় খটাং করে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। এভাবে তো দরজা বন্ধ হবার কথা না। গ্যারেজের ভেতরটা এখন অন্ধকার। আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
কোথাও ঘুরতে যাচ্ছিলে বুঝি? সেই ভয়ংকর কণ্ঠটি আবার!
আমি অ্যাবনারকে দেখতে পাচ্ছি না। তবে ও যে এখানে আছে তা বুঝতে পারছি। দেখুন, এটা প্রাইভেট প্রোপার্টি। এখান থেকে চলে যান। আর কখনও আসবেন না। নয়তো আমি পুলিশ ডাকব। বললাম আমি।
কিন্তু আমি তো তোমার বন্ধু, খোকা। সবচেয়ে সেরা বন্ধু। তোমার কী কী উপকার করেছি ভুলে যাওনি নিশ্চয়।
আমি আপনার খোকা কিংবা অন্য কিছু নই, বললাম আমি। আর আমি আপনার কাছে কখনও উপকার চাইতেও যাইনি।
তুমি চাওনি বলেই যে আমি তোমার উপকার করব না এ কেমন কথা।
আমি জানি আমি আপনার বন্ধু নই। কিন' আপনি এভাবে আমার পিছু লেগেছেন কেন? আমার বেতনের টাকাগুলোর ওপর চোখ পড়েছে? আমি ও টাকা কবেই খরচ করে ফেলেছি।
বলেই বুঝলাম কথাটা বলা একদম উচিত হয়নি। অ্যাবনার আমার কথায় খুবই অপমান বোধ করল। ঝাড়া এক মিনিট চুপ করে থাকল। তারপর সিরিয়াস গলায় বলল, আমি খবরের কাগজের কম্পিউটারে প্রবেশের গোপন কোড নাম্বারটা চাই।
কেন?
বলা যাবে না।
আমি কম্পিউটার অ্যাকসেস কোড সম্পর্কে কিছু জানি না।
বড়দের কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে।
তারা যদি জানতে চায়, কম্পিউটার অ্যাকসেস কোড দিয়ে আমি কী করব।
তখন বানিয়ে যা হোক কিছু একটা বলে দেবে। তুমি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পার আমি জানি।
মাইকেল! তুমি কী ভেতরে? কারার গলা।
আসছি এখুনি, সাড়া দিলাম জোর গলায়। অ্যাবনারকে উদ্দেশ্য করে বললাম, যদি আপনার কাজ না করি?
তুমি পরীক্ষায় ফেল করবে। তোমার বাবা-মা মনে খুবই দুঃখ পাবেন। গুজব ছড়িয়ে পড়বে কেউ তোমার হোমওয়ার্ক করে দিত। বলবে তুমি একটা চিট। সবাই তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।
হুঁ, রীতিমত ঘামছি আমি। বুঝতে পারছি আমি। এখন দয়া করে দরজাটা খুলে দিন। প্লীজ।
যা বললাম তা হেলায় উড়িয়ে দিয়ো না। এর ওপরে অনেক কিছুই নির্ভর করছে। আর একটা কথা মনে রেখো : আমি ভালোর ভালো মন্দের মন্দ।
আট
খুলে গেল দরজা, ঝকঝকে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হলো গ্যারেজ। চলে গেছে অ্যাবনার। আমি বাইরে চলে এলাম। দম নিলাম বুক ভরে।
এতক্ষণ কী করছিলে? জিজ্ঞেস করল কারা।
সরি, ওকে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। কারা, ওই বাড়িতে না যাওয়াই ভালো।
কেন? তুমি না বললে-
বলেছি। কিন্তু তুমি জান না ওখানে গেলে বিপদ হবে কিনা। কারার চেহারায় নিখাঁদ বিস্ময় ফুটল। শেষে বাধ্য হলাম অ্যাবনারের ঘটনা ওকে বলতে।
কারা বলল, মাইকেল, তোমার পুলিশে খবর দেয়া উচিত।
ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি বললেই বিশ্বাস করছে কে?
