Category: গল্প
News Headings
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Jan 11, 2009
Source: bdnews24.com
Source: bdnews24.com
খরগোশের টাকা চাষ
ভাষান্তর- মৃত্যুঞ্জয় রায়
বর্ষাকাল শুরু হল। এ সময় একদিন বনের রাজা সিংহ বনের সব পশুদের নিয়ে সভা করতে বসল। বনের রাজা বনের সব ফাঁকা জমিতে চাষাবাদ করার এক কর্মসূচি নিয়েছে। তাই সে বনের সব পশুদের কাছে একে একে জিজ্ঞেস করল কে কী চাষ করতে চায়। কেউ বলল, আমি ভূট্টা চাষ করব। কেউ বলল, আমি কাউন চাষ করব। কেউবা চাইল শিমুল আলু চাষ করতে।
একজন বলল, “আমি ধান চাষ করব।”
সব শেষে বনের রাজা খরগোশকে জিজ্ঞেস করল, “কী হে খরগোশ। তুমি কী চাষ করবে? কিসের বীজ বুনবে?”
খরগোশ জবাব দিল, “রাজা সাহেব, আপনি যদি আমাকে এক থলি টাকা দেন তাহলে আমি টাকার বীজ বুনব, টাকার চাষ করতে চাই আমি। সেসব গাছে অনেক টাকা ফলবে।”
“তাজ্জব কথা! কাউন ভূট্টা চাষ করা যায়। কিন্তু কে কবে শুনেছে যে টাকার চাষ করা যায়?” বনের রাজা খরগোশকে জিজ্ঞেস করল।
খরগোশের নাম ছিল কালুলু। কালুলু উত্তর দিল, “কেউ না শুনুক। কেউ না করুক। আমি টাকার চাষ করব। টাকা চাষ করে আমি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে চাই। আপনি শুধু দেখবেন যে কী করে আমি সেটা করি। এখন আমাকে এক থলি টাকা দিন তো।”
বনের রাজা এবার সত্যিই খুব কৌতুহল বোধ করল, বলল, “সত্যি দেখা দরকার, টাকার চাষ করে কেমন করে?” সুতরাং বনের রাজা খরগোশকে বড় এক থলি টাকা দিল। টাকাগুলো পেয়ে কালুলু তো মহা খুশি। এত্ত টাকা! ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে সভা শেষে সে টাকাগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেল। দামী দামী কাপড় চোপড়, মাছ, মাংস, রুটি, মদ ইত্যাদি কিনে সে টাকাগুলো সব খরচ করে ফেলল।
বর্ষা পেরিয়ে শরৎ এল। শরৎ পেরিয়ে এলো ফসল কাটার হেমন্ত কাল। এমন সময় বনের রাজা একদিন খরগোশকে ডেকে পাঠাল। বলল, “কালুলু, টাকা চাষ করে তুমি যত টাকা পেয়েছ সব নিয়ে এসো।”
কালুলু বলল, “জনাব রাজা। টাকার গাছ তো আর যে সে গাছ নয়। বাড়ে খুব ধীরে ধীরে। এত দিনে সবে টাকার চারা গজিয়েছে। দু’একটা চারা পাতা মেলতে শুরু করেছে। টাকা ধরতে আরও অনেক সময় লাগবে।”
এভাবে আলসেমী করে সে একটা বছর কাটিয়ে দিল। পরের বছর আবার যখন ফসল কাটার সময় এল, বনের রাজা খরগোশকে ডেকে বলল, “কালুলু, এবার নিয়ে এসো তোমার সব টাকা।”
“হুজুর। টাকার গাছ খুব আস্তে আস্ত বড় হয়। সেসব গাছে মাত্র শীষ এসেছে।” কালুলু উত্তর দিল।
তবে খরগোশ মনে মনে খুবই চিন্তায় পড়ে গেল, এর পর কী বলবে? মিথ্যে তো বলেই ফেলেছে। এখন কী হবে? একবার মিথ্যে বললে যে তা ঢাকতে বারবার মিথ্যে বলতে হয়! কিন্তু এভাবে আর কদ্দিন? একদিন সিংহটা ঠিকই সত্য কথাটা জেনে যাবে। তখন নির্ঘাত ওর প্রাণটা যাবে।
এভাবে নানা অজুহাত দেখিয়ে চার চারটা বছর কেটে গেল। ওদিকে খরগোশের টাকা ফেরত দেয়ার কোন নাম গন্ধ নেই। বনের রাজার একটু সন্দেহ হল, “খরগোশ তার সাথে চালাকি করছে না তো?”
