Category: গল্প
News Headings
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Jan 11, 2009
Source: bdnews24.com
Source: bdnews24.com
তৈল মর্দন
সজ্জাদ কবীর
“তেল না মারলে কিছু হয় না বুঝলি খেলু। আমাকে দেখ, মাত্র তিন মাসে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর করে কোথায় উঠেছি।”, কথাটা বলে নিজের দিকে আর নিজের ড্রয়িং রুমের দিকে আড়চোখে দেখে নিল।
আমিও ভেবে দেখলাম চিটু ভাই কথাটা মিথ্যে বলেনি। ওনার আসল নাম চিটু না, তবে চিটু ভাইয়ের নাম, চরিত্র এক সুতোয় বাঁধা। একটু খুলে বললেই বোঝা যাবে।
ছোট থাকতে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্যে বা সিনেমা দেখার জন্য যাকে পেত তার সাথেই চিটিং করতো চিটু ভাই। ওর আসল উদ্দেশ্য হলো সিনেমা দেখা আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া। তাতে যাকেই হোক, যে রকমই হোক ধাপ্পা দিতে কসুর করতো না। সেই থেকে তার আসল নাম ওয়াহিদ বেগ হারিয়ে গিয়ে চিটার থেকে ছোট হয়ে চিটু হয়ে গেলেন।
এ বিষয়ে তিনি এতটাই নির্বিকার যে চিটু বলে ডাকলেও কোন কিছু মনে করেন না। তো সেই চিটু ভাই কারো কাছেই পাত্তা পেতো না ইদানিং। কিন্তু কী হলো তাতে? স্রেফ তিন মাসের মধ্যে পাড়ার চকচকে ঝকঝকে লোক হয়ে গেল। কী যে ব্যবসা করে আমি ঠিক বুঝি না। তবে পুরনো চিটিং বিদ্যাটা যে ব্যবসার বিরাট একটা পুঁজি সেটা বেশ বুঝতে পারি।
চিটু ভাই আরো বলে, “তেল মারার উপর বই আছে কত। আমেরিকায় তো ‘তৈল মর্দন’ ইউনিভার্সিটির একটা নতুন সাবজেক্টই হয়ে গেছে।”
আমি নিশ্চিত যে চিটু ভাই ওই সাবজেক্টে পড়লে তার প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া কেউ ঠেকাতে পারতো না। যাক, সেই চিটু ভাইয়ের কথা শুনে আমার টনক নড়লো। আমার কবি হওয়ার অন্তরায় কোথায় তা ধরে ফেলেছি। এত কবিতা এ পর্যন্ত লিখেছি যে কম্পিউটারের ছোট-খাটো হাডডিস্কে তা ধরবে না। কবিতার খাতা যা জমেছে তা বয়ে নিয়ে যেতে গাট্টাগোট্টা কুলি লাগবে। খালি বল পয়েন্ট পেন জমা হয়েছে এক গ্রুস। কিন' বিপুল কবিতা সম্ভার থেকে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গন বঞ্চিত রয়ে গেলো। তার একমাত্র কারণ তেল মারার অভাব বা বলা যায় তেল মারতে না জানা। চিটু ভাই আমার চোখে দুরবীন লাগিয়ে ব্যাপারটা দেখিয়ে দিলেন। তার ফর্মুলা অনুযায়ী প্রথমে কাজ আদায়ের জন্য তেল মারতে হবে। তারপর কাজ গড়গড়িয়ে গাড়ির মতো চলতে থাকবে। কিন' মুশকিল হলো তেল যে কীভাবে মারা যায় তাইতো বুঝতে পারছি না।
শেষে চিটু ভাইকে ব্যাপারটা খুলেই বললাম। আমার কবিতার কথা, আমার ইচ্ছার কথা। জিজ্ঞেস করলাম, “কোন তেল দেবো বলেন তো, সয়াবিন না সরিষা? আর মারবই বা কী করে? ছুঁড়ে না পিচকিরি দিয়ে?”
চিটু ভাই আমার দিকে কটমট করে তাকালো, বললো, “তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”
“কেন!”, আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করি।
দশ সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে চিটু ভাই বলে, “তুই তো একটা গরু।”
মনে মনে ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। যতদূর মনে পড়ছে আমি তো মানুষই ছিলাম। তবে কি এর মধ্যে কোন গন্ডগোল হল। তাড়াতাড়ি মাথায় হাত দিলোম।। না শিং-এর চিহ্ন মাত্র নেই। কেন যে আমায় এমন ঘাবড়িয়ে দেয় বুঝি না। জিজ্ঞেস করলাম, “এর মানে ঠিক বুঝতে পারছি না।”
চিটু ভাই তেড়ে মেরে উঠে বললেন, “আরে গাধা, এ তেল মানে তো সে তেল না।”
“তাহলে তেল মানে কি পানি?”