আমি তোমার সঙ্গে যাব।
গিয়ে কী লাভ? আমি ছাড়া কেউ অ্যাবনারকে দেখেনি। ওরা ভাববে আমি ওদেরকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছি।
আরে চলো তো, বলল কারা। আমরা কোনও পেট্রল অফিসারকে পটিয়ে ওই বাড়িতে নিয়ে যাব। আমার রিপোর্ট লেখার মত একটা বিষয় পেয়ে যাব। হয়তো গিয়ে দেখব অ্যাবনার বাড়িতে নেই। চলে গেছে অন্য কোনও শহরে।
ওর কথায় যুক্তি আছে, স্বীকার করলাম মনে মনে। ওকে বললাম, তবে একটা কথা, কারা। এ বিষয়টি নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না। তাহলে আরও বেশি সমস্যায় পড়ে যাব।
আচ্ছা। এখন থানায় চলো। তুমি শুরু করো। আমি পেছন পেছন আসছি।
সাইকেল চালাতে চালাতে ভাবছিলাম আসলে আমরা কী করছি। সেন্টারভিল থানায় আগে কখনও যাইনি আমি। কোনওদিন যেতেও চাইনি। ধরো, থানায় কখনও উঁকি দিতে গেলাম, এমন সময় চোয়াড়ে চেহারার কোনও লোক এবং তার বাচ্চা যদি আমাকে দেখিয়ে বলে, ওই যে ও। ও-ই আমার বাই সাইকেল চুরি করেছে! এমনটি ঘটতেই পারে। উদোর পিণ্ডি অনেক সময় বুধোর ঘাড়ে চেপে যায়। তবে আজ ঝুঁকিটা নিয়েই যেতে হচ্ছে আমাকে।
কারাকে নিয়ে পৌঁছে গেলাম থানায়। তালা মেরে রাখলাম বাইক। চুরি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কে নিতে চায়? যা হোক, ভেতরে ঢুকলাম দুজনে। চলে এলাম মূল ডেস্কে। টেলর নামে এক অফিসার ফোনে কথা বলছে। ফোন রেখে জিজ্ঞেস করল আমাদের আগমনের কারণ। আমি ঢোক গিলে বললাম, আমরা একটা নালিশ- হঠাৎ অসাড় হয়ে গেল জিভ, টেলরকে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে।
এগিয়ে এল কারা। আমরা নালিশ করতে এসেছি- খুক খুক কাশল ও। এক অদ্ভুত লোকের বিরুদ্ধে।
কপালে হাত ঘষল অফিসার টেলর। কেউ তোমাদেরকে বিরক্ত করছে, বাচ্চারা?
আমি এক লাফে সামনে চলে এলাম। শুধু আমাকে।
লোকটার নাম কী?
অ্যাবনার হিকস।
নামটা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।
শহরে নতুন এসেছে, বলল কারা।
সে কীভাবে বিরক্ত করছে?
আবার বলল কারা। মাইকেলের হোমওয়ার্ক করে দিচ্ছে, পরীক্ষা... আমি চিমটি দিলাম কারাকে। অফিসার টেলরের চোখ সরু হয়ে আসছে। লক্ষণ ভালো না। লোকটা আমাকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে।
তোমার মা-বাবাকে বলেছ? অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য বাবা-মা কিংবা কোনও গার্জিয়ান লাগবে।
ওর বাবা-মা শহরের বাইরে, জানাল কারা।
অঃ। কিন্তু এখন তো কিছু করতে পারব না। তবে এই মি. হিকসের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেব। ওর ঠিকানা জানো?
সে ২০০ মেইন স্ট্রীটে থাকে।
সেই পোড়োবাড়িটা? হুম্ম্। ঠিক আছে। আমরা আমাদের চোখ-কান খোলা রাখব। তোমরা একটু সাবধানে থেকো। ঠিক আছে?
সাবধানে থাকব বলে আমরা চলে এলাম থানা থেকে। স্বস্তি লাগছে এখন। একটা কাজের মত কাজ করেছি।
পুলিশের কাছে অ্যাবনারের কথা বলে দিয়েছি। আমি লাফ মেরে বাইকে উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে থমকে গেলাম।
অ্যাই, কারা, অ্যাবনার যদি জেনে যায় আমরা এখানে এসেছিলাম, তাহলে? তার অগোচরে তো কিছুই থাকে না। রেগে গিয়ে যদি কিছু করে বসে?
কারা আমার দিকে তাকাল। সে কি পুলিশে ভয় পায়?
আমাদের মত বোধহয় ভয় পায় না। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি জানলে সে রেগে যেতে পারে।
তা অবশ্য পারে, ভাবছে কারা। হঠাৎ বলে উঠল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। এতে ঝুঁকি আছে। তবে কাজ হবে বলে মনে হয়। অন্তত চেষ্টা করে দেখতে দোষ নেই।
শুনি তো বুদ্ধিটা কী।
অ্যাবনারকে বলে দাও কীভাবে সে কম্পিউটার অ্যাকসেস কোডের সন্ধান পাবে।
কিন্তু এ কথা তাকে বলতে যাব কেন?
ওকে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসতে হবে। আর এটা সম্ভব হলেই ওর বিরুদ্ধে নানান ক্লু পেয়ে যাব আমরা।
কিন্তু ওকে কী বলব?