সুতরাং সে একটা বুনো শূকরকে এবার খরগোশের সাথে দিয়ে বলল, “কালুলু, ওকে সাথে নিয়ে যাও। ও দেখে এসে আমাকে বলবে যে তোমার টাকার ফসল কেমন হয়েছে। যদি পেকে থাকে তবে শিঘ্রি দু’জনে মিলে কেটে নিয়ে আসবে।”
মহা ফাপরে পড়ে গেল খরগোশ। এবার নিশ্চয়ই বুনো শুয়োরটা দেখে এসে সব ফাঁস করে দেবে। কিছু একটা করা দরকার। সে বলল, “শুয়োর, তুমি নিশ্চয়ই যাবে আমারkhorgosh-2 সাথে। টাকার বাগান, সে তো অনেক দূরের পথ। এ বন পেরিয়ে অন্য বনে। ভাব দেখি, যদি এ বনে বা কোন গাঁয়ের কাছে টাকার চাষ করতাম, সব টাকা চুরি হয়ে যেত না। তাই এক মহা দুর্গম গহীন বনের মধ্যে টাকার চাষ করেছি।”
শুয়োর মাথা নাড়ল, বলল, “সত্যি তো। তবু আমি তোমার সাথে যাব। রাজার হুকুম না মেনে কি উপায় আছে?”
খরগোশ বুঝতে পারল সে এক কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এবার আর তার রক্ষে নেই। সব ফাঁস হয়ে যাবে। কী আর করা! শুয়োরকে সাথে নিয়ে সে রওনা হল। কিন্তু কোন দিকে যাবে? টাকার কোন ক্ষেত থাকলে তো সেখানে যাবে? তবু একদিকে তারা দু'জন হাঁটতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কালুলু বুনো শুয়োরকে বলে উঠল, “শুয়োর, একটু দাঁড়াও। বাড়ি থেকে আমি আমার বালিশটা নিয়ে আসি। অনেক দূরের পথ তো। আজ আর দিনে দিনে ফেরা যাবে না। পথেই ঘুমুতে হবে। আমি আবার বালিশ ছাড়া একদম ঘুমুতে পারি না।”
এই বলে কালুলু বুনো শুয়োরকে সেখানে অপেক্ষা করতে বলল এবং নিজে হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা দূরে গেল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটা ঝোপের আড়ালে ঢুকে পড়ল। ঝোপ থেকে একটা নলের মত কাঠি নিয়ে জোরে ফুঁ দিতে লাগল। চিৎকার করে সে তার কন্ঠস্বর বদলে ফেলে অবিকল মানুষের মত বলতে লাগল, “বাবা, বাবা, দেখ কেমন নাদুস নুদুস একটা বুনো শুয়োর। তাড়াতাড়ি এসো। এটাকে মেরে আমরা নিয়ে যাই।”
এ কথা শুনে তো বুনো শুয়োরের আত্মারাম খাঁচা, ভীষণ ভয় পেয়ে গেল সে। ভাবল, নিশ্চয়ই কোন শিকারী তার ছেলেকে নিয়ে বনে শিকার করতে এসেছে। অতএব, khorgosh-3বাঁচতে চাইলে এক্ষুণি পালানো দরকার। এই ভেবে বুনো শুয়োর জোরছে ছুটতে শুরু করল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে রাজার কাছে এসে হাজির হল।
ওদিকে খরগোশও চলে গেল বনের রাজার কাছে। গিয়ে বলল, “রাজা সাহেব, রাজা সাহেব, আমি বুনো শুয়োরকে সাথে নিয়ে টাকার বাগান দেখতে রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু শুয়োরটা ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। আমার কী দোষ বলুন? বিশ্বাস না হলে ওকেই জিজ্ঞেস করুন।”
এ কথা শুনে রাজা ভয়ানক রেগে গেল। বলল, “বুনো শুয়োর। আমি তোমাকে পাঠালাম টাকার গাছ দেখতে আর তুমি ভয়ে পালিয়ে এসেছ?”