উনি আরো রেগে গিয়ে বললেন, “তেল মানে পানি হবে কেন! তেল মানে তো তেলই।”
“আপনিই তো বললেন, তেল মানে তেল না।”
চিটু ভাই তখন আমাকে বোঝাবার ভাষা খুঁজে না পেয়ে আঁক আঁক করে চিল্লাতে আর লাফাতে শুরু করেছেন। যা হোক, চিটু ভাইয়ের লাফালাফি বন্ধ হলে কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, আমিও বিলকুল বুঝে গেলাম কীভাবে তেল মারতে হয়।
প্রথমেই কয়েকজন কবির নাম ঠিকানা জোগাড় করে ফেললাম। এদেরকে তেল মেরেই আমাকে উপরে উঠতে হবে। প্রথমে যাকে টার্গেট করলাম তিনি সরকারী অফিসে চাকরি করেন। উনি যেখানে থাকেন সেখান থেকে ওনার অফিস খুব বেশি দূরে না। হেঁটেই যাতায়াত করেন। চিটু ভাইয়ের কথা অনুযায়ী ‘সালাম’ হচ্ছে তেল মারার মহা ঔষধ। সারাদিনে যতবার দেখা হবে ততবারই সালাম দিতে হবে। তাতে করে নাকি আমাকে সে ভদ্রলোক সহজেই চিনে ফেলবে। আর তাহলেই কিল্লা ফতে। কিন্তু সাফায়েউল্লা সাহেব, অর্থাৎ আপাতত যে কবিকে আমি টার্গেট করছি, উনি অফিস যান সাতটায়, বের হন দুটায়। তারপর আর ঘর থেকে বেরই হন না বলতে গেলে। এদিকে এক দিনে অন্তত গোটা আটেক সালাম না দিলে তো কাজ হবে না। মনে মনে এক বুদ্ধি ঠিক করে ওনার বাসার সামনে গিয়ে সকাল বেলা বসে থাকলাম।
একসময় সাফায়েত সাহেব বের হলেন। সোজা সামনে গিয়ে সালাম দিলাম কষে। উনি উত্তর দিয়ে আমার পাশ কাটিয়ে গেলেন। আমি পিছন দিকের একটা গলি দিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ালাম যাতে উনাকে এই গলির মাঝামাঝি ধরা যায়। একটা সাব গলি আছে সেটা দিয়ে ঢুকে গলির মাঝামাঝি দিয়ে আবার ঢুকে গেলাম। উনি সামনা সামনি আসতেই আবার সালাম দিলাম।
মুশকিল হলো এবার, সালাম দিতে হলে বড় রাস্তায় যেতে হবে, পিছনের গলি দিয়ে তা সম্ভব না। সমস্যা হলো, রড় রাস্তায় যেতে হলে হয় ওনার পিছন পিছন যেতে হবে অথবা একটা বাড়ির দেয়াল ডিঙ্গিয়ে অন্য গলি দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু পেছন পেছন গেলে তো লাভ হবে না। পেছন থেকে সালাম দেয়াটা কেমন যেন ইয়ে, ইয়ে (লাগসই শব্দটা ঠিক মাথায় আসছে না।) মনে হয়। উপায় না দেখে পাশের বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে গেলাম। কোথাও কাউকে না দেখে হাঁটতে লাগলাম পেছনের দেয়ালের দিকে।
বাগানের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই বাজখাঁই গলার আওয়াজ পেলাম, “কে ওখানে?”
একটা ঢোক গিলছিলাম, সেটা মাঝপথে অর্থাৎ গলার মাঝামাঝি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ভাবলাম পিছন ফিরে দৌড় লাগাই। তার আগেই এক বৃদ্ধ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ কানের ভিতর বেজে উঠলো, “সালাম হলো গিয়ে তেল মারার অন্যতম ঔষধ।” সাথে সাথে একটা সালাম দিলাম। কী আশ্চর্য! বৃদ্ধ সাথে সাথে এক গাল হেসে বললেন, “তুমি বুঝি টিপুর কাছে এসেছো? দাঁড়াও ডেকে দিচ্ছি।”
তারপর টিপু টিপু বলে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভিতর দিকে চলে গেলেন। সালাম-এ যে এমন তড়িৎ কাজ হয় জানা ছিলো না। চিটু ভাইয়ের উপর শ্রদ্ধায় মন ভরে গেলো। কিন্তু এদিকে তথাকথিত টিপু এসে যেতে পারে খেয়াল করে দেয়াল ডিঙ্গাবার জন্য তৈরি হলাম। দেয়ালটা বেশ উঁচু, কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাঁধা আসবেই তাকে লঙ্ঘন করেই এগোতে হবে। ওপাশের গলিতে লাফিয়ে পড়েই বড় রাস্তায় উদ্দেশ্যে আবার ছুটলাম। বড় রাস্তার এখান দিয়েই সাফায়েত সাহেবকে যেতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ওনাকে দেখা গেলো। এবার সালাম দিতেই মনে হলো আমাকে অর্ধেক চিনেছেন। বাকি অর্ধেক ওনার অফিস থেকে ফেরার পথে সেরে ফেলবো।
