Category: গল্প
rumi-4.jpg
News Headings

খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Jan 11, 2009
Source: bdnews24.com
জামাটা কোথায় গেল
আহমেদ রিয়াজ
নেই নেই নেই। টুপুর ঈদের জামাটা নেই। এই একটু আগেও ওখানে ঝোলানো ছিল। ওখানে মানে কাপড় শুকানোর দড়িতে। এবার ঈদের জামা পেতে বেশ দেরিই হয়েছিল টুপুর। জামাটা ও পেয়েছে গতকাল রাতে। অথচ আজ ঈদ। এমন তো নয় যে এটা রোজার ঈদ। যে সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যাবে, তার পরদিনই ঈদ। এটা হচ্ছে কোরবানীর ঈদ।

এই ঈদে সাধারণত কেউ জামাকাপড় নেয় না। তবু মা সখ করে টুপুর জন্য একটা জামা কিনে দিয়েছেন। জামাটা এনে ধুয়ে মেলে দিয়েছেন কাপড় শুকানোর দড়িতে। আর সেখান থেকেই জামাটা উধাও।

টুপুর মনটা বেশ খারাপ। মন তো খারাপ হবেই। জামা না পেলেও এত মন খারাপ হতো না। কিন্তু জামা পেল, জামাটা ধুয়েও দেয়া হলো। মা ওর জন্য নতুন কোনো পোশাক কিনলে না ধুয়ে পরান না। এটা খুবই ভালো। সবাই বলে। বাবাও বলেন, “দোকানে জামা-কাপড় ঝুলে থাকে। অনেক ময়লা জমে সে কাপড়ে। তারপর আবার অনেকেই জামা গায়ে দিয়ে দ্যাখে। কার গায়ে কোন অসুখ আছে বলা যায়?”

এমন অনেক অসুখ আছে যেগুলো ছোঁয়াছুয়ি। কেউ হয়ত জামাটা পরে দেখল। তার গায়ে কোনো অসুখ আছে। সে রোগের জীবানু জামায় আটকে গেল। তারপর না ধুয়ে জামাটা পরলেই সে জীবানু টুপুকেও ধরে বসবে। ব্যস! আর যদি চুলকানির মতো জটিল কোনো রোগ ধরে, তাহলে তো কথাই নেই। সকাল- দুপুর-বিকেল-সন্ধে-রাত- চারপাঁচ বেলা নিয়ম করে চুলকানির অষুধ মাখো। দরকার হলে অষুধ গেলো। তারপর যদি চুলকানি মহাশয় দয়া করে ছেড়ে যায়, তাহলে সৌভাগ্য। আর যদি গোঁয়ার জাতের কোনো চুলকানি ধরে, তাহলে ওটা আজীবন ভোগাতে পারে। কোনো অষুধেও কাজ হবে না।

তবে অতো গোঁয়ার চুলকানি এখন বলতে গেলে নেই। গবেষকরা গোঁয়ারগুলোকে ট্রিট করার জন্য নিত্য নতুন চুলকানির অষুধ আবিস্কার করছেন। তবু বছর দুয়েক তো ভোগাবে। ওরে বাব্বাহ! চুলকানি। নাম শুনলেই মনে হয় শরীরের এখানে ওখানে চুলকাতে শুরু করেছে। এই চুলকানি যাতে টুপুকে ধরতে না পারে, সেজন্যই নতুন কোনো পোশাক কেনার পর ধুয়ে তারপর টুপুকে পরান মা। আর এজন্যই তো টুপুর জামাটা হারিয়ে গেল।

সকালে ঘুম থেকে উঠেও জামাটা চোখে পড়েছিল টুপুর। রাতে মা ধুয়ে দিয়েছিলেন। জামাটা কিনতে অবশ্য দেরিই হয়ে গিয়েছিল। আসলে সবাই ভুলে গিয়েছিল যে এবারের ঈদেও টুপুকে একটা জামা দিতে হবে। এই ঈদে অবশ্য কেউ নতুন জামা-কাপড় কেনে না। আগের ঈদের জামা দিয়েই ঈদ কাটায়। আগের ঈদ মানে রোজার ঈদ। রোজার ঈদ হলো মাত্র দুমাস আগে। এই দুমাসেই কারো নতুন জামা পুরনো হয়ে যায় না। টুপুর জামাটাও হয়নি। নতুন থাকতে থাকতেই আরো একটা নতুন জামা! আহা কী মজা! মজা তো ছিলই। জামাটা হারিয়েই সব মজা ছুটে গেল। আর মজা ছুটে যাওয়া মানেই হল মন খারাপ। টুপুরও বেশ মন খারাপ। মন খারাপ করে টুপু বসে রইল বিছানায়।

মা সেই সকাল সকাল উঠে খাবার রান্না করতে লেগে গেছেন। বাবা একটু আগেও বিছানায় গড়াগড়ি খেয়েছেন। ঈদের নামাজ শুরু হতে এখনও ঘণ্টাখানেক বাকি। মসজিদ থেকে তেলাওয়াতের শব্দ ভেসে আসছে। কীভাবে পশু কোরবানী দিতে হবে, সে সম্পর্কে বলা হচ্ছে। টুপুরাও এবার একটা পশু কোরবানী দেবে। ছাগল। এই ছাগলটা কেনা হয়েছে গত পরশুদিন বিকেলে। ছাগল দেখে তো টুপু বেশ খুশি। প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিল ও। ছাগলের কাছে যেতে চায়নি। বাবা ওকে ছাগলের কাছে জোর করে টেনে নিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, “ধরে দ্যাখো টুপু।”

টুপু ভয় পেয়ে বাবার গায়ের সাথে সেঁটে রইল। বাবা এবার জোর করে টুপুর একটা হাত ছাগলের মাথায় ছোঁয়ালেন। টুপু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। বাবা জানতে চাইলেন, “তুমি কি ভয় পাচ্ছ টুপু?”
টুপু বলল, “হুঁ।”
বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “কেন? ভয়ের কিছু নেই। ছাগলকে কেউ ভয় পায় নাকি?”
টুপু বলল, “যদি কামড় দেয়?”
বাবা বললেন, “কাউকে কোনো দিন কোনো ছাগল কামড়েছে শুনেছ? ছাগল কামড়ায় না। এবার ধরো।”
টুপু বলল, “না।”
বাবা বললেন, “বলেছি তো কামড়াবে না। তবু ভয়।”
টুপু বলল, “যদি গুঁতো দেয়?”
বাবা বললেন, “ছাগল গুঁতো দেয় না। গুঁতো গুঁতি করে তো গরু। এবার ধরো।”
আর কোনো যুক্তি টেকে না। কিন্তু ভয় তো কোনো যুক্তি মানে না। ছাগলটার দিকে আরো ভালো মতো তাকায় টুপু। তারপর জানতে চায়, “আচ্ছা বাবা গরু কী দিয়ে গুঁতো দেয়?”
বাবা বললেন, “কী দিয়ে আর- শিং দিয়ে। দেখোনি গরুর মাথায় ইয়া বড় বড় শিং থাকে।”
টুপু এবার ছাগলটার মাথায় তাকায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দ্যাখে। ওই তো ছাগলের মাথার দুপাশে দুটো শিং। তাহলে তো ছাগলটাও গুঁতো দেবে। আবার ভয় পায় টুপু।
বাবা জানতে চাইলেন, “ভয় পাচ্ছো কেন? ছাগল গুঁতো গুঁতি করে না। ধরো। ধরেই দ্যাখো।”
মনে যতখানি সাহস ছিল, সবটুকু এক সাথে করে ছাগলের মাথায় হাত দিল টুপু। আর অমনি ছাগলটা টুপুর হাত চেটে দিল। এতেই টুপু ভীষণ ভয় পেয়ে ছিটকে সরে গেল। নাহ্‌! এমন বদখত ছাগলের ধারে কাছেও আর না। গুঁতো দেয় না, কিন্তু টুপুর হাত চাটতে চাইল কেন? তাহলে কি টুপুর হাতকেই খাবার ভেবে চেটে দিয়েছে? হতে পারে। ছাগল খায় না এমন কিছুই নাকি নেই। ছাগল হচ্ছে সর্বভূক জন্তু। ছাগলের খাবার নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না। সে রাতে ছাগলটার চিৎকারে সারারাত ঠিক মতো ঘুমোতে পারেনি ওরা কেউ। কিছুক্ষণ ছাগলটা একটানা চিৎকার করতেই থাকে। তারপর কিছুক্ষণ থামে। মা বলেন, “দম নিচ্ছে।”
তারপর আবার একটানা চিৎকার- “ব্যা-অ্যা-অ্যা...”
যাচ্ছে তাই ব্যাপার। বাবা মাঝে মাঝে গিয়ে ছাগলটার সামনে কিছু খাবার ধরেন। খাবার বলতে কাঁঠাল পাতা। কাঁঠাল পাতা ছাগলের এত প্রিয়! কিন্তু এত প্রিয় খাবার রেখেও ছাগলটা সারা রাত চেঁচিয়েছে। অনেক রাতের দিকে আর জেগে থাকতে পারেনি টুপু। ঠিকই ঘুমিয়েছে ও। বাবা আর মা ঘুমিয়েছেন কি না ও বলতে পারবে না। মনে হয়, ঘুমোতে পারেন নি। পরদিন সকাল বেলা বাবা অনেকক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি খেয়েছেন। মায়ের অবশ্য সে সুযোগ ছিল না। সেই ভোরে বিছানা থেকে উঠে মা সবার জন্য নাস্তা বানিয়েছেন। মায়ের চোখদুটো ছিল লাল। তার মানে মায়েরও ঘুম হয়নি সারারাত। বাবা একটু বেলা করেই বিছানা থেকে উঠলেন। তখন আর ছাগলটা চিৎকার করছিল না। মনে হয় ভোর থেকে মানে যখন একটু ফর্সা হয়ে এসেছিল আকাশ, তখন থেকেই চিৎকার থামিয়েছে।
টুপু মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিল, “আচ্ছা মা, সারারাত ছাগলটা এমন চিৎকার করেছিল কেন?”
মা বললেন, “মনে হয় ওর সঙ্গী সাথীদের মনে পড়েছিল।”
মায়ের কথা শুনে টুপু কিছুক্ষণ হাসল। মা জানতে চাইলেন, “তুই হাসছিস কেন?”
টুপু বলল, “ছাগলের কি মন বলে কিছু আছে মা?”
টুপুর কথা শুনে মা-ও মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, “না থাকলে সারারাত চেঁচাল কেন?”
তাই তো! এটা তো টুপু ভেবে দেখেনি। তাহলে সারারাত কেন চেঁচাল ছাগলটা?