একটা কোড বানাবে, কয়েকটি অক্ষর, দুএকটি সংখ্যা। সে যখন এই ভুয়া কোড দিয়ে কম্পিউটারে ঢুকতে পারবে না এবং অভিযোগ করবে, বলবে ভুলটা তোমার, তুমিই ঠিকমত কোডটা দিতে পারনি।
কিন্তু ও তো সারাক্ষণ আমার পিছু লেগেই থাকছে।
তুমি বলবে তুমি যদি এ ব্যাপারটা নিয়ে খবরের কাগজের লোকদের আবার বিরক্ত কর, চাকরিটা হারাবে। আর চাকরি হারালে বিপদে পড়ে যাবে।
কারার পরিকল্পনা মন্দ নয়। এখন এটাকে কাজে লাগাতে পারলেই হলো। আর যদি ব্যর্থ হই তো আমার কপালে কী আছে ভাবতেই শিরশির করে উঠল গা।
নয়
কাজে লেগে গেলাম আমরা। কারা এবং আমি কতগুলো ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। দেখলাম অ্যাবনার মেইন স্ট্রীটের বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে। কাজটা খুব সহজ মনে হচ্ছিল আমার কাছে। সহজই তো-অ্যাবনারের বাড়ির সামনের দরজায় একটা চিরকুট রেখে বেল টিপেই এক লাফে চড়ে বসব আমার বাইকে, সে দেখে ফেলার আগেই। লোকটার মুখোমুখি হতে চাই না আমি।
অ্যাবনার চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর এক ছুটে চলে এলাম বাড়ির পেছন দিকে। পা বাড়ালাম দরজায়। নবে মোচড় দিতেই খুলে গেল কপাট!
ফিসফিস করল কারা, যদি ধরা খাই?
অ্যাবনার এখুনি ফিরছে না। কাজেই ভয় নেই। বললাম আমি। তবু পা টিপে টিপে দুজনে ঢুকলাম ঘরে। চাই না অ্যাবনারের কোনও আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধব আমাদের আগমন টের পেয়ে যাক। অবশ্য তার যদি এমন কেউ থেকে থাকে!
শেষবার যে রকম দেখেছিলাম তারচেয়েও হতচ্ছাড়া দশা ঘরের ভেতরটা। ছাদ থেকে মাকড়সার জাল ঝুলছে। কয়েকটি আসবাবের গায়ে জমেছে ধুলো। কোন কোনটির গায়ে এক ইঞ্চি পুরু হয়ে আছে। বাতাসে ভাপসা, পচা একটা গন্ধ। যেন বহুদিন জানালা খোলা হয় না। ভাগ্যিস সঙ্গে ফ্লাশ লাইট নিয়ে এসেছিলাম। বাইরে চড়া রোদ থাকলেও এ বাড়ির অন্দরমহল অন্ধকার। রাত-দিন দুটোই এখানে সমান।
আমরা এখন বাড়ির সামনে চলে এসেছি। লম্বা একসার সিঁড়ি উঠে গেছে টপ ফ্লোরে। কারার দিকে তাকালাম। যাব ওপরে? কারার কথা ভেবে দোটানায় ভুগছি। মি. এবং মিসেস মিলস আমাকে খুব আদর করেন। কারার যদি কিছু হয়ে যায় কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না নিজেকে...
কারা ঠেলা দিল আমাকে। ওই যে দ্যাখো। ওদিকে একটা স্টাডি রুম আছে।
কারা ঠিকই বলেছে। স্টাডি রুমই বটে। গাদাগাদা বই ছড়ানো সর্বত্র। শেলফের ওপরে বড় বড় মোমদানি। রয়েছে বুক কেস এবং প্রকাণ্ড একখানা ডেস্ক। অ্যাবনার হয়তো এখানেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেয়।
ডেস্কে পা বাড়ালাম অ্যাবনার কী পড়ছে দেখতে। মানুষের হৃৎপিণ্ডের ওপর লেখা বই লোকটার ডেস্কে। আমার সায়েন্স প্রজেক্টে নিশ্চয় কাজে লেগেছে এ বই। মি. মেইন ইতিহাসের ক্লাসে যা পড়াচ্ছেন সে বিষয়ের ওপরেও একটি বই দেখতে পেলাম। আমার হোমওয়ার্ক করে দেয়ার জন্য অ্যাবনারের নিজের কম হোমওয়ার্ক করতে হয়নি।
এসব কী ভাবছি আমি? ও তো আমাকে সাহায্য করার জন্য কিছু করেনি। ও চেয়েছে আমি যেন ওর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করি, অনুগত থাকি, ওকে যেন ভয় পাই। এসবই তার কূটকৌশলের অংশ মাত্র। আমাকে সে তার সহযোগী বানানোর মতলব করেছে।
কিন্তু আমার পেছনে ও লাগল কেন? এ প্রশ্নের জবাব এখন আমি জানি। যেহেতু আমি ঠিক মত নিজের কাজগুলো করতে পারছিলাম না তাই আমি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলাম। আর বেপরোয়া মানুষ সব কিছু করতে পারে। অ্যাবনার তো আমার মত ছেলেকেই তার শিষ্য বানানোর জন্য উঠে পড়ে লাগবে।