দুপুর দুটায় ওনার ছুটি। ওই সময়টুকু ঘুরে-ফিরে কাটাবো বলেই ঠিক করলাম। দুটো ভিখিরির বাচ্চাকে দেখলাম ফুটপাথ থেকে কী যেন খুটে খুটে খাচ্ছে। হঠাৎ মাথায় খেলে গেলো আমি শুধু কবিতা না, গল্পও লিখবো, এদেরকে নিয়ে। আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম, এরকম গরিব লোক রেখেছে বলে। তা না হলে তো আমার গল্প লেখার প্লটই পেতাম না। এদের নিয়ে এমন গল্প লিখবো যে, মানুষের চোখে কান্নার নদী বয়ে যাবে। তখন প্রকাশকরা ছোটাছুটি লাগিয়ে দেবে আমার লেখা ছাপার জন্য। দুদিনেই আমি বড়লোক হয়ে যাব। আমার নাম ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম, যাতে আরো কিছু লোককে গরিব বানিয়ে দেয়। তা না হলে তো আমার লেখা গল্পের কদরই থাকবে না। সবাই সচ্ছল হয়ে গেলে আমার গল্পের মূল্যই থাকবে না কারো কাছে।
দুটো বাজতেই সাফায়েত সাহেব বেরিয়ে এলেন। আমিও সালাম দিলাম। উনি ভুরু কুঁচকে একটু তাকিয়ে চলে গেলেন। আমি ছুটলাম সেই দেয়ালের উদ্দেশ্যে। দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ওপারে পড়তেই সেই বাজখাই গলার আওয়াজ পেলাম। কিন্তু আওয়াজটা একটু অন্য রকম মনে হলো, হওর.. র..র জাতীয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, সামনে এক বিরাট এলসেশিয়ান। মুহূর্তে বুক শুকিয়ে গেল, সাথে ঠোঁটও। ঠোঁটটা ভেজাবার জন্য জিভটা বের করতে গেলাম, খুঁজে পেলাম না। মনে হয় ঢোঁক গেলার সময় জিভটা গিলে ফেলেছি। কারণ সেটার কোন অস্তিত্বই পেলাম না মুখের ভেতর।
যাই হোক, গেটটা দেখলাম বন্ধ। উপায় নেই, ওটা টপকিয়েই যেতে হবে। এক দৌড়ে গিয়ে পড়লাম গেটের উপর। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। কুকুরটা প্যান্টের পায়ার দিকে কামড়িয়ে ধরলো। এক ঝটকায় গেটের ওপারে পড়লাম ঠিকই কিন্তু প্যান্টের পায়ার হাঁটু থেকে নিচের অংশ রয়ে গেল কুকুরের মুখে। উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দেখি সাফায়েত সাহেব এসে গেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে যথারীতি সালাম দিলাম। এবার আর উনি উত্তর না দিয়ে বললেন, “এই ছোকরা তুমি কি আমার সাথে ফাজলামি করছো নাকি!”
কতগুলো ছেলেকে দেখলাম হাত গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসছে, আর বলছে, “কী ব্যাপার চাচা! আপনাকে কী করেছে?”
আমি ততক্ষণে ভাব বুঝে গেছি। একটা লাফ দিয়েই একশো মিটারের স্পিড দিয়ে দিলাম। ছেলেগুলোর পায়ের আওয়াজ কিছুক্ষণ পেয়েছিলাম, কিন্তু মরনপণ দৌড়ের সাথে পারেনি।
পরদিন বাবার মটর সাইকেলটা নিয়ে এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। রাস্তার ওপার দিয়ে দেখি খবির উদ্দিন সাহেব বাজার করে ফিরছেন। উনি আমার লিস্টের একজন কবি। চিটু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। “অভিনব সালাম দিলে, অনেক সময় এক সালামেই কাজ হয়।”
মোটর সাইকেল রেখে হেলমেট পরেই ওপারে ছুটলাম। খবির উদ্দিন সাহেবকে সালাম ঠুকতেই উনি বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তাতেই বুঝলাম সালামটা বেশ অভিনব হয়েছে। উনি একটা কিন্তু কিন্তু ভাব নিয়ে ঠোঁটে আধখানা হাসি ঝুলিয়ে, হাত বাড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। বুঝলাম না হাত মেলানোর জন্য না আমাকে ধরার জন্য। আমি কিন্তু সম্মানসূচক (বিপদমুক্তও বটে) দুরত্ব বজায় রাখার জন্য দুই পা পিছিয়ে গেলাম। কিন্তু পিছাতে গিয়ে মাথায় ঠোক্কর খেলাম বেশ জোরে। খবির সাহেবের কুলিটা কখন যে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।
অসুবিধা তেমন কিছু হল না, কুলির টুকরির সাথে আমার হেলমেট পরা মাথার সামান্য সংঘর্ষ। কিন্তু হেলমেট আর টুকরির মাঝখানে যেটা পড়লো তার ইহকাল ঝরঝরে হয়ে গেলো। টুকরির ভিতর থেকে মোরগাটা মাথা বের করে দিয়েছিলো কানা বরাবর। কী জন্য কে জানে, হয়তো আমার মতো হবু বিখ্যাত কবিকে দেখার জন্যই। আমি হাত বাড়িয়ে মোরগটা নিয়ে চাকু চাকু করছি যখন, খবির উদ্দিন সাহেব তখন বিষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোরগটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলেন। তারপর রাস্তার পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হন হন করে এগিয়ে গেলেন। বুঝলাম সালামটা খুব বেশি অভিনব হয়ে গেছে।