বাবা বিছানা থেকে উঠে নাস্তা খেতে বসলেন। তখন টুপু বাবার কাছে জানতে চাইল, “আচ্ছা বাবা, ছাগলটা সারারাত চেঁচিয়েছিল কেন?”
বাবা বললেন, “নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে সবারই একটু কষ্ট হয়। ও তো ছাগল। কেবল ব্যা ব্যা করে। মানুষের মতো তো আর কথা বলতে পারে না। তাই চেঁচিয়েছে।”
সারাদিন ছাগলটাকে নিজের হাতে খাইয়েছে টুপু। ছাগলের গলা ধরে আদর করেছে। আর ভয় পায়নি। সত্যি ছাগলটা ওকে কোনো গুঁতো দেয়নি। ওকে কামড়াতেও আসেনি। পরদিনই ঈদ। ঈদের দিন সকালেই কোরবানী করা হবে ছাগল। গতবছর অবশ্য ওরা ছাগল কোরবানী দেয়নি। গরু কোরবানী দিয়েছিল। এবার মা আবদার করেছিলেন বাবার কাছে, “একটা ছাগল কোরবানী দাও।” বাবাও মায়ের কথা রাখতে গিয়ে একটা চেঁচানো ছাগল নিয়ে এলেন। কে জানে আজ রাতেও চেঁচায় কী না।

ঈদের আগের রাতের জন্য বাবা তৈরি হয়ে ছিলেন। অনেকগুলো কাঁঠালপাতা জোগাড় করে রেখেছিলেন। ছাগলটার সামনে একটা খুঁটির মধ্যে ডালসহ কাঁঠালপাতা বেঁধে দিয়েছিলেন। যাতে ছাগলটা ছিড়ে ছিড়ে কাঁঠালপাতা খেতে পারে। বাবার বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে। সে রাতে আর চেঁচায়নি টুপুদের ছাগল। সারারাত কাঁঠালপাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে, আর জাবর কেটেছে। জাবর কাটা কী সেটা অবশ্য টুপু জানতো না। টুপু হঠাৎ দেখল ছাগলটা বসে বসে একমনে কী যেন চিবোচ্ছে। টুপু অবাক হয়ে ছাগলের সামনে গেল, ছাগলটা কী চিবোয় দেখার জন্য। নাহ্‌! ছাগলটার মুখের সামনে কিছু নেই। তাহলে চিবোচ্ছে কী?
টুপু আরো মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। তখনই বাবা জানতে চাইলেন, “কী দেখছ অমন করে?”
টুপু বলল, “বাবা ছাগল কি চুইংগাম চিবোয়?”
বাবা বললেন, “চিবোতে পারে। ছাগল চিবোয় না এমন কিছু নেই। কিন্তু তোমার হঠাৎ করে এটা মনে হলো কেন?”
টুপু বলল, “আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছি ওর মুখের সামনে কিছু নেই। কিন্তু সমানে চিবিয়ে যাচ্ছে। তাহলে চিবোচ্ছে কী?”
বাবা হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “তাতেই তোমার মনে হলো ছাগলটা চুইংগাম চিবোচ্ছে? তা ওটাকে কে চুইংগাম দিলো? ও তো আর দোকানে গিয়ে নিজে নিজে চুইংগাম কিনতে পারবে না। তুমি দিয়েছ?”
টুপু বলল, “মাথা খারাপ!”
টুপুর মুখে মাথা খারাপ কথাটা শুনে বাবা আরো হাসলেন। মাঝে মাঝে টুপু এমন অদ্ভুত কথা বলে। বাবার সেটাই মনে হয়। কিন্তু টুপু বোঝে না, এটা আবার অদ্ভুত কথা হয় কেমন করে?
বাবা বললেন, “তাহলে তুমি ওকে চুইংগাম কিনে দাওনি। আমি তো দেইনি। তাহলে তোমার মা কিনে দিয়েছে?”
টুপু ফিস ফিস করে বলল, “দিতেও পারে। মাকে বিশ্বাস নেই।”
বাবা বললেন, “তাহলে তোমার মাকে জিজ্ঞেস করতেই হয়।”
বাবা মাকে ডাক দিলেন। কী ভাবে ডাকলেন? চেঁচিয়ে বললেন, “টুপুর মা এদিকে এসো।”
টুপুর মা এলেন। বাবা বললেন, “তুমি কি ছাগলটাকে চুইংগাম কিনে দিয়েছ?”
বাবার কথা শুনে মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চোখ বড় বড় করে উল্টো জানতে চাইলেন, “কে বলেছে?”
বাবা মজা করার জন্য বললেন, “ছাগলটা নিজেই বলেছে।”
মা আরো অবাক। বাবা আসলে মাকে একটু রাগিয়ে দেয়ার জন্যই কথাটা বলেছেন। মাকে রাগতে দেখলে নাকি বাবার খুব ভালো লাগে। মা সত্যি সত্যি রেগে গেলেন। মায়ের নাকের পাটা ফুলতে শুরু করেছে। রাগলে মায়ের নাকের পাটা ফুলে ওঠে। মা নাকের পাটা ফুলিয়ে, চোখ আরো বড় বড় করে বললেন, “কীভাবে বলল?”
বাবা বললেন, “কীভাবে আর বলবে, যেভাবে ছাগলটা কথা বলে থাকে সেভাবেই বলেছে।”
মা বললেন, “আবার বলতে বলো।”
বাবা বললেন, “আর বলবে না। ওরা এক কথা একবারই বলে।”
মা বললেন, “আর কী বলেছে?”
বাবা বললেন, “আর কিছু বলেনি।”
মা বললেন, “কোন ভাষায় বলেছে?”
বাবা বললেন, “কোন ভাষায় আবার, ছাগলের ভাষা তো একটাই- ব্যা ব্যা অ্যা অ্যা...”
মা বাবার মুখে ছাগলের ভাষা শুনে হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “ছাগলের ভাষা কে বোঝে?”
ব্যস। ওতেই বাবার মুখটা মলিন হয়ে গেল। তিনি মলিন মুখে বললেন, “তুমি কী বলতে চাও?”
মা বললেন, “কিছুই বলতে চাই না। যা বলার তো তুমিই বললে।”
বাবা বললেন, “আমি তো তোমার সাথে একটু মজা করার জন্য বলেছিলাম।”
মা বললেন, “আমিও তোমার সাথে একটু মজা করছিলাম।”
টুপু বুঝতে পারল বাবা মার কথা এখন অন্য দিকে গড়াতে শুরু করেছে। একটু পর কী হবে সেটাও ও জানে। কিন্তু কাল ঈদ। আজ ও চায় না বাবা আর মা অমন করে কথা বলুক। টুপু তাই বাবা মাকে থামিয়ে দেয়ার জন্য বলল, “বাবা ছাগলটা অমন করে কী চিবোচ্ছে বললে না?”
মা বললেন, “চুইংগাম চিবোচ্ছে।”
বাবা বললেন, “তোমার মা কিনে দিয়েছে।”
টুপু সত্যি সত্যি বাবার কথা বিশ্বাস করেছে। হাসতে হাসতে বলল, “কিন্তু একটা চুইংগাম এতক্ষণ ধরে চিবোচ্ছে কেন মা?”
মা বললেন, “নারে টুপু। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। আসলে ছাগলটা জাবর কাটছে।”
“জাবর কাটছে!”, জাবর কাটা শব্দটা টুপু প্রথম শুনল। জাবর কাটা কী ও জানে না।
টুপু জানতে চাইল, “জাবর আবার কেমন করে কাটে? এটাও কি কিনতে পাওয়া যায় বাবা?”
বাবা বললেন, “কিনতে অবশ্য পাওয়া যায়।”
মা বললেন, “কী আবার যা তা বলছ। জাবর বুঝি কিনতে পাওয়া যায়?”
বাবা বললেন, “অবশ্যই কিনতে পাওয়া যায়।”
মা বললেন, “কোথায় কিনতে পাওয়া যায় শুনি?”
বাবা বললেন, “কোথায় আবার, পশুর হাটে।”
মা আবারও আকাশ থেকে পড়লেন। পশুর হাটে জাবর কিনতে পাওয়া যায়! কোনোদিন শোনেননি তো?
মা বললেন, “এমন কথা কোনোদিন শুনিনি তো!”
বাবা বললেন, “অনেক কিছুই আমরা শুনিনি। তাই বলে সেগুলো ঘটে না তা তো না।”
মা বললেন, “কিন্তু আমি তো জানি পশুর হাটে গরু, ছাগল, মহিষ কিনতে পাওয়া যায়। অবশ্য এখন উটও পাওয়া যায়।” “আর পাওয়া পশুর খাবার। তুষ, খড়, ভুষি, কাঁঠালপাতা- এসব। ইদানিং তাহলে জাবরও পাওয়া শুরু হয়েছে?”
বাবা বললেন, “ইদানিং কেন? জাবর পাওয়া যায় অনেক আগে থেকেই। সব পশুই তো জাবর কাটে। কাটে না?”
মা বললেন, “তা কাটে।”
বাবা বললেন, “তাহলে তুমি যখন কোনো পশু কেনো তার সাথে পশুর জাবর কাটাও তো কিনছ। কিনছ কি না?”
এতক্ষণে মা ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। বুঝতে পেরেই বলেন, “তুমি আসলে...”
কিন্তু কথাটা শেষ করেন না। বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি আসলে কী বলো?”
মা বললেন, “থাক। আজ আর বলতে চাই না। কাল ঈদ।”
বাবা বললেন, “ঈদ না হলে বলতে?”
মা বললেন, “বলতাম।”
বাবা বললেন, “তাহলে ঈদের পরেই না হয় বলো।”
মা যেন আবার কী একটা বলতে চেয়েছিলেন। তার আগেই টুপু বলল, “কিন্তু বাবা পশুরা জাবর কাটে কেন?”