আমাকে বর্তমানের দুনিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে এল কারা।
এটা দ্যাখো! একটা খোলা নোটবুকে ইঙ্গিত করল ও। সামনের পৃষ্ঠায় অ্যাবনারের পুরানো দিনের হাতের লেখার ঢঙে লেখা সেন্টারভিল শাসনের পরিকল্পনা দেখে কারার মতই চমকে গেলাম। আমি অনুমান করছিলাম কিছু একটা বদ মতলব আছে অ্যাবনারের। কিন্তু সে যে এসব চিন্তা করেছে তা ভাবিনি।
নোটবুকের পৃষ্ঠা উল্টে চললাম দ্রুত। অ্যাবনারের উন্মাদ পরিকল্পনার একটা ছবি ফুটে উঠল : সে সেন্টারভিলের অধিবাসীদের কব্জা করতে চায় খবরের কাগজের মাধ্যমে। গোপনে কম্পিউটারের মাধ্যমে সে এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সে সেন্টারভিলের মানুষদেরকে বলবে তাকে মেয়র হিসেবে নির্বাচন করা হলে শহরের কোনও বেকার থাকবে না, থাকবে না অপরাধ, রইবে শুধু নিরবচ্ছিন্ন শান্তি।
তোমাকে পড়তে দেখে খুশি হলাম, মাইকেল। তবে গোপন এবং ব্যক্তিগত কারও লেখা লুকিয়ে পড়া ঠিক নয়।
অ্যাবনারের গলা শুনে চমকে উঠলাম। অবশ্য চমকানোর কোনও কারণ ছিল না। কারণ তার অভ্যাসই হলো হুটহাট করে চলে আসা। তবে লোকটার আকস্মিক আগমনে এমন ভয় পেলাম, হাত দিয়ে পড়ে গেল নোট বুক।
কারা ভান করল ভয় পায়নি। ফুঁসে উঠল ও। ব্যক্তিগত? আপনি সেন্টারভিল শহর দখলের পাঁয়তারা করছেন আর এটাকে বলছেন ব্যক্তিগত? গোটা একটা কম্যুনিটিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার ষড়যন্ত্র একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে হতে পারে না।
হ্যাঁ, কারার সুরে সুর মেলালাম আমি হারানো সাহস ফিরে পেয়ে।
আমি এ পর্যন্ত যে কটি শহরে গেছি এ শহরটিকে সব থেকে ভালো লেগেছে। তবে এটি আরও ভাল শহর হতে পারত। মাইকেলের মত এখানে প্রতিভাবানদের অভাব নেই কোনও। আর প্রতিভাবানদের দিয়েই গড়ে তোলা যায় সুখের রাজ্য। যে শহরে সবসময় বিরাজ করবে সুখ এবং শান্তি।
কারা বলল, সুখ-শান্তি পাবার জন্য শহরের মানুষদের কী করতে হবে?
আমার কর্তৃত্ব মেনে চলতে হবে। আমার প্রতি আনুগত্য দেখাতে হবে।
আমার দিকে ফিরল অ্যাবনার। আমি কিন্তু তোমার ওপরে খুব রেগে আছি, মাইকেল। তোমাকে নির্বাচন করেছিলাম আমাকে সাহায্য করার জন্য। উল্টো তুমি আমার পরিকল্পনা ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছ। আমি এখন তোমার বান্ধবী এবং তোমাকে ধ্বংস করব।
দশ
অ্যাবনার হাত নাড়তেই হাতে চলে এল একটি জ্বলন্ত মোমবাতি। আমার ভয়গুলো বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। আমি কারার দিকে তাকালাম। ওর চোখে পানি।
ওকে ছেড়ে দাও, অ্যাবনার, এবারে আর আপনি বলে সম্মান দেখানোর প্রয়োজন বোধ করলাম না। মেয়েটা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না, নিজের কথা ভাবি না আমি। শুধু ওকে যেতে দাও।
বান্ধবীর জন্য অনেক দরদ দেখছি। আমি সত্যি অভিভূত। অ্যাবনার তাকাল কারার দিকে। দুঃখের বিষয় হলো মেয়েটির বয়স খুবই কম। তবে সমস্যা হলো এ বয়সেই সে অনেক কিছু জেনে এবং বুঝে ফেলেছে। কঠোর হয়ে উঠল লোকটার চেহারা। এসো আমার সঙ্গে।
অ্যাবনার আমাদেরকে নিয়ে সরু সিঁড়িতে পা বাড়াল। আমি কারার হাত ধরলাম। এ ছাড়া আর কিইবা করার ছিল আমার।
হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে টগবগ করে ফুটতে লাগল রক্ত। ভয় ছাপিয়ে ক্রোধ যেন গ্রাস করল আমাকে। অ্যাবনারের মত একটা পাগল আমাদের ধ্বংস করে দেয়ার কে? সে নিজেকে কী ভাবে?