“কী করব হুজুর? না হলে যে আমার জানটাই যায়।”, শুয়োর বলল।
“নাহ্, এর শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।”
এরপর সে বনের সবচে শক্তিশালী এক সিংহকে হুকুম করল, “সিংহ, তোমার নিশ্চই ভয় করবে না। কেননা, তোমাকেই তো সবাই ভয় পায়। অতএব, এবার তুমি যাবে কালুলুর সাথে। গিয়ে দেখে এসে অবশ্যই টাকার বাগানের কি অবস্থা তা আমাকে বলবে।”
এখন খরগোশ পড়ে গেল মহা দুশ্চিন্তায়। আহা, একটা মিথ্যে কথা বলে কী বিপদেই না পড়া গেল! এখন সেটাকে ঢাকতে আরো কত না জানি মিথ্যে কথা বলতে হবে! সিংহকে সাথে নিয়ে খরগোশ অগত্যা বেরিয়ে পড়ল টাকার বাগান দেখাতে। কিছুদূর যেতেই সে আগের মত ভান ধরল, বলল, “সিংহ, সিংহ, বাড়িতে আমি আমার কুড়াল ভুলে রেখে এসেছি। ওটা না হলে তো টাকার শক্ত গাছগুলো কাটতেই পারব না। তুমি একটু দাঁড়াও। আমি এক দৌড়ে গিয়ে কুড়ালটা নিয়ে আসি।”
কী আর করা? সিংহ সেখানে বসে পড়ল। খরগোশও সেখান থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে এসে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল এবং আগের মতই চিৎকার করে বলতে লাগল, “বাবা, বাবা, ওখানে একটা সিংহ দেখা যাচ্ছে। শিঘ্রি গুলি কর ওটাকে।”
এ কথা শুনে সিংহ খুব ভয় পেয়ে গেল। ভাবল, নিশ্চয়ই কোন শিকারী তার দিকে বন্দুক তাক করে ফেলেছে। এক্ষুনি হয়ত গুলি করবে। অতএব বাঁচতে চাইলে পালাই। khorgosh-4সিংহ দিল এ দৌড় আর সে দৌড়।
কালুলু সোজা রাজার কাছে গিয়ে নালিশ জানাল, “হুজুর, আমি সিংহকে নিয়ে যাচ্ছিলাম আমার সেই অনিন্দ্য সুন্দর টাকার বাগান দেখাতে। কিন্তু হঠাৎ সিংহের যে কী হল! বনের মধ্যে কাকে দেখে সে এমন ভয় পেল যে আমাকে ফেলে রেখেই সে পালিয়ে এল।”
এ কথা শুনে রাজা খুব রেগে গেল, “সিংহকে এজন্য অবশ্যই সাজা ভোগ করতে হবে।”
এরপর রাজা এক মহিষকে আদেশ করল কালুলুর সাথে যেতে। রাজা বলল, “মহিষ, তুমি সিংহের চেয়ে বড়। তুমি নিশ্চয়ই ওর মত ভয় পেয়ে পালিয়ে আসবে না? যাও গিয়ে দেখে এসো আমার টাকার বাগানে কত টাকা ধরেছে? আর সেগুলো কাটার মত হয়েছে কী না?”
এ কথা শুনে কালুলু খুব ঘাবড়ে গেল। কিন্তু কী আর করা! মহিষকে নিয়ে সে রওনা হল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালুলু মহিষকে বলল, “ওহ্ মহিষ। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আমি তো ছুরিটা আনতেই ভুলে গেছি। এক্ষুণি বাড়ি যাওয়া দরকার।” এ কথা বলে সে তক্ষুণি সেখান থেকে দৌড় দিল এবং একইভাবে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। ঝোপের আড়াল থেকে মানুষের কন্ঠস্বর নকল করে বলে উঠল, “বাবা, বাবা, দেখ কি তাগড়াই একটা মহিষ। শিঘ্রি তোমার তীর ধনুকটা নিয়ে এসো। ওটাকে মেরে ফেলি।”