বাবা এবার বুঝিয়ে বলতে শুরু করলেন, “আমাদের পাকস্থলি একটা। কিন্তু পশুদের পাকস্থলি দুটোর বেশি। গরুর তিনটা। তো পশুরা যখন কোনো খাবার খায় তখন সেটা একটা পাকস্থলিতে নিয়ে রাখে। তারপর যখন সময় হয়, তখন সেই পাকস্থলি থেকে খাবার নিয়ে আসে মুখে। মুখে এনে আয়েস করে চিবোতে থাকে। এটাই হচ্ছে জাবর কাটা।”
টুপু বলল, “কিন্তু একবারে চিবিয়ে খেতে পারে না?”
বাবা বললেন, “আসলে এটা অভ্যাস। একসাথে অনেক পশু থাকে। সামনে খাবার পেলেই কে কত বেশি মুখে ঢোকাতে পারে ওই প্রতিযোগিতা চলে ওদের মধ্যে। এজন্য প্রথমেই ওরা খাবার নিয়ে জমা করে পাকস্থলিতে। বাইরে তো আর জমাতে পারে না। বাইরে জমালে অন্য কোনো পশু সেই খাবার খেয়ে ফেলতে পারে। বুঝেছিস এবার?”
এবার বুঝেছে টুপু। আর ওই সারারাত ছাগলটা একমনে জাবর কেটেছে। চিৎকার চেঁচামেচি করেনি। টুপুদেরও সে রাতে ঘুম হয়েছে দারুণ। কিন্তু কে জানত ঈদের দিন সকালেই ওর জামাটা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে!
টুপুর বন্ধুদের অনেকেই এবার ঈদে নতুন জামা নেয়নি। ওর চার বন্ধুর মধ্যে কেবল ও আর আয়েশা নতুন জামা পেয়েছে। ঈদের দিন সকালে আয়েশা বলেছিল ওর নতুন জামা পরে ওদের বাসায় বেড়াতে আসবে। টুপুও বলেছিল ও নতুন জামা পরে বসে থাকবে আয়েশার জন্য। টুপু মাকে বলেছে সে কথা। মা বললেন, “এটাকে কি বলে জানিস?”
টুপু বলল, “কোনটাকে?”
মা বললেন, “এই যে তুই নতুন জামা পরে তোর বান্ধবীর জন্য বসে থাকবি- এটাকে।”
টুপু অবাক হয়ে বলল, “একে আবার কিছু বলে নাকি?”
মা বললেন, “বলে না আবার! অবশ্যই বলে। একে বলে অপেক্ষা। এরপর যদি তোকে কোনোদিন বলি টুপু একটু অপেক্ষা কর তো, তখন বুঝতে পারবি অপেক্ষা কী। পারবি না?”

আসলে টুপু জানতো না অপেক্ষা কী। সেদিন মা পাশের বাসায় কী একটা কাজে যাবেন। বাসায় কেউ নেই। যাওয়ার আগে টুপুকে বলে গেলেন, “আমি একটু পাশের বাসায় যাবো। তুই ততক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবি না?”
টুপু তখন জানতো না অপেক্ষা কেমন করে করতে হয়। টুপু জানতে চেয়েছিল, “অপেক্ষা কেমন করে করতে হয় মা?”
মা বলেছিলেন, “তোর যেমন করে ইচ্ছে। শুয়ে, বসে, হেঁটে, গান গেয়ে, মুখ গোমড়া করে- যেমন করে খুশি তুই অপেক্ষা করতে পারিস।”
টুপু জানতে চেয়েছিল, “অপেক্ষা করার সময় আর কিছু করতে হয় মা?”
মা বলেছিলেন, “আর কিছু করতে হয় না।”
পাশের বাসায় মা কেবল গিয়েছেন আর এসেছেন। আসতে যেতে বড় জোর পাঁচমিনিট সময়- এসে দেখেন টুপু মুখ গোমড়া করে বসে আছে। মা ওর গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “এত মুখ গোমড়া করে বসে আছিস কেন?”
টুপু বলেছিল, “আমি অপেক্ষা করছি।”
মা হেসে ফেললেন টুপুর কথা শুনে। তারপর বললেন, “আমি তো চলেই এসেছি, আর অপেক্ষা করার দরকার নেই।”
টুপু তখন ফিক করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, “ও তুমি চলে এলে আর অপেক্ষা করতে নেই? এই অল্প সময়ের জন্য অপেক্ষা?”
মা বললেন, “আর অপেক্ষা করার দরকার নেই।”
টুপু বলল, “কিন্তু এত অল্প সময়ের জন্য অপেক্ষা করে মন ভরল না। তুমি আরেকটু সময় থেকে এসো। আমি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি।”
মা তখন টুপুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “পাগলি মেয়ে। অপেক্ষা করতে তোর এত ভালো লাগে?”
টুপু বলল, “লাগেই তো।”
মা বললেন, “তাহলে মুখটাকে অমন হাঁড়ির মতো করে অপেক্ষা করলি কেন?”
টুপু তখনই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখটাকে গোমড়া করে মায়ের কাছে এসে বলল, “দ্যাখ তো মা, আমার মুখ কি হাঁড়ির মতো?”
মা আবার হাসতে শুরু করলেন। অনেকক্ষণ ধরে হাসলেন। তারপর বললেন, “সব গোমড়া মুখই হাঁড়ির মতো।”
টুপু বলল, “কিন্তু হাঁড়ির সাথে তো কোনো মিল পেলাম না।”
মা বললেন, “ওটা একটা কথার কথা।”
টুপু কী বুঝল কে জানে। জবাব দিল, “ও আচ্ছা।”

তারপর থেকেই মায়ের মুখটা মলিন দেখলেই টুপু বলবে, “মা তোমার মুখটা আমাদের ভাতের হাঁড়ির মতো।” আর মা যদি বেশি রেগে যান তখন বলবে, “মা তোমার মুখটা আমাদের গরম পানির হাঁড়ির মতো।”
ওদের ঘরে গরম পানির হাঁড়িটা সবচেয়ে বড়।
টুপুর কথা শুনে মা কি আর গোমড়া মুখে থাকতে পারেন? পারেন না। ফিক করে হেসে ফেলেন। ফিক করে হেসেই বলেন, “এখন কিসের মতো মনে হচ্ছে রে টুপু?”
টুপুও কম দুষ্ট নয়। মায়ের হাসির জবাবে ও নিজেও একটা হাসি দেয়। তারপর বলে, “ফুলের মতো।”
মা আবার জানতে চান তখন, “কোন ফুলের মতো?”
টুপু বলে, “জবা ফুলের মতো।”
মা তখন খানিকটা রেগে যান। বলেন, “চিনিস তো ওই একটা ফুল। জবা। না আছে কোনো গন্ধ। দুনিয়াতে আর কোনো ফুল নেই?”
জামাটা হারিয়ে সেই টুপুর মুখটা আজ হাঁড়ির মতো নয়, ড্রামের মতো হয়ে আছে। ওদের ঘরে চাল রাখার একটা ড্রাম আছে, ঠিক ওই ড্রামের মতো। কিন্তু বাবা কেমন করে বুঝতে পারলেন?