রাগে জ্বলতে জ্বলতে আমি হাতের ফ্লাশ লাইট দিয়ে খটাশ করে এক বাড়ি মেরে বসলাম অ্যাবনারের মাথায়। কিন্তু ওর মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। বোধহয় টেরই পায়নি। আশ্চর্য! জাদুকররা নিশ্চয় ভিন্ন ধাতুতে গড়া। যদি অ্যাবনার দেখতে পেত কিংবা টের পেত আমি তাকে আঘাত করেছি, এতক্ষণে আমাদের দশা যে কী করে ফেলত বলা বাহুল্য।
অ্যাবনার আমাদেরকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একটি সেলারে চলে এল। অন্ধকার ঘর। অ্যাবনার আমাদেরকে মেঝেতে বসতে বলল। কিন্তু কারা গোঁ ধরে রইল সে মেঝেতে বসবে না। অ্যাবনারকে চেয়ার নিয়ে আসতে বলল। অ্যাবনারের জন্য এসব কোনও সমস্যাই নয়। সে হাততালি দিতেই হাজির হয়ে গেল দুটো চেয়ার।
আমাদেরকে নিয়ে কী করবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম অ্যাবনারকে।
তোমার প্রশ্নের জবাব এখন দেয়া যাবে না, বলল অ্যাবনার। কারণ এখনও ঠিক করিনি তোমাদেরকে নিয়ে কী করব। ভাবছি তোমাদেরকে জিম্মি বানালে কেমন হয়। আমি নিশ্চিত দুটি শিশুর জীবনের বিনিময়ে আমার হাতে নগরের ক্ষমতা তুলে দিতে দ্বিধা করবে না শহরবাসী।
অ্যাবনারের কথা শুনে একটু ভরসা পেলাম। যাক, ও তবু হাততালি দিয়ে আমাদেরকে অদৃশ্য করে ফেলছে না। এখন যত সময় ক্ষেপণ করতে পারব ততই আমাদের পালাবার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
কোনও কিছুর প্রয়োজন হলে হাঁক দিও। তবে চিৎকার চেঁচামেচি করলেও লাভ হবে না। বাইরের কেউ শুনতে পাবে না। খিকখিক শয়তানি হাসি হাসল অ্যাবনার। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল ওপরে। কাঁদো কাঁদো গলায় কারা বলল, সব আমার দোষ, মাইকেল। আমি অত্যন্ত দুঃখিত।
না, সব দোষ অ্যাবনারের। ও একটা ক্ষমতালোভী উন্মাদ, একটা পাগল জাদুকর। অ্যাই মেয়ে, মন খারাপ কোরো না তো। আমাদের বাবা-মা শীঘ্রি হয়তো আমাদের খোঁজে বেরুবেন। হয়তো থানায় ফোন করবেন। হয়তো অফিসার টেলরের সঙ্গে তাদের কথাও হয়ে যেতে পারে। সে হয়তো তার সহকর্মীদের সঙ্গে আমাদের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে কথাও বলেছে। হয়তো ওরা এতক্ষণে তদন্তে নেমেও গেছে।
শুধু হয়তো আর হয়তো।
আশার দিকটার কথা আগে ভাবতে হয়। তুমি তোমার রিপোর্ট লেখার জন্য কিছু উপাদান পেয়ে যাবে।
আমি এখন রিপোর্ট নিয়ে কিছু ভাবছি না।
ভাবা উচিত।
তুমি কি সিরিয়াস? আমরা এখন ঘোর বিপদে রয়েছি, মাইকেল।
আচ্ছা, তুমি তো তোমার প্রজেক্টের জন্য অনেক পড়াশোনা করেছ, তাই না?
নিশ্চয়।
ওর মধ্যে পাগল জাদুকরকে কীভাবে হত্যা করা যায় সেসব নিয়ে কিছু লেখা ছিল?
একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিল কারা। না। তবে সিনেমার ওই ডাইনির কথা মনে আছে যার গায়ে পানি ছুড়ে মারার পরে সে ছোট হতে হতে একসময় নেই হয়ে গিয়েছিল? এ লোকটার গায়েও পানি ছুড়ে মারা যায়।
মনে পড়ে গেল গত ঝড়ের রাতে, অ্যাবনার যখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ ওকে আর দেখতে পাইনি। শুনে তো সহজই মনে হচ্ছে। একবার চেষ্টা করে দেখা যায়, বললাম আমি।
যত সহজ ভাবছ অত সহজ নয় কাজ। এ বাড়িতে পানি আছে। এবং অ্যাবনার হয়তো সে পানি ব্যবহারও করে।
বুঝতে পারছি খুব ঝামেলার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি। ফ্লাশলাইট জ্বেলে নিশব্দে পায়চারি শুরু করে দিলাম ঘরে। স্যাঁতসেঁতে ঘর। দুঃস্বপ্নের মত পাতালঘর।
হঠাৎ চরকির মত ঘুরে দাঁড়ালাম।
কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকল। কান পাতলাম। হ্যাঁ! কী আশ্চর্য! ও এখানে- আমার বন্ধু, আমার জানি দোস্ত। ও এখানে এসেছে এবং আমাদেরকে দেখেছে!