এ কথা শুনে মহিষ প্রাণভয়ে দিল দৌড়। আর খরগোশ রাজাকে গিয়ে জানাল, মহিষও ওদের মত গহীন বনে গিয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছে। সুতরাং ওকে নিয়ে আর টাকার বাগান দেখতে যাওয়া হয়নি।
বনের রাজা এবার সত্যি খুব রেগে গেল এবং মহিষকে কঠিন শাস্তি দিল। এবার এক কচ্ছপকে ধমক দিয়ে রাজা বলল, “কচ্ছপ, এবার তুমি খরগোশের সাথে যাবে। গিয়ে সেই টাকার বাগান দেখে এসে আমাকে সব ঘটনা খুলে বলবে। আমার তো রীতিমত সন্দেহ হচ্ছে খরগোশকে। সত্যি যদি সে প্রতারণা করে তাহলে আমি ওকে গাঁয়ের ওই সবচে উঁচু তালগাছটায় দশদিন ঝুলিয়ে রাখব আর একটা বানরকে পাঠাব ওকে পেটানোর জন্য।”
এ কথা শুনে কালুলু এবার ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। এবার আর রক্ষে নেই। বোকামি আর মিথ্যে বলার শাস্তি তাকে এবার পেতেই হবে। কচ্ছপটা ছিল বেশ বুদ্ধিমান। khorgosh-5খরগোশের সাথে রওনা হওয়ার আগে সে তার বউকে একটা থলের মধ্যে বালিশ, কুড়াল, চাকু, তীর ও দরকারি আরও কিছু টুকিটাকি জিনিষ গুছিয়ে দিতে বলল। বউ সব গুছিয়ে খরগোশের হাতে দিল। এসব নিয়ে কচ্ছপ এবার খরগোশের সাথে রওনা হল টাকার বাগান দেখতে।
কচ্ছপ আর খরগোশ হাঁটছে তো হাঁটছেই। বনের মধ্যে কিছুদূর যাওয়ার পর খরগোশ কচ্ছপকে বলল, “কচ্ছপ, কচ্ছপ, আমাকে যে একটু বাড়ি যেতে হবে। আমি আমার বালিশটা ভুলে রেখে এসেছি। ওটাকে আনতে হবে। না হলে রাতে তো আমি ঘুমুতে পারব না।”
“ঠিক আছে। ওটার জন্য আর তোমাকে বাড়ি গিয়ে কাজ নেই। আমার কাছে বালিশ আছে। ওটা তুমি ব্যবহার করতে পার।”, কচ্ছপ বলল।
সুতরাং খরগোশের আর বাড়ি ফেরা হল না। আবার তারা চলতে রাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালুলু আবার বলল, “ওহ্ , আমার কুড়ালখানা তো ভুলে রেখে এসেছি। ওটা আনতে আমাকে বাড়ি যেতে হবে।”
“ওটা কোন ব্যাপারই না। এই নাও আমার কুড়ালখানা।”
সুতরাং খরগোশ ফের কচ্ছপের সাথে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালুলু আবার বলল, “ইস। আমার চাকুখানা তো ফেলে রেখে এসেছি। টাকার গাছ থেকে টাকা কাটব কি দিয়ে? নাহ্ , আমাকে এক্ষুনি ফিরতে হবে।”
“এটা কোন ব্যাপারই না। এই নাও, আমার চাকুখানা নাও।” কচ্ছপ বলল।
অতএব ওরা আবার চলতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর খরগোশ বলল, “কচ্ছপ, একটু পর আমার একটা ঘন জঙ্গল পার হব। সেটা খুব ভয়ংকর জঙ্গল। বাঁচার জন্য একটা তীর ধনুক দরকার। আমি কি কাছে কোথাও গিয়ে ওটা নিয়ে আসব?”
“ঠিক আছে। তোমার চিন্তার কিছু নেই। আমার কাছে অনেক তীর আছে।”, কচ্ছপ বলল।
এবার কিন' খরগোশ সত্যি সত্যি বিপদে পড়ে গেল। সে বোকা বনে গেল খরগোশের কাছে। সে চিন্তা করতে লাগল, এ বোকামির পরিণতি এখন কী হতে পারে? সে কল্পনা করতে লাগল, বনের রাজা একটা রশি দিয়ে তাকে উল্টো করে তাল গাছের মাথায় ঝুলিয়ে রেখেছে। একটা বানর তাকে লাঠি দিয়ে ইচ্ছেমত পেটাচ্ছে। নাহ্ সে আর ভাবতে পারছে না। শেষে সে খরগোশের কাছ থেকে পালানোর জন্য জোরসে দিল দৌড়। পায়ে যত জোর আছে দৌড়াতে দৌড়াতে সে ফিরে এলে নিজের বাড়িতে। কচ্ছপ তখন অনেক পিছনে।