বাবা ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। নামাজ পড়তে যাওয়ার সময়ও টুপুর জামাটা বাইরের দড়িতে ঝোলানো ছিল। বাবা নিজেও দেখেছেন। তখন বাবা টুপুর জামাটায় হাত দিয়ে বলেওছিলেন, “জামাটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। ইস্ত্রি করানো লাগবে?”
মা জবাব দিয়েছিলেন, “এত্তটুকুন জামা ইস্ত্রি করতে হবে না। তাছাড়া জর্জেট জামা কেউ কখনো ইস্ত্রি করে নাকি?”
আসলেই এত্তটুকুন জামা। জর্জেট। হাতে নিলে টুপুর মুঠোর মধ্যেই চলে আসে। কী সুন্দর প্রিন্ট। টুপুর খুবই পছন্দ হয়েছিল জামাটা। জামাটা অবশ্য বাবাই কিনে এনেছিলেন। গতকাল সন্ধ্যের পরেই বাবা বাজার থেকে ফিরে জামার প্যাকেটটা মায়ের হাতে দিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “দেখো তো জামাটা কেমন।”
জামা শুনে মা একটু অবাক হয়েছিলেন। অবাক হয়ে বলেছিলেন, “জামা! কার জামা?”
বাবা বললেন, “খুলেই দেখো না কার জামা? দেখলেই তুমি বুঝবে।”
টুপু তখন মায়ের কাছ থেকে একটু দূরে বসা ছিল। পুতুল খেলছিল। এই ঈদেও ও ওর পুতুলদের নতুন জামা দেয়নি।
মা জামার প্যাকেট খুলতে শুরু করলেন। প্যাকেট আর কী। একটা কাগজের মোড়কের মধ্যে জামাটা ভরে স্ট্যাপলার মেরে দেয়া হয়েছে মোড়কের মুখে। ওই স্ট্যাপলারটাই খুলতে চেষ্টা করছেন মা। মা সবসময় এই কাজটাই করেন। স্ট্যাপলারের বাঁকানো অংশটা সোজা করার চেষ্টা করেন নখ দিয়ে। তারপর পিনটা খুব যত্নে বের করেন। তারপর গিয়ে প্যাকেট খোলেন। দুদিন তো এভাবে পিন খুলতে গিয়ে আঙুলের ভিতরে পিন ঢুকে গিয়েছিল। রক্তও বেরিয়েছিল। বাবা ওটা দেখে ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। এখনও রেগে যান। কিন্তু গতকাল রাগলেন না। মায়ের এভাবে পিন খোলাটা দেখলেন। মা পিন খুলে মোড়কের ভিতরে হাত দিয়ে জামাটা বের করলেন। তারপর চোখের সামনে মেলে ধরে বললেন, “খুব সুন্দর জামা তো!”
খুব সুন্দর জামা শুনেই জামাটার দিকে ঘুরে তাকিয়েছে টুপু। আসলেই খুব সুন্দর জামা। নীল জমিনে গোলাপি গোলাপি ফুল। ইয়া বড় বড় ফুল। জবা ফুলের মতো। এই প্রথম কোনো জবা ফুলকে মা সুন্দর বললেন। কিন্তু জামাটা কার?
টুপু জামাটার দিকে তাকিয়ে আছে। মা জামাটা মেলে ধরলেন। তারপর বললেন, “আমার জন্য?”
বাবা বললেন, “হ্যাঁ, তোমার জন্য।”
বলেই বাবা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন প্রায়।
বাবার হাসি শুনে টুপু প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। আসলে ও অবাক হয়ে জামাটা দেখছিল। এত সুন্দর! এই সুন্দর জামাটা বাবা মায়ের জন্য নিয়ে এলেন? ওর জন্য আনলেন না?
কিন্তু এ কি! টুপু আরো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জামার দিকে। এ জামা মা পরবেন কেমন করে?
মা টুপুর দিকে জামাটা ধরে বললেন, “আমার ঈদের জামাটা কেমন হয়েছে টুপু বল তো?”
টুপু বলল, “এটা আমার জামা।”
মা বললেন, “কেন তুই শুনিসনি, তোর বাবা জামাটা আমার জন্য এনেছে।”
টুপু বলল, “এত ছোট জামা তুমি পরবে কেমন করে?”
মা এবার জামাটা নিজের গায়ের সাথে মেলে ধরে বললেন, “তাই তো। এ জামা আমি কেমন করে পরবো?”
তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি জামাটা বদলে নিয়ে এসো। আমার মাপে আনবে। আমার জন্য এত ছোট জামা এনেছ কেন?”
বাবা কিন্তু তাকিয়ে আছেন টুপুর দিকে। টুপুর চোখ ছল ছল করছে। মনে হচ্ছে দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে আর বেশি দেরি নেই। তখনই বাবা বললেন, “আচ্ছা তোমার মাপে যখন হয়নি তখন টুপুর গায়ে ধরে দেখো তো ওর মাপে হয় কি না?”
মা বললেন, “উঁহু। সেটি হবে না। আমার জন্য জামা এনে তুমি টুপুর মাপে ধরতে বলছো কেন? এটা কি ঠিক?”
বলেই মা টুপুর দিকে তাকালেন। তারপর টুপুর কাছেই জানতে চাইলেন, “এটা কি ঠিক টুপু? তুই-ই বল।”
টুপু কী বলবে। ও এবার বুঝতে পারছে আসলে বাবা ওর জন্যেই জামাটা এনেছেন। কিন্তু মা ভাবছেন তার জন্য এনেছেন। মা এমন হিংসুটে!
মা হিংসুটে ভাবতেই ওর দুচোখ বেয়ে পানি গড়াতে শুরু করল। চোখের সামনে জামাটা ঝাপসা হয়ে এল। তখনই মা জামাটা নিয়ে ওর গায়ের সাথে মেলে ধরলেন। কী সুন্দর মানিয়েছে টুপুকে। পরলে নিশ্চয়ই আরো ভালো লাগবে। বাবা বললেন, “পরিয়ে দেখো।”
মা বললেন, “না। আগে ধুয়ে দিই। তারপর পরবে। না ধুয়ে কোনো কিছু আমি পরাই না।”
বাবা বললেন, “তা অবশ্য ঠিক। তাহলে এখনই ধুয়ে দাও।”

মা জামাটা টুপুর হাতে দিয়ে বললেন, “তোর পছন্দ হয়েছে তো?”
ততক্ষণে টুপুর চোখের পানি গড়ানো সারা। শেষ যা গড়িয়েছিল, সেটা আর পড়ার সুযোগ পায়নি। গাল বেয়ে অনেক খানি নিচে এসে আটকে আছে। ওটা দেখে বাবা বললেন, “চোখের পানি মোছো টুপু। এত ছোটখাট বিষয় নিয়ে কান্না করতে হয়? জামাটা তো তোমার জন্য আনা হয়েছে।”
বাবার কথা শুনে টুপু অবাক। এত ছোট বিষয়? এটা ছোট বিষয় হলো কেমন করে? ওর জামা মা নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কেন যে মা এমন হিংসেমী করতে চেয়েছিলেন! এটা কি ছোটখাট বিষয়?
তারপর মা হাসতে হাসতে বললেন, “বোকা মেয়ে! এটা তো তোরই জামা। তোর সাথে আমরা একটু দুষ্টুমি করছিলাম। আমাদের দুষ্টুমিটাও বুঝতে পারিস না? নে ধর।”
বলেই টুপুর হাতে জামাটা ধরিয়ে দিলেন। তার কিছুক্ষণ বাদেই টুপুর হাত থেকে জামাটা নিয়ে ধুয়ে দিলেন। ধুয়ে মেলে দিলেন ওদের বাড়ির সামনে উঠোনের মতো জায়গাটায়। ওখানেই ওদের জামা-কাপড় শুকোনো হয়।