আমরা এখানে, ল্যারি। বেযমেন্টে! হাঁক ছাড়লাম আমি। কিন্তু চিৎকার করে লাভ কী। মস্ত বিপদে আছি আমরা। শহরের মানুষও নিরাপদ নয় এই উন্মাদের কবল থেকে।
ল্যারির গলা কাছিয়ে এল। ঠিক আছে। আমি জানি তোমরা কোথায় আছ। আমি আসছি ওখানে।
কারার সঙ্গে ল্যারির আগেই পরিচয় হয়েছে। ওর বাবা-মা যখন ল্যারিদের বাড়ি কিনতে এলেন, সেই সময়। ল্যারির গলা শুনে স্বস্তি ফুটল কারার চেহারায়।
ল্যারি। আমার দোস্তো ল্যারি। কেউ যদি এখান থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে যেতে পারে তো সে এই ল্যারি।
কারা এবং আমি ল্যারির জন্য অপেক্ষা করছি। মনে হলো অনন্তকাল ধরে। এমন সময় খুলে গেল সেলারের দরজা। আমার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো যখন দেখলাম ল্যারিকে সিঁড়িতে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে আসছে অ্যাবনার।
এগার
ল্যারির হাঁটার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রতিদিনই একজন করে জাদুকর তাকে অপহরণ করে এবং এটা তার জন্য কোনও বিষয়ই নয়। তবে হাতে ধরা কমলার রসের কন্টেনারটা লক্ষ করলাম ঠকঠক কাঁপছে।
তোমাদের জন্য একজন সঙ্গী জোগাড় করে নিয়ে এলাম, বলল অ্যাবনার। বিষয়টি সে উপভোগ করছে চেহারা দেখে বোঝা যায়। এ কুকুরছানাটাকে দেখলাম আমার বাড়ির পাশে ঘুরঘুর করছে।
ল্যারিকে ও কুকুরছানা বলল? রাগে লোকটার গায়ে কিছু একটা ছুড়ে মারতে ইচ্ছে করল।
আরাম করো, ছোকরা। তোমাদের সঙ্গে বসে আড্ডা জমাতে পারলে ভালোই লাগত। কিন্তু আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। অ্যাবনার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল ওপরে। ওকে চলে যেতে দেখে খুব খুশি হলাম।
ল্যারি আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ওকে দেখে খুব ভাল্লাগছে। তুমি লোকটা সম্পর্কে ঠিক কথাই বলেছ, মাইকেল। বদ্ধ উন্মাদ একটা। ওর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে উঠলাম। তারপর হ্যান্ডশেক করলাম দুবন্ধু।
আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তুমি এসেছ। কী করছিলে এখানে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
তোমাদের জন্য একই প্রশ্ন তো আমারও। বাবা মার সঙ্গে শহরে এসেছিলাম দাদীকে দেখতে। তোমার বাসায় ফোন করেছিলাম। কিন্তু কেউ ফোন ধরেনি। তোমাদের বাসায় তখন ছুটে যাই। তোমার বাবা-মা তখন বাড়ি ফিরছেন। বললেন তুমি নাকি কারাদের বাসায় আছ। কিন্তু কারাদের বাসায় গিয়ে শুনি তোমরা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছ। তখন কেমন সন্দেহ জাগল মনে। ভাবলাম এখানে একবার ঢুঁ মেরে যাই।
আর এসেই অ্যাবনারের খপ্পরে পড়ে গেলে, মন্তব্য করলাম আমি। যাকগে, এখন এখান থেকে কী করে কেটে পড়ব সে বুদ্ধি বের করা যাক। তোমার মাথায় খেলছে কিছু?