ঠিক সুবিধা করতে পারছি না। তেল মারাটা ঠিকমত হচ্ছে না। ওই কী বলে যেন, ‘জলে তেলে মিশ খাচ্ছে না।’ না কী বোধহয় প্রবাদটা খাটলো না। যাই হোক, ওই রকম কিছু একটা হবে।
চিন্তা করে দেখলাম পুরুষ সাহিত্যিকদের কাছে আর যাবো না। আমাদের এলাকায় এক মহিলা কবি থাকেন। মহিলাদের মন একটু নরম সরম হয়। অতএব ওনার কাছে যাওয়াই ঠিক করলাম। চিটু ভাই বলেছিলো, “যার কাছ থেকে কাজ আদায় করতে হবে তার প্রিয় জিনিসের প্রশংসা করাও এক প্রকার তেল মারা।”
মহিলার একটা বাচ্চা আছে, বয়স বছরখানেকের হবে। আর কে না জানে, বাচ্চা তার মায়ের কাছে প্রিয় হবেই। বাচ্চার জন্য কিছু একটা কেনা দরকার। কী নিয়ে যাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। একবার ভাবলাম মেডেল নিয়ে যাই। তারপরই মনে হলো, আরে এটাতো প্রেজেন্ট, প্রাইজ না। আমার এই এক অসুবিধা প্রেজেন্ট আর প্রাইজে গ্যাঞ্জাম হয়ে যায়। প্রেজেন্ট যখন তখন ভাবলাম, এক সেট কাটলারিই নিয়ে যাই। নয়তো একটা টি সেট। তখনই মনে হলো, মা যখন কবি তখন একটা ছড়ার বই নিয়ে যাই। আরেকটা গোপন কথা হলো, অন্যগুলোর দাম এতো বেশি যে, হীন স্বাসে'্যর পকেটের জন্য সমস্যা হয়ে যায়। তাছাড়া ভদ্র মহিলা বুঝবেন, আমি যথার্থই সাহিত্যমনা।
বিকেল বেলা একটা ছড়ার বই হাতে নিয়ে হাজির হলাম। মহিলার সাথে আলাপ হওয়ার পরই বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। বাচ্চাটা সোফায় কাত হয়ে বসে খেলা করছিলো। এগিয়ে যেতে যেতে বললাম, “বাহ! বেশ সুন্দর বাচ্চা। কী নাম ওর?”
মহিলা বেশ গদ গদ হয়ে বললেন, “টোকন।”
বাচ্চাটার কাছে গিয়ে বন্ধুর কাছ থেকে শিখে আসা পদ্ধতিতে আদর করতে লাগলাম। “টোকন সোনা, টুকু টুকু”, ইত্যাদি বলে থুতনি নেড়ে দিচ্ছিলাম। কেমন করে যে হাতটা বাচ্চাটার নাকে লেগে গেলো বুঝতে পারলাম না। ব্যস শুরু হয়ে গেলো “এ্যাঁ...”
আমি রীতিমত ভড়কে গেলাম। তাড়াতাড়ি ছড়ার বইটা দিতে গেলাম। মহিলা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে নিজের মনে ফটফট করছেন, “একটা বাচ্চাকে আদর করতে পারে না, কী ধরনের লোক!”
আমি মহিলার দিকে বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “টোকনের জন্য এনেছিলাম।”
মহিলা আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে দরজার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। বললেন, “এতটুকু বাচ্চা পড়তে পারে নাকি! এই বুদ্ধি নিয়ে হবে কবি?”
আমি বুঝলাম এবার হয়তো আমাকেই ছুঁড়ে ফেলবেন, তাই বইয়ের পিছু পিছু আমিও দরজার বাইরে বের হয়ে এলাম।
এরপর অনেকদিন কাউকে তেল মারার চেষ্টা করিনি। তেমন মওকাও মেলেনি। তবে অচিরেই একটা সুযোগ এলো। শহরে তখন বন্যার পানি ঢুকে সয়লাব। আমাদের সরু নালাটা ফুলে ফেঁপে একাকার। তার ওপর দিয়ে পার হওয়ার জন্যা অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো বসানো হয়েছে। একটা বাঁশ ধরার, আর একটা পার হওয়ার জন্য। আমার আবার ওর ওপর উঠলেই পা টলতে থাকে, বেশ কসরৎ করে পার হই।
একদিন মাঝামাঝি গিয়েছি, দেখি উল্টো দিক থেকে আসছেন নগেন সরকার। আমার লিস্টের একজন সাহিত্যিক। এই প্রৌঢ় কবিই আমার আর্দশ। হঠাৎ মাথায় চিটু ভাইয়ের কথা খেলে গেলো, “কাজ আদায়ের জন্য পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেও দ্বিধা করবি না।” তার উপর ইনিতো বয়স্ক। মোটেও দেরি না করে নিচু হয়ে সালাম করতে গেলাম, ব্যস যা হবার তাই হলো। তাল হারিয়ে ঝপাৎ করে পানিতে। কিন্তু পড়ার আগে শেষ অবলম্বন হিসেবে নগেন বাবুর পা জড়িয়ে ধরেছিলাম। ফলে আমার পর পর উনিও পানিতে। আমি নাছোড়বান্দা, সেই পানির ভেতরেই ওনার পা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু পা খুঁজে পাওয়ার আগেই ওনাকে দু’তিনজন মিলে টেনে তুললো। ওনার পা দুটো যখন আমার নাকের ডগা দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে তখন শেষ চেষ্টা করে পা ধরতে গেলাম। উনি এমন ভাবে পা ঝাড়া দিলেন যে বুঝতে পারলাম না লাথি মারলেন নাকি পায়ের ধুলোর অভাবে পানিই আমার মাথায় ঝাড়লেন।