এত সুন্দর জামাটা পরার আগেই এভাবে হাওয়া হয়ে যাবে কেউ কি ভাবতে পেরেছিল? পারেনি। এই জামা হারিয়ে টুপুর মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। মা অবশ্য ঘরেও খোঁজাখুজি করছেন। কিন্তু টুপু জানে জামাটা বাইরেই ছিল। একটা দড়ির ওপর ঝোলানো ছিল। টান টান করে মেলে দেয়া ছিল। জামার পাশে বাবার গামছাটাও ছিল। ওটা এখনও আছে। কেবল জামাটাই নেই। এই জামা হারিয়ে মন খারাপ করে বসে আছে টুপু। এ ছাড়া আর কী করবে? আর কি কিছু করার আছে?
বাবা নামাজ পড়ে এসে টুপুর দিকে তাকিয়েই বললেন, “তোমার মুখখানা আমাদের চালের ড্রামের মতো হয়ে আছে কেন?”
মা বললেন, “ওর জামাটা হারিয়ে গেছে।”
বাবা বললেন, “হারিয়ে গেছে মানে? জামা কি মানুষ নাকি যে ইচ্ছে হলো আর হারিয়ে গেল? জামা হারানোর কারণ থাকতে হবে তো। কারণ ছাড়া কোনো জামা হারায় না। কারণটা কী ছিল শুনি।”
বাবার এমন কথায় মা একটু বিরক্ত হলেন। এতক্ষণ ধরে খুঁজছেন। কিন্তু পাচ্ছেন না। তখন মা খাটের তলায় খুঁজছিলেন জামাটা। বাবা জানতে চাইলেন, “খাটের তলায় কী খুঁজছ?”
মা বিরক্তি নিয়ে জবাব দিলেন, “কী আর খুঁজবো? জামা খুঁজছি।”
বাবা বললেন, “কোন জামা খুঁজছ?”
মা বললেন, “নতুন জামা। যেটা গতরাতে টুপুর জন্য কিনে এনেছ- সেটা।”
বাবা বললেন, “কিন্তু সেটা খাটের তলায় ঢুকবে কেন? সেটা তো ছিল বাইরের দড়িতে ঝোলানো। সেটার তো খাটের তলায় ঢুকে লুকিয়ে থাকার কথা নয়।”
টুপুরও মনে হলো বাবা ঠিক কথাই বলেছেন। জামাটা বাইরের দড়িতে ঝুলে ছিল। ওখান থেকে কেমন করে এসে খাটের তলায় লুকোবে।
তবু মা খাটের তলায় খুঁজলেন। ওয়ারড্রোবের পিছনে খুঁজলেন, আলমারির দুপাশে খুঁজলেন। মোট কথা ঘরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে খোঁজা হয়নি। ঘরেও নেই, বাইরেও নেই- তাহলে যাবে কোথায় জামাটা?
জামা হারিয়ে টুপুর মুখটা এখন ড্রাম। মায়ের মুখটা পানি গরম করার হাঁড়ি আর বাবার মুখ? বাবার মুখের ভূগোল অবশ্য এখনও পরিবর্তন হয়নি। তবে বোঝা যাচ্ছে পরিবর্তন হতে বেশি সময় লাগবে না। এবার বাবাও জামা খুঁজতে শুরু করলেন।

টুপুদের বাড়িটা হচ্ছে একতলা টিনশেড। টিনের উপর তিনটে বিশাল বিশাল গাছের ছায়া পড়ে। আম গাছ, জাম গাছ আর কাঁঠাল গাছ। টিনের ছাদে ওঠার জন্য একটা সিঁড়ি আছে। ওটা বাবা নিজের হাতেই বানিয়েছেন। টুপু মাঝে মাঝে ওই সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠে। তবে টিনের ছাদে উঠতে ওর ভালো লাগে না। কেমন ঢালু। ভয় ভয় লাগে-যদি পড়ে যায়! রোদের সময় তো পা-ই রাখা যায় না। মনে হয় পা পুড়ে যাচ্ছে। বাবা চটপট ওই সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন ছাদে। আমগাছ, জামগাছ, কাঁঠালগাছের ডালে ডালে খুঁজতে শুরু করলেন। ততক্ষণে পুরো ঘরে খোঁজা শেষ করে মা এলেন উঠোনে। এসেই জানতে চাইলেন টুপুর কাছে, “তোর বাবা কোথায়?”
টুপু দেখিয়ে দিল। বাবা তখন কাঁঠালগাছের একটা ডাল ধরে ঝুলছেন। মা জোরে ডেকে বললেন, “কী করছ?”
বাবা ওখান থেকেই জবাব দিলেন, “জামা খুঁজছি।”
মা বললেন, “জামা খুঁজছ?”
বাবা বললেন, “তাহলে আর কী খুঁজবো?”
মা বললেন, “গাছে জামা ধরে বলে তো শুনিনি কোনোদিন!”
বাবা বললেন, “মানে!”
মা বললেন, “মানে আর কী। আমি জীবনে শুনিনি কেউ গাছে জামা খুঁজছে। আর কাউকে বলো না যে তুমি গাছে জামা খুঁজেছ। তাহলে সবাই ভাববে আমাদের গাছে বুঝি জামা ধরে।”
বাবা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। লজ্জা পেয়ে নেমে এলেন গাছ থেকে। মায়ের সামনে এসে বললেন, “তুমি কিন্তু সুন্দর একটা কথা বলেছ- জামার গাছ। আমাদের একটা জামার গাছ থাকলে ভালোই হতো। ওই গাছে কেবল জামা হতো। প্রথমে হতো জামার ফুল। তারপর জামার ফল। সেই জামার ফলটা ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় হতো। যেই আমাদের টুপুর মাপে হয়ে যেত তখনই আমরা জামাটা পেড়ে ফেলতাম গাছ থেকে। তারপর টুপু গাছে ধরা জামা পরে বাইরে ঘুরতে যেত। সেই জামা আরো বড় হয়ে যখন তোমার মাপে হতো, তখন তুমি পরতে।”
মা বললেন, “তাহলে তোমার জামা?”
বাবা বললেন, “ওটা তো তোমাদের জামার গাছ। তোমাদের মতো জামা কি আর আমি পরতে পারি? আমার জন্য আলাদা জামার গাছ থাকতো।”
মা বললেন, “একটা জামার গাছ থাকলে কী হতো! একই গাছে সবার জন্য জামা ধরবে।”
বাবা যেন কী বলতে চেয়েছিলেন, বলতে পারলেন না। তখনই ওদের দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। বাবা দরজা খুলেই দ্যাখেন মসজিদের ইমাম সাহেব। ইমাম সাহেবেরে সারা গায়ে রক্ত। তিনি পশু জবাই করে বেড়াচ্ছেন। তখনই বাবার মনে পড়ল তাদের তো ছাগল জবাই দিতে হবে। বাবা তোড়জোড় শুরু করলেন। এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওদের উঠানে ছাগল জবাই দিয়ে চলে গেলেন ইমাম সাহেব। ভাগ্যিস ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে ছাগলটাকে গোসল করিয়ে দিয়ে গেছেন। না হলে আরো দেরি হতো। ছাগলের চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে সব কাজ করার জন্য একজনকে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন বাবা। ছাগল জবাই দেয়ার ঠিক আগেই সে এসে হাজির। ব্যস! জবাই হওয়ার পর শুরু হলো ছাগলের চামড়া ছাড়ানো।
টুপু কত আশা করে ছিল, কেমন করে পশুর চামড়া ছাড়ায়, মাংস আলাদা করে-সব দেখবে। কিন্তু ওর মনটাই খারাপ হয়ে আছে। কিছুই ভালো লাগছে না। জামা হারালে কারোই ভালো লাগে না। আর সেটা যদি হয় ঈদের জামা, তাহলে তো কথাই নেই। মন খারাপ না হয়ে পারেই না।
একটু পরেই আয়েশা এল ওদের বাড়ি। নতুন জামা পরে এসেছে আয়েশা। টুপুকে দেখেই বলল, “তুমি এখনও নতুন জামা পরোনি?”
টুপু বলল, “না।”
আয়েশা বলল, “তোমার নতুন জামা হয়নি?”
টুপু বলল, “হয়েছিল। হারিয়ে গিয়েছে। এই আজ সকালে। জানো মা সারা ঘর খুঁজেছে। বাবা গাছের ডালে ডালে খুঁজেছে। কিন্তু পায়নি।”
আয়েশা বলল, “তাহলে মনে হয় ওটা জাদুর জামা। জানো আমার দাদুরও এমন একটা জাদুর জামা ছিল। একদিন দাদু জামাটা গা থেকে খুলে আলনায় রেখেছেন, আর অমনি ওটা হাওয়া হয়ে গেল। খুঁজেই পাওয়া গেল না। জামা হারিয়ে দাদুর সে কি মন খারাপ। তারপর অনেকদিন কেটে গেল। দাদু একসময় জামার কথা ভুলেই গেলেন। হঠাৎ একদিন দাদু দেখেন ওই জামাটা আলনায় ঝুলছে। দাদু তো জামা দেখে অবাক। খুব হই চই করলেন। দাদু ভেবেছেন কেউ একজন জামাটা পরে ওখানে রেখে গিয়েছে। কিন্তু যাকেই জিজ্ঞেস করেন, সে-ই বলে সে জামাটা দেখেইনি। অথচ দাদুর তখন মনে পড়ল তিনি ঠিক যেভাবে জামাটা রেখেছিলেন, সেভাবেই আছে। ঠিক সেরকম ভাঁজ। আমার মনে হয় তোমার জামাটাও আমার দাদুর জামার মতো জাদুর জামা। একসময় ঠিক পেয়ে যাবে।”