বাড়ি ফিরে কালুলু তার বউকে চিৎকার করে বলতে লাগল, “বউ, বউ, আমার হাতে আর এক মিনিটও সময় নেই। তুমি তাড়াতাড়ি আমার গায়ের সব পশম তুলে দাও। তারপর আমার সারা গায়ে কাদা মাটি লেপে দাও। যেন সবাই আমাকে দেখে ভাবে আমি তোমার শিশু সন্তান। কালুলু নয়।” এ কথা শুনে তার বউ দ্রুত তাকে কামিয়ে দিল। কাদা লেপে দেয়ার পর কালুলুকে সত্যি সত্যি খুব ছোট দেখাল। যেন সে কোন খরগোশের বাচ্চা।
এর মধ্যে হয়েছে কি, কচ্ছপ ফিরে এসে বনের রাজাকে সব ঘটনা খুলে বলল। রাজা বলল, “এবার আর মিথ্যুক খরগোশকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ওকে লম্বা তালগাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মারব। যাও, ওকে ধরে নিয়ে এসো।”, রাজা সেপাইদের হুকুম দিল।
সেপাইরা বাড়ি গিয়ে খরগোশকে ডাকতে লাগল, “বেরিয়ে এসো আহাম্মক। রাজা তোমাকে এক্ষুনি ধরে নিয়ে যেতে বলেছে।”
কালুলুর বউ বলল, “এখানে তো আমি আর আমার শিশু সন্তান ছাড়া আর কেউ থাকে না।”
khorgosh-6 সারা বাড়ি তন্ন করে খুজেও খরগোশের দেখা পেল না। কোথায় কালুলু? অবশেষে সেপাইরা বলল, “যখন কালুলুকে পাওয়া গেল না তখন এই শিশু ছানাকেই নিয়ে যাচ্ছি।” এই বলে সেপাইরা একটা ঝুড়িতে শিশু ছানা মনে করে কালুলুকে নিয়ে গেল।
কালুলুর বউ সে রাতেই গিয়ে হাজির হল রাজার কাছে। দেখল একটা ঝুড়িতে ভরে কালুলুকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। বউটি ঝুড়ির কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বলল, “শোন, কাল বিচারের জন্য তোমার ঝুড়ির মুখ যখন খোলা হবে তখন তুমি শক্ত হয়ে ঝুড়ির মধ্যে মরার মত পড়ে থাকবে যেন তুমি মরে গেছ। শ্বাসটাকেও একটু সামলে রেখ।”
পরদিন কালুলুর বউ রাজার কাছে গেল এবং শিশুকে কিছু খাওয়ানোর অনুমতি চাইল। তাকে ঝুড়ির কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ঝুড়ি খোলা হল। কিন্তু এ কি! খরগোশ ছানাটা যে মরে গেছে! বউটি দ্রুত রাজার কাছে ফিরে এসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, বলল, “রাজাই আমার ছানাকে মেরে ফেলেছে। আদালতে আমি এ মৃত্যুর বিচার চাইব। রাজাকে আসামী করে আমি আজই মামলা করব।”
এ কথা শোনার পর রাজা চিন্তায় পড়ে গেল সত্যি তো। দোষ যা করার করেছে কালুলু। ও তো কোন দোষ করেনি। তবে ওকে কেন ধরে নিয়ে এল সেপাইরা? তাকে হত্যা করা উচিত হয়নি। অবশেষে বনের সব পশু মিলে রায় দিল, রাজাকে অবশ্যই এজন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। খরগোশের বউকে এক থলি টাকা দেয়া হোক যাতে সে তার শিশুর কবর দিতে পারে।