আমি অবশ্য সেই পানি মাথায় নিয়েই এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে কতদিন চালাতে পারবো বুঝতে পারছি না। কারণ শিঘ্রিই আমার কবিতার ভাণ্ডারের জন্য রীতিমত একটা গোডাউন লাগবে।
“তেল না মারলে কিছু হয় না বুঝলি খেলু। আমাকে দেখ, মাত্র তিন মাসে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর করে কোথায় উঠেছি।”, কথাটা বলে নিজের দিকে আর নিজের ড্রয়িং রুমের দিকে আড়চোখে দেখে নিল।
আমিও ভেবে দেখলাম চিটু ভাই কথাটা মিথ্যে বলেনি। ওনার আসল নাম চিটু না, তবে চিটু ভাইয়ের নাম, চরিত্র এক সুতোয় বাঁধা। একটু খুলে বললেই বোঝা যাবে।
ছোট থাকতে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্যে বা সিনেমা দেখার জন্য যাকে পেত তার সাথেই চিটিং করতো চিটু ভাই। ওর আসল উদ্দেশ্য হলো সিনেমা দেখা আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া। তাতে যাকেই হোক, যে রকমই হোক ধাপ্পা দিতে কসুর করতো না। সেই থেকে তার আসল নাম ওয়াহিদ বেগ হারিয়ে গিয়ে চিটার থেকে ছোট হয়ে চিটু হয়ে গেলেন।
এ বিষয়ে তিনি এতটাই নির্বিকার যে চিটু বলে ডাকলেও কোন কিছু মনে করেন না। তো সেই চিটু ভাই কারো কাছেই পাত্তা পেতো না ইদানিং। কিন্তু কী হলো তাতে? স্রেফ তিন মাসের মধ্যে পাড়ার চকচকে ঝকঝকে লোক হয়ে গেল। কী যে ব্যবসা করে আমি ঠিক বুঝি না। তবে পুরনো চিটিং বিদ্যাটা যে ব্যবসার বিরাট একটা পুঁজি সেটা বেশ বুঝতে পারি।
চিটু ভাই আরো বলে, “তেল মারার উপর বই আছে কত। আমেরিকায় তো ‘তৈল মর্দন’ ইউনিভার্সিটির একটা নতুন সাবজেক্টই হয়ে গেছে।”
আমি নিশ্চিত যে চিটু ভাই ওই সাবজেক্টে পড়লে তার প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া কেউ ঠেকাতে পারতো না। যাক, সেই চিটু ভাইয়ের কথা শুনে আমার টনক নড়লো। আমার কবি হওয়ার অন্তরায় কোথায় তা ধরে ফেলেছি। এত কবিতা এ পর্যন্ত লিখেছি যে কম্পিউটারের ছোট-খাটো হাডডিস্কে তা ধরবে না। কবিতার খাতা যা জমেছে তা বয়ে নিয়ে যেতে গাট্টাগোট্টা কুলি লাগবে। খালি বল পয়েন্ট পেন জমা হয়েছে এক গ্রুস। কিন' বিপুল কবিতা সম্ভার থেকে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গন বঞ্চিত রয়ে গেলো। তার একমাত্র কারণ তেল মারার অভাব বা বলা যায় তেল মারতে না জানা। চিটু ভাই আমার চোখে দুরবীন লাগিয়ে ব্যাপারটা দেখিয়ে দিলেন। তার ফর্মুলা অনুযায়ী প্রথমে কাজ আদায়ের জন্য তেল মারতে হবে। তারপর কাজ গড়গড়িয়ে গাড়ির মতো চলতে থাকবে। কিন' মুশকিল হলো তেল যে কীভাবে মারা যায় তাইতো বুঝতে পারছি না।
শেষে চিটু ভাইকে ব্যাপারটা খুলেই বললাম। আমার কবিতার কথা, আমার ইচ্ছার কথা। জিজ্ঞেস করলাম, “কোন তেল দেবো বলেন তো, সয়াবিন না সরিষা? আর মারবই বা কী করে? ছুঁড়ে না পিচকিরি দিয়ে?”
চিটু ভাই আমার দিকে কটমট করে তাকালো, বললো, “তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”
“কেন!”, আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করি।
দশ সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে চিটু ভাই বলে, “তুই তো একটা গরু।”
মনে মনে ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। যতদূর মনে পড়ছে আমি তো মানুষই ছিলাম। তবে কি এর মধ্যে কোন গন্ডগোল হল। তাড়াতাড়ি মাথায় হাত দিলোম।। না শিং-এর চিহ্ন মাত্র নেই। কেন যে আমায় এমন ঘাবড়িয়ে দেয় বুঝি না। জিজ্ঞেস করলাম, “এর মানে ঠিক বুঝতে পারছি না।”
চিটু ভাই তেড়ে মেরে উঠে বললেন, “আরে গাধা, এ তেল মানে তো সে তেল না।”
“তাহলে তেল মানে কি পানি?”