আয়েশার জন্য কিছু খাবার এনেছিলেন মা। তখনই শুনতে পেলেন আয়েশা ওর দাদুর জামার গল্প করছে। গল্পটা মন দিয়ে শুনলেন মা। তারপর বললেন, “তুমি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলো আয়েশা। তোমার দাদুর জাদুর জামার কথা এত মনে রেখেছ কেমন করে?”
আয়েশা লজ্জা পেল মায়ের কথা শুনে।
মা বললেন, “লজ্জা পাচ্ছ কেন? বলো। তুমি এত কিছু মনে রেখেছ কেমন করে? তাছাড়া গল্পটা করেছ বেশ গুছিয়ে।”
আয়েশা বলল, “দাদুর কাছ থেকে গল্পটা অনেকবার শুনেছি। কতবার শুনেছি মনে নেই। তাই মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। আমাদের বাসার সবার এই গল্পটা মুখস্ত। আমাদের বাসায় কেউ বেড়াতে গেলে, সুযোগ পেলে দাদু তাকেও গল্পটা শোনান। আপনি গল্পটা শুনতে আমাদের বাসায় যাবেন আন্টি?”
মা বললেন, “যাবো একদিন। এখন খাও।”

বলে মা একটা বাটিতে খাবার নিয়ে নিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু আয়েশা কিছুই খাচ্ছে না। তিনি বুঝতে পেরেছেন, তিনি সামনে আছেন বলে লজ্জায় খাচ্ছে না। তিনি চলে এলেন ওখান থেকে।
এই ঈদে খুব কম অতিথিই বেড়াতে আসে। সবাই ব্যস্ত থাকে কুরবানী নিয়ে। একটু পর এল মইনুল। মইনুল টুপুর খালাতো ভাই। থাকে মিরপুর। আর টুপুরা থাকে ঝিগাতলা। কিন্তু এত সকালে মইনুল এল! টুপুর মা মানে মঈনুলের খালা একটু অবাক হলেন। অবাক হয়ে বললেন, “তুই! এত সকালে!”
মইনুল বলল, “চলে এলাম খালা।”
তারপর খালার হাতে একটা পুটুলি ধরিয়ে দিল। মা জানতে চাইলেন, “কী এটা?”
মইনুল বলল, “আমাদের কুরবানীর মাংস।”
মা বললেন, “এত তাড়াতাড়ি হয়ে গিয়েছে?”
মইনুল বলল, “হুঁ। তোমাদেরটা হয়নি?”
মা বললেন, “আর বলিস না। আমাদের বাসায় একটা ঝামেলা হয়েছে।”
মইনুল অবাক হয়ে জানতে চাইল, কী ঝামেলা?
মা বললেন, “টুপুর জন্য ওর বাবা একটা জামা কিনে এনেছে। জাদুর জামা। ওটা আজ সকাল থেকে উধাও।”
মইনুল হেসে বলল, “তাহলে ওটা ঈদ করতে বেরিয়েছে।”
জামার কথা শুনেই দৌড়ে এল টুপু।
মা বললেন, “তুমি তো শুনেছি কিছু কিছু গোয়েন্দগিরি করো। তা টুপুর জামাটা খুঁজে দাও না।”
মইনুল হাসতে হাসতে বলল, “ওটা তো জাদুর জামা। জাদুর জামা খুঁজে বের করতে জাদুকর লাগবে।”
মা বললেন, “গোয়েন্দারাও তো এক ধরনের জাদুকর। কী ভাবে কী ভাবে বুদ্ধি খরচ করে ওরা রহস্যের মীমাংসা করে।”
মইনুল বলল, “তা করে। আচ্ছা জামাটা কোথায় ছিল?”
টুপু বলল, “দড়িতে ঝোলানো ছিল। বাবা ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় ওটা দড়িতে ঝুলতে দেখেছেন।”
মইনুল বলল, “বাড়িতে কে কে ছিল তখন?”
মা বললেন, “আমি আর টুপু।”
মইনুল বলল, “কেউ এসেছিল তখন?”
মা বললেন, “না।”
মইনুল বলল, “বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়নি তো আবার!”
মা বললেন, “বাতাসে উড়িয়ে আর কোথায় নিয়ে যাবে?”
মইনুল বলল, “আশপাশের কোনো বাড়িতে?”
মা বললেন, “বাতাসের অতো জোর ছিল না।”
মইনুল বলল, “তাহলে তো চিন্তার বিষয়।”
মা বললেন, “খুব চিন্তার বিষয়। এখন টুপু কী পরে ঈদ করবে?”
মইনুল বলল, “একটা নতুন জামা কিনে দিলেই তো হয়।”
মা বললেন, “আজ ঈদের দিন। কোনো দোকান কি খোলা থাকবে?”
মইনুল বলল, “তা থাকবে না।”
মইনুল আবার খুঁজতে শুরু করল।

টুপুদের বাড়িতে তিনটে ঘর। তিনেটে ঘরের মধ্যে একটা শোবার ঘর। একটা রান্না ঘর। গোসলখানা একটা। টয়লেট আলাদা। একটা রান্নাঘর। টয়লেট আর গোসলখানা একটু দূরে। একটা উঠোন পেরিয়ে যেতে হয়। ওই উঠোনেই রোদ পাওয়া যায়। তিনটা দড়ি ঝোলানো আছে ওখানে। ওই দড়িতেই টুপুদের কাপড় শুকোনো হয়। গোসলখানা, টয়লেট, রান্নাঘর-সবই খুঁজল মইনুল। ওর কেন যেন মনে হচ্ছে জামাটা ঘরের ভিতর যায়নি। বাইরে কোথাও আছে। কিন্তু কোথায় আছে?
সামান্য নাস্তা খেয়ে আয়েশা চলে গেল। যাওয়ার সময় টুপুকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু টুপু যায়নি। নতুন জামা না পরে ও কারো বাড়িতে যাবে না।
টুপুর বাবা ছাগলের চামড়া ছাড়ানোর কাজে সাহায্য করছেন। চামড়া ছাড়ানো প্রায় শেষ।

মইনুল ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে গেল। ঘরের আশপাশে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। নেই। বাড়ির আশপাশ একেবারে পরিস্কার। গতকাল টুপুর বাবা নিজেই ঝাঁট দিয়েছেন। ছুটির দিনে বাড়ির আশপাশ তিনিই পরিস্কার করেন।

টুপুর বাবা বললেন, “কী খুঁজছ মইনুল?”
মইনুল বলল, “জামা।”
টুপুর বাবা বললেন, “জামাটা কোথায় গেল কে জানে?”
মইনুল বলল, “শুনেছি ওটা নাকি জাদুর জামা?”
টুপুর বাবা বললেন, “হতে পারে। না হলে এমনভাবে উধাও হয়ে যেতে পারে না। আচ্ছা খোঁজ। ঘরের ভিতর খুঁজেছ?”
মইনুল বলল, “ঘরের ভিতর নেই- এটা আমি নিশ্চিত। আচ্ছা জামাটা আপনি শেষ কখন দেখেছেন?”
টুপুর বাবা এবার হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “বুঝেছি। তুমি সত্যিকার গোয়েন্দাদের মতোই কাজ করতে চাইছ। খুব ভালো। জেরাটা কি আমাকেই দিয়েই শুরু করতে চাও?”
মইনুল হেসে ফেলল টুপুর বাবার কথায়। হাসতে হাসতে বলল, “আসলে খালু এটা জেরা নয়। জানা। জেরা তো করে আসামীদের। আপনি তো আর আসামী নন।”
টুপুর বাবা বললেন, “তা ঠিক বলেছ। কিন্তু এই জানাটা আমাকে দিয়েই শুরু করতে চাইছ কেন?”
মইনুল বলল, “আমি শুনেছি আপনি নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে জামাটা দেখে গিয়েছিলেন। নামাজ পড়ে এসে দ্যাখেন জামা নেই।”
টুপুর বাবা বললেন, “নামাজ পড়ে এসেই জামা দেখিনি- তা নয়। নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে জামা দেখেছিলাম। তারপর নামাজ পড়ে আসার পর জামার দিকে তাকাইনি। ওটা ওখানে ছিল কী ছিল না বলতে পারবো না। টুপুকে নতুন জামা পরাতে যাওয়ার সময়ই খেয়াল হলো জামা নেই।”
মইনুল বলল, “ওটার আশপাশে আর কোনো কাপড় দেখেছিলেন?”
টুপুর বাবা বললেন, “সম্ভবত না। কারণ আমি সবটুকু মনে করতে পারছি না।”
মইনুল বলল, “তাহলে আপনি শুধু নতুন জামার কথা মনে করতে পারলেন কেন?”
টুপুর বাবা বললেন, “এবার মনে হয় তুমি আমাকে জেরাই করছ।”
মইনুল হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, “আসলে টুপু আমাকে বলেছে জামাটা খুঁজে বের করে দিতে। আমি ঠিক জানতে চাইছি কখন জামাটা হারিয়ে যায়। ওই সময়টা বের করতে।”
টুপুর বাবা বললেন, “আচ্ছা। তোমার প্রশ্নের জবাবে জানাচ্ছি জামাটা নতুন বলেই ওটার কথা মনে করতে পারছি। কিন্তু সময় বের করতে পারলে কী করবে?”
মইনুল বলল, “ওই সময় ঘরে আর কেউ ছিল কি না বা কেউ এসেছিল কি না সেটা বের করার চেষ্টা করবো।”
টুপুর বাবা বললেন, “ওই সময় ঘরে কেউ এসেছিল কি না সেটা তোমার খালা ভালো বলতে পারবেন। কারণ আমি তখন নামাজে গিয়েছিলাম।”
মইনুল এবার খালার কাছে গিয়ে জানতে চাইল, “আচ্ছা খালু যখন নামাজ পড়তে যান, তখন কি বাইরের মূল দরজাটা আটকানো হয়েছিল?”
টুপুর মা বললেন, “আমি নিজে গিয়ে আটকিয়েছি। আমাদের ঘরে কখনো মূল দরজা খোলা থাকে না। আমি সবসময় ওই দরজা আটকে রাখার চেষ্টা করি।”
মইনুল বলল, “দরজা আটকে দিয়ে আসার সময় কি জামাটা ওখানে দেখেছিলেন?”
টুপুর মা বললেন, “তখন তো খেয়াল করিনি।”
মইনুল বলল, “আবার যখন খালু নামাজ পড়ে ঘরে এলেন, তখন দরজা খুলে দিয়েছিল কে?”
টুপুর মা বললেন, “তখন টুপুই দরজা খুলে দিয়েছিল।”
মইনুল বলল, “সত্যিই কি তখন খালু ঘরে এসেছিলেন?”
টুপুর মা বললেন, “হ্যাঁ।”
মইনুল জানতে চাইল, “খালু নামাজ পড়তে যাওয়ার পর কি একবারই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়েছিল?”
টুপুর মা বললেন, “একবারই। এবং তখনই তোর খালু আসেন।”