রাজা বড় এক থলি টাকা দিল কালুলুর বউয়ের হাতে। টাকার থলি আর মৃত শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো কালুলুর বউ। ফিরে এসেই ঝুড়ির মুখ খুলে দিল সে। সাথে সাথে ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে এল শিশু বেশের কালুলু। বলল, “ওহ্ বাঁচালে আমাকে। শক্ত হয়ে থাকতে কি যে কষ্ট হচ্ছিল! ওভাবে মরার মত ভান করে কতক্ষণ থাকা যায়? নাহ্ আমি আর কখনো কোন মিথ্যে কথা বলব না।
কালুলুর বউ তাকে টাকার থলিটি দেখাল। কালুলু বলল, “এর থেকে খবরদার একটা টাকাও খরচ করবে না। সব রেখে দাও। ওগুলো প্রতারণার ফসল। ও টাকা আমাদের আবার দেখো নতুন করে কোন ঝামেলায় ফেলবে। দেখলে না একবার মিথ্যে বলে এক থলি টাকা নিয়ে কি ঝামেলাই না পোহাতে হল। যখন আমার পশমগুলো আবার ভালভাবে গজিয়ে উঠবে আমি ও টাকাগুলো আবার রাজাকে ফেরত দিয়ে আসব।”
এভাবে দিন যায়, রাত যায়। কয়েক মাস পর কালুলু আবার আগের চেহারায় ফিরে এল। এক দিন সে টাকার থলি নিয়ে রাজার কাছে রওনা হল। গিয়ে বলল, “হুজুর, এইমাত্র আমি টাকার বাগান থেকে ফিরছি। অনেক দূরের বাগান তো। তাই আসতে অনেক দেরী হয়ে গেল। এই দেখুন, আমি সে বাগান থেকে কত্ত টাকা তুলে এনেছি। কচ্ছপ কী আর আমার সাথে হেঁটে পারে? ও পিছনে পড়ে রইল। শেষে একা ফিরে এসেছে। কিছুতেই সে আর আমার সাথে হাঁটতে রাজী হল না, যেতে রাজী হল না সেই দূরের বাগানে। কি আর করা! ওকে তো আর আমি জোর করতে পারি না। এই নিন টাকাগুলো।” এই বলে কালুলু বনের রাজার হাতে টাকাগুলো তুলে দিল।
বনের রাজা কালুলুর টাকাগুলো পেয়ে খুব খুশি হল। টাকা চাষের মত অদ্ভুত এক চাষের ফসল হাতে পেয়ে খরগোশকে ধন্যবাদ জানাল সে। কিন্তু পরক্ষণেই সে তার শিশুকে মেরে ফেলার জন্য লজ্জিত হল। কালুলু বাড়ি ফিরে আনন্দে লাফাতে লাগল এই ভেবে যে সে পুরো ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সামলাতে পেরেছে। তবে সে জন্য তাকে শেষ বারেও মিথ্যে বলতে হয়েছে। কিন্তু এটাই তার শেষ মিথ্যে কথা। সে প্রতিজ্ঞা করল, জীবনে যত দিন বাঁচবে কখনো আর মিথ্যে বলবে না। মিথ্যে বলার ঝামেলা অনেক।
বর্ষাকাল শুরু হল। এ সময় একদিন বনের রাজা সিংহ বনের সব পশুদের নিয়ে সভা করতে বসল। বনের রাজা বনের সব ফাঁকা জমিতে চাষাবাদ করার এক কর্মসূচি নিয়েছে। তাই সে বনের সব পশুদের কাছে একে একে জিজ্ঞেস করল কে কী চাষ করতে চায়। কেউ বলল, আমি ভূট্টা চাষ করব। কেউ বলল, আমি কাউন চাষ করব। কেউবা চাইল শিমুল আলু চাষ করতে।
একজন বলল, “আমি ধান চাষ করব।”
সব শেষে বনের রাজা খরগোশকে জিজ্ঞেস করল, “কী হে খরগোশ। তুমি কী চাষ করবে? কিসের বীজ বুনবে?”
খরগোশ জবাব দিল, “রাজা সাহেব, আপনি যদি আমাকে এক থলি টাকা দেন তাহলে আমি টাকার বীজ বুনব, টাকার চাষ করতে চাই আমি। সেসব গাছে অনেক টাকা ফলবে।”
“তাজ্জব কথা! কাউন ভূট্টা চাষ করা যায়। কিন্তু কে কবে শুনেছে যে টাকার চাষ করা যায়?” বনের রাজা খরগোশকে জিজ্ঞেস করল।