উনি আরো রেগে গিয়ে বললেন, “তেল মানে পানি হবে কেন! তেল মানে তো তেলই।”
“আপনিই তো বললেন, তেল মানে তেল না।”
চিটু ভাই তখন আমাকে বোঝাবার ভাষা খুঁজে না পেয়ে আঁক আঁক করে চিল্লাতে আর লাফাতে শুরু করেছেন। যা হোক, চিটু ভাইয়ের লাফালাফি বন্ধ হলে কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, আমিও বিলকুল বুঝে গেলাম কীভাবে তেল মারতে হয়।
প্রথমেই কয়েকজন কবির নাম ঠিকানা জোগাড় করে ফেললাম। এদেরকে তেল মেরেই আমাকে উপরে উঠতে হবে। প্রথমে যাকে টার্গেট করলাম তিনি সরকারী অফিসে চাকরি করেন। উনি যেখানে থাকেন সেখান থেকে ওনার অফিস খুব বেশি দূরে না। হেঁটেই যাতায়াত করেন। চিটু ভাইয়ের কথা অনুযায়ী ‘সালাম’ হচ্ছে তেল মারার মহা ঔষধ। সারাদিনে যতবার দেখা হবে ততবারই সালাম দিতে হবে। তাতে করে নাকি আমাকে সে ভদ্রলোক সহজেই চিনে ফেলবে। আর তাহলেই কিল্লা ফতে। কিন্তু সাফায়েউল্লা সাহেব, অর্থাৎ আপাতত যে কবিকে আমি টার্গেট করছি, উনি অফিস যান সাতটায়, বের হন দুটায়। তারপর আর ঘর থেকে বেরই হন না বলতে গেলে। এদিকে এক দিনে অন্তত গোটা আটেক সালাম না দিলে তো কাজ হবে না। মনে মনে এক বুদ্ধি ঠিক করে ওনার বাসার সামনে গিয়ে সকাল বেলা বসে থাকলাম।
একসময় সাফায়েত সাহেব বের হলেন। সোজা সামনে গিয়ে সালাম দিলাম কষে। উনি উত্তর দিয়ে আমার পাশ কাটিয়ে গেলেন। আমি পিছন দিকের একটা গলি দিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ালাম যাতে উনাকে এই গলির মাঝামাঝি ধরা যায়। একটা সাব গলি আছে সেটা দিয়ে ঢুকে গলির মাঝামাঝি দিয়ে আবার ঢুকে গেলাম। উনি সামনা সামনি আসতেই আবার সালাম দিলাম।
মুশকিল হলো এবার, সালাম দিতে হলে বড় রাস্তায় যেতে হবে, পিছনের গলি দিয়ে তা সম্ভব না। সমস্যা হলো, রড় রাস্তায় যেতে হলে হয় ওনার পিছন পিছন যেতে হবে অথবা একটা বাড়ির দেয়াল ডিঙ্গিয়ে অন্য গলি দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু পেছন পেছন গেলে তো লাভ হবে না। পেছন থেকে সালাম দেয়াটা কেমন যেন ইয়ে, ইয়ে (লাগসই শব্দটা ঠিক মাথায় আসছে না।) মনে হয়। উপায় না দেখে পাশের বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে গেলাম। কোথাও কাউকে না দেখে হাঁটতে লাগলাম পেছনের দেয়ালের দিকে।
বাগানের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই বাজখাঁই গলার আওয়াজ পেলাম, “কে ওখানে?”
একটা ঢোক গিলছিলাম, সেটা মাঝপথে অর্থাৎ গলার মাঝামাঝি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ভাবলাম পিছন ফিরে দৌড় লাগাই। তার আগেই এক বৃদ্ধ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ কানের ভিতর বেজে উঠলো, “সালাম হলো গিয়ে তেল মারার অন্যতম ঔষধ।” সাথে সাথে একটা সালাম দিলাম। কী আশ্চর্য! বৃদ্ধ সাথে সাথে এক গাল হেসে বললেন, “তুমি বুঝি টিপুর কাছে এসেছো? দাঁড়াও ডেকে দিচ্ছি।”
তারপর টিপু টিপু বলে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভিতর দিকে চলে গেলেন। সালাম-এ যে এমন তড়িৎ কাজ হয় জানা ছিলো না। চিটু ভাইয়ের উপর শ্রদ্ধায় মন ভরে গেলো। কিন্তু এদিকে তথাকথিত টিপু এসে যেতে পারে খেয়াল করে দেয়াল ডিঙ্গাবার জন্য তৈরি হলাম। দেয়ালটা বেশ উঁচু, কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাঁধা আসবেই তাকে লঙ্ঘন করেই এগোতে হবে। ওপাশের গলিতে লাফিয়ে পড়েই বড় রাস্তায় উদ্দেশ্যে আবার ছুটলাম। বড় রাস্তার এখান দিয়েই সাফায়েত সাহেবকে যেতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ওনাকে দেখা গেলো। এবার সালাম দিতেই মনে হলো আমাকে অর্ধেক চিনেছেন। বাকি অর্ধেক ওনার অফিস থেকে ফেরার পথে সেরে ফেলবো।