এবার চিন্তায় পড়ে গেল মইনুল। কী যেন ভাবতে লাগল। বসার ঘরে এসে সোফায় বসল। খালু উঠোন থেকে হাঁক দিলেন, “ওকে কিছু খেতে দাও। এত দূর থেকে এসেছে। আসা মাত্রই তোমার কাজে লাগিয়ে দিয়েছ।”
তাই তো! এ কথা তো মনে হয়নি টুপুর মায়ের! মঈনুলের কাছে এসে টুপুর মা বললেন, “কী খাবি বল? ঝাল বা মিষ্টি।”
মইনুল বলল, “কী কী আছে খালা?”
টুপুর মা বললেন, “হালিম, ফিরনি, সেমাই আর নুডুলস।”
মইনুল বলল, “হালিম দাও।”
খালা হালিম আনলেন। সেমাইও আনলেন। সেমাই দেখে মইনুল বলল, “সেমাই কেন?”
টুপুর মা বললেন, “তোর যেটা খুশি খা। যদি সেমাই খেতে ইচ্ছে করে তাহলে খাস।”
টুপু হালিম খেতে শুরু করল। বেশ মজার হালিম। ঘরেও এত মজার হালিম তৈরি করা যায়! খেতে খেতে জানতে চাইল, “হালিম কে করেছে খালা?”
টুপুর মা বললেন, “আমি ছাড়া এ ঘরে আর রান্না করার মতো কে আছে? আমিই করেছি। হালিম মজা হয়নি?”
মইনুল বলল, “খুব মজা হয়েছে। কিন্তু ঘরে এত মজার হালিম তৈরি করা যায়?”
টুপুর মা বললেন, “হালিম বানানো খুবই সোজা। এখন তো মেশানো হালিম কিনতে পাওয়া যায়। কেবল মাংসের সাথে দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিলেই হলো। তবে একটু সময় নিয়ে ফোটালে ভালো। ডাল থাকে তো। ডাল আবার সেদ্ধ হতে সময় লাগে।”
মইনুল বলল, “খালা আমাকে আরো একবাটি হালিম দাও।”
টুপুর মা এবার উঠে গিয়ে আরো একবাটি হালিম নিয়ে এলেন। মইনুল বেশ মজা করে খেতে লাগল। হালিম শেষ করে সেমাই খেল।
খালা বললেন, “চা খাবি?”
মইনুল বলল, “খাবো।”
খালা এবার চা বানাতে গেলেন।
টুপু এসে মঈনুলের ঠিক সামনের সোফায় বসল। মইনুল বলল, “টুপু মণি তোমার কি মন খারাপ?”
টুপু বলল, “তা তো খারাপই মইনুল ভাইয়া। তুমি কি জামাটা খুঁজে পাবে?”
মইনুল বলল, “খুঁজে মনে হয় পেয়েছি রে!”

টুপুর মুখ এবার খুশিতে লাল হয়ে গেল। এতক্ষণ বেশ মুখ ভার ছিল। এখন হালকা হয়ে গিয়েছে অনেকখানি। জামাটা পেলেই তবে পুরো হালকা হবে। জানতে চাইল, “তাহলে জামাটা আমাকে এনে দাও। নয় তো বলো কোথায় আছে। আমি নিজেই গিয়ে নিয়ে আসি।”
মইনুল বলল, “কিন্তু তুই নিজে গিয়ে ওখান থেকে নিয়ে আসতে পারবি না।”
টুপু বলল, “তাহলে তুমি এনে দাও।”
মইনুল বলল, “এনে দিতে পারলে তো সেই কখন এনে দিতাম!”
টুপু বলল, “তবে যে বললে খুঁজে পেয়েছ?”
মইনুল বলল, “খুঁজে পেয়েছি বলিনি। বলেছি মনে হয় তোর জামার খোঁজ পেয়েছি। মানে কোথায় আছে বুঝতে পারছি একটু একটু। আরেকটু খোঁজ করলে কোথায় আছে বের করতে পারবো।”
টুপুর যেন আর তর সইছে না। বলল, “তাহলে খোঁজো। ওটা পরে আমি আয়েশাদের বাড়ি বেড়াতে যাবো।”
মইনুল বলল, “কিন্তু ওই জামাটা যে আর পরা যাবে না!”
টুপু অবাক হয়ে বলল, “কেন?”
মইনুল বলল, “ওটা নষ্ট হয়ে গেছে।”
টুপু আরো অবাক। বলল, “নতুন জামাটা নষ্ট হয়ে গেল! এত তাড়াতাড়ি! তবু আমি ওটা পরবো।”
মইনুল বলল, “ওটা পাওয়ার পর যদি তুমি পরতে চাও তো পরতে পারো। আমার মনে হয় তুমি ওটা আর পরতে চাইবে না। আগে বের করে নিই জামাটা।”

তখনই খালা এলেন চা নিয়ে। দুকাপ। নিজের জন্য এককাপ আর মঈনুলের জন্য এক কাপ। মঈনুলের হাতে চায়ের কাপ দিতে দিতে খালা বললেন, “তুই চা খাওয়া ধরলি কবে থেকে?”
মইনুল বলল, “মাঝে মাঝে খাই।”
টুপুর মা বললেন, “কিন্তু তোদের ঘরে তো জানি চা হয় না। তুই খাস কেমন করে?”
মইনুল বলল, “বাবা চা খেতে পছন্দ করেন না। মা তো খানই না। আমার যখন ইচ্ছে হয় বাইরে গিয়ে দোকান থেকে খেয়ে আসি। তবে শুধু বিকেলে। বিকেলে চা খেতে খুব ভালো লাগে আমার।”
টুপুর মা বললেন, “চায়ে চুমুক দিয়ে দ্যাখ, কিছু লাগবে কি না।”
মইনুল চায়ে চুমুক দিল। অসাধারণ! খালা এত সুন্দর চা বানায়! বলল, “তুমি তো খুব মজার চা বানাও খালা।”
টুপুর মা বললেন, “এগুলো টুপুর জামা খুঁজে দেয়ার আগে তোকে বখশিশ। পরেও অবশ্য বখশিশ পাবি।”
তখনই টুপু বলল, “মা ভাইয়া নাকি জামা কোথায় আছে জানে।”
টুপুর মা অবাক হয়ে বললেন, “তাই নাকি রে মইনুল?”
মইনুল বলল, “অনেকটা সেরকমই মনে করছি।”
টুপুর মা বললেন, “কোথায় আছে বল না।”
মইনুল বলল, “উঁহু। আগে বলা যাবে না। আগে পেয়ে নেই তারপর। এখনও আরো কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ হলেই বুঝতে পারবো কোথায় আছে।”
টুপুর মা বললেন, “তুই তো একটা ধারনা করেছিস কোথায় আছে।”
মইনুল বলল, “তা করেছি।”
টুপুর মা বললেন, “সেটাই আমাকে বল।”
মইনুল বলল, “যদি সেখানে না থাকে? এজন্য নিশ্চিত না হয়ে বলা ঠিক না। এটা গোয়েন্দানীতির পরিপন্থী।”
টুপুর মা বললেন, “বেশ কথা শিখেছিস দেখছি। ঠিক আছে, তোকে গোয়েন্দানীতির পরিপন্থী কোনো কাজ করতে হবে না। তুই টুপুর জামাটা খুঁজে বের করে দিলেই আমি খুশি। তোর জন্য বিশেষ বখশিশ আছে।”
মইনুল বলল, “তাহলে খালা বখশিশটা আগেই দিয়ে দাও।”
টুপুর মা বললেন, “আগে জামা খুঁজে বের করে দে, তারপর।”
মইনুল বলল, “জামা খুঁজে বের করার পর তুমি আর আমাকে বখশিশ দিতে চাইবে না।”
টুপুর মা বললেন, “কেন?”
মইনুল বলল, “জামাটা আর টুপুকে পরাতে পারবে না তুমি।”
টুপুর মা বললেন, “তাহলে তুই বলতে চাইছিস জামাটা...”
টুপুর মা আর কথা শেষ করলেন না। কিন্তু খালা কী বোঝাতে চেয়েছেন বুঝতে পেরেছ মইনুল। মইনুল বলল, “অনেকটা তেমনই।”
টুপুর মা বললেন, “তা অবশ্য ঠিক। তবে ওখানে তো এর আগেও আরো কিছু পড়ে গিয়েছিল। ওগুলো আংটা দিয়ে টেনে বের করতে হয়েছে। বের না করলে আটকে যাবে না? জোরে পানি ঢাললেও যায় না।”
মইনুল বলল, “বুঝেছি। তুমি টয়লেটের প্যানের কথা বলছ। তোমাদের ঘরেও কি টয়লেটের প্যানে কিছু পড়ে?”
টুপুর মা বললেন, “পড়ে। প্রায়ই পড়ে। তখন ওগুলো বের না করলে পানি আটকে যাবে না?”
মইনুল বলল, “জামাটা যদি টয়লেটের প্যানে পড়ত তাহলে এতক্ষণে পানি আটকে যেত না প্যানে?”
টুপুর মা বললেন, “তা যেত। কিন্তু এতক্ষণেও আটকালো না কেন?”
মইনুল বলল, “কারণ ওটা টয়লেটের প্যানে পড়েনি।”
টুপুর মা এবার আরো অবাক! চোখ দুটো বড় আর গোল করে জানতে চাইলেন, “তাহলে কোথায় পড়েছে?”
মইনুল বলল, “কোথাও পড়েনি। ওটা জায়গা মতোই আছে। আমি তাহলে খুঁজে দেখি।”