খরগোশের নাম ছিল কালুলু। কালুলু উত্তর দিল, “কেউ না শুনুক। কেউ না করুক। আমি টাকার চাষ করব। টাকা চাষ করে আমি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে চাই। আপনি শুধু দেখবেন যে কী করে আমি সেটা করি। এখন আমাকে এক থলি টাকা দিন তো।”
বনের রাজা এবার সত্যিই খুব কৌতুহল বোধ করল, বলল, “সত্যি দেখা দরকার, টাকার চাষ করে কেমন করে?” সুতরাং বনের রাজা খরগোশকে বড় এক থলি টাকা দিল। টাকাগুলো পেয়ে কালুলু তো মহা খুশি। এত্ত টাকা! ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে সভা শেষে সে টাকাগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেল। দামী দামী কাপড় চোপড়, মাছ, মাংস, রুটি, মদ ইত্যাদি কিনে সে টাকাগুলো সব খরচ করে ফেলল।
বর্ষা পেরিয়ে শরৎ এল। শরৎ পেরিয়ে এলো ফসল কাটার হেমন্ত কাল। এমন সময় বনের রাজা একদিন খরগোশকে ডেকে পাঠাল। বলল, “কালুলু, টাকা চাষ করে তুমি যত টাকা পেয়েছ সব নিয়ে এসো।”
কালুলু বলল, “জনাব রাজা। টাকার গাছ তো আর যে সে গাছ নয়। বাড়ে খুব ধীরে ধীরে। এত দিনে সবে টাকার চারা গজিয়েছে। দু’একটা চারা পাতা মেলতে শুরু করেছে। টাকা ধরতে আরও অনেক সময় লাগবে।”
এভাবে আলসেমী করে সে একটা বছর কাটিয়ে দিল। পরের বছর আবার যখন ফসল কাটার সময় এল, বনের রাজা খরগোশকে ডেকে বলল, “কালুলু, এবার নিয়ে এসো তোমার সব টাকা।”
“হুজুর। টাকার গাছ খুব আস্তে আস্ত বড় হয়। সেসব গাছে মাত্র শীষ এসেছে।” কালুলু উত্তর দিল।
তবে খরগোশ মনে মনে খুবই চিন্তায় পড়ে গেল, এর পর কী বলবে? মিথ্যে তো বলেই ফেলেছে। এখন কী হবে? একবার মিথ্যে বললে যে তা ঢাকতে বারবার মিথ্যে বলতে হয়! কিন্তু এভাবে আর কদ্দিন? একদিন সিংহটা ঠিকই সত্য কথাটা জেনে যাবে। তখন নির্ঘাত ওর প্রাণটা যাবে।
এভাবে নানা অজুহাত দেখিয়ে চার চারটা বছর কেটে গেল। ওদিকে খরগোশের টাকা ফেরত দেয়ার কোন নাম গন্ধ নেই। বনের রাজার একটু সন্দেহ হল, “খরগোশ তার সাথে চালাকি করছে না তো?”
সুতরাং সে একটা বুনো শূকরকে এবার খরগোশের সাথে দিয়ে বলল, “কালুলু, ওকে সাথে নিয়ে যাও। ও দেখে এসে আমাকে বলবে যে তোমার টাকার ফসল কেমন হয়েছে। যদি পেকে থাকে তবে শিঘ্রি দু’জনে মিলে কেটে নিয়ে আসবে।”
মহা ফাপরে পড়ে গেল খরগোশ। এবার নিশ্চয়ই বুনো শুয়োরটা দেখে এসে সব ফাঁস করে দেবে। কিছু একটা করা দরকার। সে বলল, “শুয়োর, তুমি নিশ্চয়ই যাবে আমারkhorgosh-2 সাথে। টাকার বাগান, সে তো অনেক দূরের পথ। এ বন পেরিয়ে অন্য বনে। ভাব দেখি, যদি এ বনে বা কোন গাঁয়ের কাছে টাকার চাষ করতাম, সব টাকা চুরি হয়ে যেত না। তাই এক মহা দুর্গম গহীন বনের মধ্যে টাকার চাষ করেছি।”
শুয়োর মাথা নাড়ল, বলল, “সত্যি তো। তবু আমি তোমার সাথে যাব। রাজার হুকুম না মেনে কি উপায় আছে?”