দুপুর দুটায় ওনার ছুটি। ওই সময়টুকু ঘুরে-ফিরে কাটাবো বলেই ঠিক করলাম। দুটো ভিখিরির বাচ্চাকে দেখলাম ফুটপাথ থেকে কী যেন খুটে খুটে খাচ্ছে। হঠাৎ মাথায় খেলে গেলো আমি শুধু কবিতা না, গল্পও লিখবো, এদেরকে নিয়ে। আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম, এরকম গরিব লোক রেখেছে বলে। তা না হলে তো আমার গল্প লেখার প্লটই পেতাম না। এদের নিয়ে এমন গল্প লিখবো যে, মানুষের চোখে কান্নার নদী বয়ে যাবে। তখন প্রকাশকরা ছোটাছুটি লাগিয়ে দেবে আমার লেখা ছাপার জন্য। দুদিনেই আমি বড়লোক হয়ে যাব। আমার নাম ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম, যাতে আরো কিছু লোককে গরিব বানিয়ে দেয়। তা না হলে তো আমার লেখা গল্পের কদরই থাকবে না। সবাই সচ্ছল হয়ে গেলে আমার গল্পের মূল্যই থাকবে না কারো কাছে।
দুটো বাজতেই সাফায়েত সাহেব বেরিয়ে এলেন। আমিও সালাম দিলাম। উনি ভুরু কুঁচকে একটু তাকিয়ে চলে গেলেন। আমি ছুটলাম সেই দেয়ালের উদ্দেশ্যে। দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ওপারে পড়তেই সেই বাজখাই গলার আওয়াজ পেলাম। কিন্তু আওয়াজটা একটু অন্য রকম মনে হলো, হওর.. র..র জাতীয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, সামনে এক বিরাট এলসেশিয়ান। মুহূর্তে বুক শুকিয়ে গেল, সাথে ঠোঁটও। ঠোঁটটা ভেজাবার জন্য জিভটা বের করতে গেলাম, খুঁজে পেলাম না। মনে হয় ঢোঁক গেলার সময় জিভটা গিলে ফেলেছি। কারণ সেটার কোন অস্তিত্বই পেলাম না মুখের ভেতর।
যাই হোক, গেটটা দেখলাম বন্ধ। উপায় নেই, ওটা টপকিয়েই যেতে হবে। এক দৌড়ে গিয়ে পড়লাম গেটের উপর। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। কুকুরটা প্যান্টের পায়ার দিকে কামড়িয়ে ধরলো। এক ঝটকায় গেটের ওপারে পড়লাম ঠিকই কিন্তু প্যান্টের পায়ার হাঁটু থেকে নিচের অংশ রয়ে গেল কুকুরের মুখে। উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দেখি সাফায়েত সাহেব এসে গেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে যথারীতি সালাম দিলাম। এবার আর উনি উত্তর না দিয়ে বললেন, “এই ছোকরা তুমি কি আমার সাথে ফাজলামি করছো নাকি!”
কতগুলো ছেলেকে দেখলাম হাত গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসছে, আর বলছে, “কী ব্যাপার চাচা! আপনাকে কী করেছে?”
আমি ততক্ষণে ভাব বুঝে গেছি। একটা লাফ দিয়েই একশো মিটারের স্পিড দিয়ে দিলাম। ছেলেগুলোর পায়ের আওয়াজ কিছুক্ষণ পেয়েছিলাম, কিন্তু মরনপণ দৌড়ের সাথে পারেনি।
পরদিন বাবার মটর সাইকেলটা নিয়ে এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। রাস্তার ওপার দিয়ে দেখি খবির উদ্দিন সাহেব বাজার করে ফিরছেন। উনি আমার লিস্টের একজন কবি। চিটু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। “অভিনব সালাম দিলে, অনেক সময় এক সালামেই কাজ হয়।”
মোটর সাইকেল রেখে হেলমেট পরেই ওপারে ছুটলাম। খবির উদ্দিন সাহেবকে সালাম ঠুকতেই উনি বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তাতেই বুঝলাম সালামটা বেশ অভিনব হয়েছে। উনি একটা কিন্তু কিন্তু ভাব নিয়ে ঠোঁটে আধখানা হাসি ঝুলিয়ে, হাত বাড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। বুঝলাম না হাত মেলানোর জন্য না আমাকে ধরার জন্য। আমি কিন্তু সম্মানসূচক (বিপদমুক্তও বটে) দুরত্ব বজায় রাখার জন্য দুই পা পিছিয়ে গেলাম। কিন্তু পিছাতে গিয়ে মাথায় ঠোক্কর খেলাম বেশ জোরে। খবির সাহেবের কুলিটা কখন যে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।
অসুবিধা তেমন কিছু হল না, কুলির টুকরির সাথে আমার হেলমেট পরা মাথার সামান্য সংঘর্ষ। কিন্তু হেলমেট আর টুকরির মাঝখানে যেটা পড়লো তার ইহকাল ঝরঝরে হয়ে গেলো। টুকরির ভিতর থেকে মোরগাটা মাথা বের করে দিয়েছিলো কানা বরাবর। কী জন্য কে জানে, হয়তো আমার মতো হবু বিখ্যাত কবিকে দেখার জন্যই। আমি হাত বাড়িয়ে মোরগটা নিয়ে চাকু চাকু করছি যখন, খবির উদ্দিন সাহেব তখন বিষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোরগটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলেন। তারপর রাস্তার পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হন হন করে এগিয়ে গেলেন। বুঝলাম সালামটা খুব বেশি অভিনব হয়ে গেছে।
ঠিক সুবিধা করতে পারছি না। তেল মারাটা ঠিকমত হচ্ছে না। ওই কী বলে যেন, ‘জলে তেলে মিশ খাচ্ছে না।’ না কী বোধহয় প্রবাদটা খাটলো না। যাই হোক, ওই রকম কিছু একটা হবে।