ততক্ষণে চা খাওয়া শেষ। উঠোনে এসে দেখল ছাগলটার চামড়া ছাড়ানো শেষ। একটা দড়ি দিয়ে পিছনের পা দুটো বেঁধে উল্টো করে ছাগলটাকে ঝোলানো হয়েছে। টুপুকে সাথে নিয়ে উঠোনে এল মইনুল। টুপুকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা তোমার নতুন জামা কোন দড়িতে শুকোতে দেয়া হয়েছিল টুপু?”
টুপু দড়িটা দেখালো। তারপর জানতে চাইল, “দড়ির কোন জায়গাটায় ঝোলানো ছিল?”
টুপু জায়গাটা দেখাল। ওটার ঠিক নিচে ছাগলের গোবর। তবে খুবই অল্প। এখনও জায়গাটা পরিস্কার করা হয়নি। মইনুল কী যেন ভাবল। আর ভাবতে ভাবতেই ওর মুখে একটা হাসি ফুটে ওঠল। তারপর ছাগল কাটাকুটি দেখতে লাগল।
টুপু বলল, “আমার জামা খুঁজলে না ভাইয়া?”
মইনুল বলল, “আর খোঁজা লাগবে না।”
টুপু বলল, “পেয়েছ?”
মইনুল বলল, “এখনও পাইনি। তবে পাবো।”
টুপু জানতে চাইল, “কখন পাবে?”
মইনুল বলল, “আর কিছুক্ষণ পরেই পাবো। একটু অপেক্ষা তো করতেই হবে টুপু।”
টুপু বেশ গম্ভীর হয়ে বলল, “কীভাবে অপেক্ষা করবো- শুয়ে, বসে নাকি হেঁটে।”
টুপুর কথা শুনে হেসে ফেলল মইনুল। হাসতে হাসতে বলল, “তোমার যে ভাবে খুশি। তবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেই ভালো হবে।”
ছাগল বানানো শেষ। বানানো শব্দটা অবশ্য কসাই ছেলেটার মুখ থেকেই বেরিয়েছে। বানানো মানে হলো ছাগলের হাড়-মাংশ কাটাকুটি শেষ। এবার রয়েছে পাকস'লী। ওটা ওই ছেলেটাই পরিস্কার করবে।
টুপুর মা বললেন, “ঘরের ভিতরেই পরিস্কার করবে?”
টুপুর বাবা বললেন, “নয় তো কোথায় পরিস্কার হবে?”
টুপুর মা বললেন, “ওটা বাইরে পরিস্কার করো। ঘরে দুর্গন্ধ ছড়াবে।”
টুপুর বাবা বললেন, “ঠিকই বলেছ। এটা তো মাথায় আসেনি আগে। বাইরে তো একটা গর্তও খুঁড়ে রেখেছি। ওই গর্তেই ময়লা ফেলবো। তাহলে সারের কাজও করবে।”
কসাই ছেলেটা ছাগলের পাকস্থলী নিয়ে বাইরে গেল। মইনুল বলল, “চলো টুপু আমরা বাইরে যাই। তোমার জামাটা বাইরে যাচ্ছে মনে হয়।”
টুপু বলল, “কিন্তু তুমি যে তখন বললে জামাটা ঘরেই আছে। এখন আবার বলছ বাইরে।”
মইনুল বলল, “এতক্ষণ ঘরেই ছিল। এখন বাইরে যাচ্ছে।”
টুপু বলল, “জামার কি পা আছে যে নিজে নিজে বাইরে যেতে পারবে?”
মইনুল বলল, “ওটা যে জাদুর জামা টুপু। চল।”
বাইরে সত্যি একটা গর্ত করা ছিল। ছাগলের পাকস্থলীটা গর্তের পাশে রাখা হলো। কসাই ছেলেটা ছুরি দিয়ে পাকস্থলী কেটে ফেলল। আর ভিতর থেকে ছাগলের গোবর বেরুল। আরো কিছু বেরুল। প্রায় আস্ত কাঁঠালপাতা বেরুল কয়েকটা। দুটো কাগজও দেখা গেল।
টুপু বলল, “আমরা কি এগুলো দেখার জন্যই বাইরে এসেছি?”
মইনুল বলল, “না রে টুপু। আমরা তোর জামা খুঁজতে বাইরে এসেছি।”
টুপু বলল, “তাহলে জামা খোঁজো।”
মইনুল বলল, “খুঁজছি।”
বলেই একটা লম্বা লাঠি খুঁজে নিয়ে এলো। লম্বা লাঠি মানে কাঁঠালের ডাল। ওই কাঁঠালের ডাল দিয়ে ছাগলের গোবর ঘুটতে লাগল মইনুল। আর তখনই বেরিয়ে এল টুপুর জামা।
জামা দেখে টুপুর কিন্তু মন খারাপ। বেশ মন খারাপ। ছাগলটা শেষ পর্যন্ত ওর জামাটাকেই খাবার ভাবল।

টুপুর জামা দেখে তো সবাই অবাক! টুপুর বাবা বললেন, ভাগ্যিস তুমি আসার আগে ছাগলটা জীবিত ছিল না। নইলে ছাগলটাকেও জেরা করতে।
টুপুর মা বললেন, “তুই কেমন করে জানলি টুপুর জামাটা ছাগলের পেটেই আছে!”
মইনুল বলল, “খালু নামাজ পড়তে যাওয়ার সময়ও জামাটা ওখানে ছিল। এর মধ্যে ঘরে কেউ ঢোকেনি। কেউ যদি ঢুকত তাহলে ধরে নেয়া যেত চুরি হয়েছে। তখনই আমরা মনে হলো ছাগল কি না খায়। কিন্তু টুপুর জামাটা ঠিক ছাগলের মাথার উপর শুকোতে দেয়া ঠিক হয়নি খালা।”
টুপুর মা বললেন, “কী করবো, ওখানেই তো রোদ পড়ে বেশি।”
টুপু বলল, “আমি তখনই ভেবেছিলাম, এটা বদ ছাগল। প্রথমদিন আমার হাত খেতে চেয়েছিল।”
টুপুর বাবা বললেন, “নিজেকে ধন্যবাদ দে টুপু, ছাগলটা কেবল তোর ঈদের জামা খেয়েছে। যদিও হজম করতে পারেনি। যদি তোকেও খেয়ে ফেলত!”
টুপুর মা মইনুলের হাতে কিছু একটা গুঁজে দিলেন। মইনুল নিতে চায়নি। বলল, “না না খালা। এসবের দরকার নেই। টুপু তো জামাটা পরতে পারবে না।”
টুপুর মা বললেন, “এটা সেজন্য না। আজ ঈদের দিন না, তোর ঈদের বখশিশ।”
টুপুর বাবা বললেন, “যাক। জামাটা যে পাওয়া গেল এই বেশি। নয়ত অনেকদিন মনটা খচ খচ করতো-জামাটা কোথায় গেল, জামাটা কোথায় গেল?”

টুপুর মুখটা আরো ভার হয়ে গেল। বাবা টুপুর ভার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোকে আমি কালই আরেকটা নতুন জামা কিনে দেবো। তবু মুখটা এত ভার করে রাখিস না। একেবারে আমাদের পানির ট্যাংকি বানিয়ে রেখেছিস দেখছি।”
ব্যস। আর কি টুপু না হেসে পারে? ভেবেছিল, মুখটাকে সারাদিন ভার করে রাখবে। কিন্তু পারল কই? বড়দের জন্য মুখটাকে ভার করে রাখারও উপায় নেই।