অ্যাবনারকে ধরে ধোলাই লাগাতে হবে, বলল ল্যারি।
ও কিন্তু জাদুকর ভুলে যেয়ো না। সাবধান করে দিল কারা। আর উন্মাদ।
ওই জানালাটা ভাঙব, বললাম আমি। ফ্লাশলাইট দিয়ে কাজটা করব।
কাচ ভাঙার বিকট শব্দ হবে, বলল ল্যারি।
ট্রাপডোর-টোর আছে কিনা একবার চক্কর লাগিয়ে দেখি।
কীভাবে এখান থেকে পালাব সে চেষ্টায় লেগে গেলাম। আমার খুব লজ্জা লাগছিল। আমার জন্যই তো ওরা বিপদে পড়েছে। ওদেরকে আসলে অ্যাবনারের ব্যাপারে কিছু বলা উচিত হয়নি। পুরো ব্যাপারটাই গোপন রেখে অ্যাবনারের সঙ্গে একাই লড়তে যাওয়া উচিত ছিল। তবে যা হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আমার কর্তব্য হলো কারা এবং ল্যারিকে বিপদের কবল থেকে রক্ষা করা।
ল্যারিকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়ার পরে সেলারের দরজায় তালা লাগিয়ে রেখেছে কিনা অ্যাবনার কে জানে। আমি নিশ্বাস বন্ধ করে, পা টিপে টিপে সিঁড়ি বাইতে লাগলাম। মোচড় দিলাম দরজার নবে। বন্ধ। তবে দরজার কব্জা খুব একটা মজবুত মনে হচ্ছে না। কব্জা খুলে ফেলার চেষ্টা করা যায়।
আবার নিচে নামার সাহস হলো না যদি সিঁড়িতে ক্যাচকোচ আওয়াজ ওঠে। আমি কারা এবং ল্যারিকে ফিসফিস করে বললাম কিছু একটা খুঁজে আনতে যা দিয়ে দরজা খোলা যাবে। কারা একটা ব্যারেট নিয়ে এল। কিন্তু ও দিয়ে দরজা খোলা গেল না।
ল্যারির চোখে পড়ল একটা পাইপ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরছে। পানিটা ধরে রাখি, বলল ও।
খাওয়া যাবে না। তবে অন্য কোনও কাজে লাগতে পারে।
আমি টিনের একটা বালতি পেয়ে গেলাম। কারাকে বালতিটা দিয়ে বললাম, তোমার পানি থিওরি পরীক্ষা করে দেখব।
আচ্ছা, পাইপের নিচে বালতি বসিয়ে দিল কারা। টিনের বালতির তলায় টপ টপ করে পানি পড়ছে। তবে শব্দটা বড্ড বাজছে কানে। কারা একটা ছেড়া ত্যানা পেতে দিল বালতির তলায়। পানি পড়ার শব্দ এবার ভোঁতা শোনাল। কারার চেহারা শুকনো। আমি জানি ও কী ভাবছে। ও আমার মতই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ আদৌ কি আমরা এখান থেকে কোনদিন ছাড়া পাব?
তীব্র হতাশায় আমি একটা কড়িকাঠে লাথি কষালাম। লাথিটা এত জোরে লাগল, থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা বাড়ি। শব্দ শুনে অ্যাবনার ছুটে এল সেলারে। রেগে বোম।
এখানে এত চেঁচামেচি কীসের? তোমাদেরকে কিছু বলছি না বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ?
কিছু বলছ না-? রাগে আমার গলা বুজে এল।
এখন আর কৈফিয়ত দিতে হবে না, বাধা দিল অ্যাবনার। যথেষ্ট হয়েছে, আর না।
অ্যাবনার হাত নাড়তেই হাতে চলে এল লম্বা একটি রশি। কোচকানো চামড়ার একটা আঙুল তুলল সে কারার দিকে। এগিয়ে আসতে বলছে। কারা আমার পেছনে লুকাল।
অ্যাবনার, তোমাকে বলেছি না ওকে ছেড়ে দিতে।
আচ্ছা, তাই নাকি, মাইকেল? তোমরা এখনও বুঝতে পারনি যে চাইলে বহু আগেই তোমাদেরকে আমি আঘাত করতে পারতাম? এসব করছি তোমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই। তোমরা বিপদমুক্ত থাকবে। কদম বাড়াল সে, কারার দিকে বাড়িয়ে দিল হাত। এদিকে এসো, ডিয়ার।
ল্যারিও আমার পাশে চলে এসেছে। হাতে এখনও কমলার রসের ক্যান। আমার হাতে ধরা ফ্লাশলাইটের দিকে ইশারা করল। জানি ও কী করতে চাইছে-
অ্যাবনারের মাথায় ধাঁই করে ওটা বসিয়ে দেয়ার মতলব করেছে ল্যারি। কিন্তু ওকে বলতে পারলাম না যে এতে কোনও লাভ হবে না।
ল্যারি যাতে ফ্লাশলাইটটা না নিতে পারে সেজন্য ওটা মুঠিতে আরও শক্ত করে ধরলাম। তবে আমার উদ্দেশ্যটা ও বুঝতে পারেনি। তাই খামোকা টানাটানি করতে লাগল ফ্লাশলাইট ধরে। আর এটা করতে গিয়ে কন্টেনারের সমস্ত কমলার রস ছলকে গিয়ে পড়ল অ্যাবনারের গায়ে।
যন্ত্রণা এবং ব্যথায় তারস্বরে চিৎকার দিল অ্যাবনার। মোচড় খাচ্ছে শরীর। বাঁচাও! কোনমতে বলল সে। আমার গায়ে আগুন ধরে গেল!