চিন্তা করে দেখলাম পুরুষ সাহিত্যিকদের কাছে আর যাবো না। আমাদের এলাকায় এক মহিলা কবি থাকেন। মহিলাদের মন একটু নরম সরম হয়। অতএব ওনার কাছে যাওয়াই ঠিক করলাম। চিটু ভাই বলেছিলো, “যার কাছ থেকে কাজ আদায় করতে হবে তার প্রিয় জিনিসের প্রশংসা করাও এক প্রকার তেল মারা।”
মহিলার একটা বাচ্চা আছে, বয়স বছরখানেকের হবে। আর কে না জানে, বাচ্চা তার মায়ের কাছে প্রিয় হবেই। বাচ্চার জন্য কিছু একটা কেনা দরকার। কী নিয়ে যাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। একবার ভাবলাম মেডেল নিয়ে যাই। তারপরই মনে হলো, আরে এটাতো প্রেজেন্ট, প্রাইজ না। আমার এই এক অসুবিধা প্রেজেন্ট আর প্রাইজে গ্যাঞ্জাম হয়ে যায়। প্রেজেন্ট যখন তখন ভাবলাম, এক সেট কাটলারিই নিয়ে যাই। নয়তো একটা টি সেট। তখনই মনে হলো, মা যখন কবি তখন একটা ছড়ার বই নিয়ে যাই। আরেকটা গোপন কথা হলো, অন্যগুলোর দাম এতো বেশি যে, হীন স্বাসে'্যর পকেটের জন্য সমস্যা হয়ে যায়। তাছাড়া ভদ্র মহিলা বুঝবেন, আমি যথার্থই সাহিত্যমনা।
বিকেল বেলা একটা ছড়ার বই হাতে নিয়ে হাজির হলাম। মহিলার সাথে আলাপ হওয়ার পরই বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। বাচ্চাটা সোফায় কাত হয়ে বসে খেলা করছিলো। এগিয়ে যেতে যেতে বললাম, “বাহ! বেশ সুন্দর বাচ্চা। কী নাম ওর?”
মহিলা বেশ গদ গদ হয়ে বললেন, “টোকন।”
বাচ্চাটার কাছে গিয়ে বন্ধুর কাছ থেকে শিখে আসা পদ্ধতিতে আদর করতে লাগলাম। “টোকন সোনা, টুকু টুকু”, ইত্যাদি বলে থুতনি নেড়ে দিচ্ছিলাম। কেমন করে যে হাতটা বাচ্চাটার নাকে লেগে গেলো বুঝতে পারলাম না। ব্যস শুরু হয়ে গেলো “এ্যাঁ...”
আমি রীতিমত ভড়কে গেলাম। তাড়াতাড়ি ছড়ার বইটা দিতে গেলাম। মহিলা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে নিজের মনে ফটফট করছেন, “একটা বাচ্চাকে আদর করতে পারে না, কী ধরনের লোক!”
আমি মহিলার দিকে বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “টোকনের জন্য এনেছিলাম।”
মহিলা আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে দরজার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। বললেন, “এতটুকু বাচ্চা পড়তে পারে নাকি! এই বুদ্ধি নিয়ে হবে কবি?”
আমি বুঝলাম এবার হয়তো আমাকেই ছুঁড়ে ফেলবেন, তাই বইয়ের পিছু পিছু আমিও দরজার বাইরে বের হয়ে এলাম।
এরপর অনেকদিন কাউকে তেল মারার চেষ্টা করিনি। তেমন মওকাও মেলেনি। তবে অচিরেই একটা সুযোগ এলো। শহরে তখন বন্যার পানি ঢুকে সয়লাব। আমাদের সরু নালাটা ফুলে ফেঁপে একাকার। তার ওপর দিয়ে পার হওয়ার জন্যা অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো বসানো হয়েছে। একটা বাঁশ ধরার, আর একটা পার হওয়ার জন্য। আমার আবার ওর ওপর উঠলেই পা টলতে থাকে, বেশ কসরৎ করে পার হই।
একদিন মাঝামাঝি গিয়েছি, দেখি উল্টো দিক থেকে আসছেন নগেন সরকার। আমার লিস্টের একজন সাহিত্যিক। এই প্রৌঢ় কবিই আমার আর্দশ। হঠাৎ মাথায় চিটু ভাইয়ের কথা খেলে গেলো, “কাজ আদায়ের জন্য পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেও দ্বিধা করবি না।” তার উপর ইনিতো বয়স্ক। মোটেও দেরি না করে নিচু হয়ে সালাম করতে গেলাম, ব্যস যা হবার তাই হলো। তাল হারিয়ে ঝপাৎ করে পানিতে। কিন্তু পড়ার আগে শেষ অবলম্বন হিসেবে নগেন বাবুর পা জড়িয়ে ধরেছিলাম। ফলে আমার পর পর উনিও পানিতে। আমি নাছোড়বান্দা, সেই পানির ভেতরেই ওনার পা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু পা খুঁজে পাওয়ার আগেই ওনাকে দু’তিনজন মিলে টেনে তুললো। ওনার পা দুটো যখন আমার নাকের ডগা দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে তখন শেষ চেষ্টা করে পা ধরতে গেলাম। উনি এমন ভাবে পা ঝাড়া দিলেন যে বুঝতে পারলাম না লাথি মারলেন নাকি পায়ের ধুলোর অভাবে পানিই আমার মাথায় ঝাড়লেন।
আমি অবশ্য সেই পানি মাথায় নিয়েই এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে কতদিন চালাতে পারবো বুঝতে পারছি না। কারণ শিঘ্রিই আমার কবিতার ভাণ্ডারের জন্য রীতিমত একটা গোডাউন লাগবে।