আমরা আগুন দেখতে পেলাম না তবে কাঠ পোড়ার সময় যেমন পটপট শব্দ হয় তেমন আওয়াজ শুনতে পেলাম, সেইসঙ্গে মাংস পোড়ার গন্ধ। আমাদের চোখের সামনে কুঁচকে যেতে লাগল অ্যাবনারের শরীর। এসিড! আর্তনাদ করছে সে। এসিড আমার মাংস পুড়িয়ে দিল!
দৃশ্যটা ভীতিকর। আমরা তিনজনই বাক্যহারা হয়ে গেছি। নড়াচড়া করতে পারছি না। অবশেষে কারা ড্রিংকের খালি কন্টেনারের লেবেল পরীক্ষা করে দেখে বলল, ওটা এসিড ছিল। কমলার রসে অ্যাক্সকরবিক এসিড আছে। অ্যাবনারের শরীর- মানুষের মত নয়। তরল পদার্থটা ওর গা পুড়িয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ল্যারি। চলো, বেরিয়ে পড়ি। জানালাটা যেন কোনদিকে?
নোংরা জানালাটার নিচে হাবিজাবি অনেক জিনিস পড়ে ছিল। আমরা ওগুলো সরিয়ে ফেললাম। তারপর চেয়ারগুলো নিয়ে এলাম জানালার নিচে। কিন্তু ওগুলো কেমন ল্যাগব্যাগ করে কাঁপতে লাগল। যেন খাদে পড়েছে। আমি মেঝেতে ফ্লাশলাইটের আলো ফেললাম। দেখলাম চেয়ারগুলো যেখানে রেখেছি তার নিচে একটি পুরানো কবর। ঝুঁকে বসলাম। কবরের গায়ে খোদাই করা কয়েকটি কথা : এখানে ঘুমিয়ে আছে অ্যাবনার হিকসের আদি আত্মা। কোন সন-তারিখ কিছু নেই।
ভাবলাম জাদুকর অ্যাবনার কি এখানেই থাকত? সে কি অন্য কোন অ্যাবনার হিকসের আত্মীয় ছিল? নাকি সে মৃত কোনও ব্যক্তির নাম নিয়েছিল একটা পরিচয় পাবার জন্য?
কারা এবং আমি মিলে শক্ত করে ধরলাম চেয়ার। ল্যারি চেয়ারে উঠে জানালার হুড়কো খুঁজে বের করল। হুড়কো বন্ধ নয়, শুধু বহুদিন খোলা হয় না বলে জং ধরে ধুলোয় আটকে রয়েছে। ওটাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পরে খোলা গেল জানালা।
জানালা গলে প্রথমে বেরুল ল্যারি, তারপর কারা। আমি বেরুবার আগে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। যেখানে অ্যাবনার দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে তার কোনও চিহ্ন নেই। এক্কেবারে কিছু নেই।
সে যে এখানে ছিল তার সামান্যতম নিশানাও নেই।
বারো
অ্যাবনারের মত সুপার ন্যাচারাল জিনিসের বোধহয় কোনদিন মৃত্যু হয় না। হয়তো এরা বেঁচে থাকে অনন্তকাল।
যা ঘটেছে সব অ্যাবনারের জন্য। তার সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়েছে বলে আমি আফসোস করছি না। সে আমাকে আরেকটি ডাইমেনশন সম্পর্কে জানিয়ে দিয়ে গেছে, পৃথিবীর একটি অংশ যার অস্তিত্বে আমি এখন বিশ্বাসী।
সে কি সত্যি আমার এবং আমার বন্ধুদের ক্ষতি করত? আমি জানি না। সে সেন্টারভিলের মত ছোট শহরের শাসনকর্তা হতে চেয়েছিল। এ জন্য লোকটাকে দোষ দেয়া যায় না। কারণ আমাদের শহরটি খুব সুন্দর, মানুষজনও চমৎকার। তার উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ ছিল, সে তার লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তবে সে যা চেয়েছে চাওয়াটা ভুল ছিল। পদ্ধতিটিও ছিল ভুল।
হয়তো অ্যাবনার মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান চেয়েছে। আশা করেছে গোটা একটা শহরের মানুষ তার প্রতি অনুগত রইবে। এরকম মানুষের অভাবও নেই। আমার প্রতি তার রুষ্ট হওয়ার কারণ আমি তার স্বপ্নটাকে চুরচুর করে দিয়েছি, যে জাদুর বাসত্মবায়ন সে করতে পারেনি।
অ্যাবনারের একটা কথা খুব মনে পড়ছে। সে প্রায়ই বলত জ্ঞানই শক্তি। শক্তিই আসলে আসল কথা।
আমি এখন প্রচুর খেটে পড়াশোনা করি। আমার অ্যাসাইনমেন্টগুলো যথাসময়ে সেরে ফেলি। আমি, মাইকেল ডেন, পৃথিবীর সেরা ছাত্রটি এখনও নই, তবে বুড়ো অ্যাবনারকে ধন্যবাদ, আমি এখন পড়াশোনায় আগের চেয়ে ভালো করছি।