খরগোশ বুঝতে পারল সে এক কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এবার আর তার রক্ষে নেই। সব ফাঁস হয়ে যাবে। কী আর করা! শুয়োরকে সাথে নিয়ে সে রওনা হল। কিন্তু কোন দিকে যাবে? টাকার কোন ক্ষেত থাকলে তো সেখানে যাবে? তবু একদিকে তারা দু'জন হাঁটতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কালুলু বুনো শুয়োরকে বলে উঠল, “শুয়োর, একটু দাঁড়াও। বাড়ি থেকে আমি আমার বালিশটা নিয়ে আসি। অনেক দূরের পথ তো। আজ আর দিনে দিনে ফেরা যাবে না। পথেই ঘুমুতে হবে। আমি আবার বালিশ ছাড়া একদম ঘুমুতে পারি না।”
এই বলে কালুলু বুনো শুয়োরকে সেখানে অপেক্ষা করতে বলল এবং নিজে হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা দূরে গেল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটা ঝোপের আড়ালে ঢুকে পড়ল। ঝোপ থেকে একটা নলের মত কাঠি নিয়ে জোরে ফুঁ দিতে লাগল। চিৎকার করে সে তার কন্ঠস্বর বদলে ফেলে অবিকল মানুষের মত বলতে লাগল, “বাবা, বাবা, দেখ কেমন নাদুস নুদুস একটা বুনো শুয়োর। তাড়াতাড়ি এসো। এটাকে মেরে আমরা নিয়ে যাই।”
এ কথা শুনে তো বুনো শুয়োরের আত্মারাম খাঁচা, ভীষণ ভয় পেয়ে গেল সে। ভাবল, নিশ্চয়ই কোন শিকারী তার ছেলেকে নিয়ে বনে শিকার করতে এসেছে। অতএব, khorgosh-3বাঁচতে চাইলে এক্ষুণি পালানো দরকার। এই ভেবে বুনো শুয়োর জোরছে ছুটতে শুরু করল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে রাজার কাছে এসে হাজির হল।
ওদিকে খরগোশও চলে গেল বনের রাজার কাছে। গিয়ে বলল, “রাজা সাহেব, রাজা সাহেব, আমি বুনো শুয়োরকে সাথে নিয়ে টাকার বাগান দেখতে রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু শুয়োরটা ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। আমার কী দোষ বলুন? বিশ্বাস না হলে ওকেই জিজ্ঞেস করুন।”
এ কথা শুনে রাজা ভয়ানক রেগে গেল। বলল, “বুনো শুয়োর। আমি তোমাকে পাঠালাম টাকার গাছ দেখতে আর তুমি ভয়ে পালিয়ে এসেছ?”
“কী করব হুজুর? না হলে যে আমার জানটাই যায়।”, শুয়োর বলল।
“নাহ্, এর শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।”
এরপর সে বনের সবচে শক্তিশালী এক সিংহকে হুকুম করল, “সিংহ, তোমার নিশ্চই ভয় করবে না। কেননা, তোমাকেই তো সবাই ভয় পায়। অতএব, এবার তুমি যাবে কালুলুর সাথে। গিয়ে দেখে এসে অবশ্যই টাকার বাগানের কি অবস্থা তা আমাকে বলবে।”
এখন খরগোশ পড়ে গেল মহা দুশ্চিন্তায়। আহা, একটা মিথ্যে কথা বলে কী বিপদেই না পড়া গেল! এখন সেটাকে ঢাকতে আরো কত না জানি মিথ্যে কথা বলতে হবে! সিংহকে সাথে নিয়ে খরগোশ অগত্যা বেরিয়ে পড়ল টাকার বাগান দেখাতে। কিছুদূর যেতেই সে আগের মত ভান ধরল, বলল, “সিংহ, সিংহ, বাড়িতে আমি আমার কুড়াল ভুলে রেখে এসেছি। ওটা না হলে তো টাকার শক্ত গাছগুলো কাটতেই পারব না। তুমি একটু দাঁড়াও। আমি এক দৌড়ে গিয়ে কুড়ালটা নিয়ে আসি।”
কী আর করা? সিংহ সেখানে বসে পড়ল। খরগোশও সেখান থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে এসে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল এবং আগের মতই চিৎকার করে বলতে লাগল, “বাবা, বাবা, ওখানে একটা সিংহ দেখা যাচ্ছে। শিঘ্রি গুলি কর ওটাকে।”
এ কথা শুনে সিংহ খুব ভয় পেয়ে গেল। ভাবল, নিশ্চয়ই কোন শিকারী তার দিকে বন্দুক তাক করে ফেলেছে। এক্ষুনি হয়ত গুলি করবে। অতএব বাঁচতে চাইলে পালাই। khorgosh-4সিংহ দিল এ দৌড় আর সে দৌড়।
কালুলু সোজা রাজার কাছে গিয়ে নালিশ জানাল, “হুজুর, আমি সিংহকে নিয়ে যাচ্ছিলাম আমার সেই অনিন্দ্য সুন্দর টাকার বাগান দেখাতে। কিন্তু হঠাৎ সিংহের যে কী হল! বনের মধ্যে কাকে দেখে সে এমন ভয় পেল যে আমাকে ফেলে রেখেই সে পালিয়ে এল।”
এ কথা শুনে রাজা খুব রেগে গেল, “সিংহকে এজন্য অবশ্যই সাজা ভোগ করতে হবে।”
এরপর রাজা এক মহিষকে আদেশ করল কালুলুর সাথে যেতে। রাজা বলল, “মহিষ, তুমি সিংহের চেয়ে বড়। তুমি নিশ্চয়ই ওর মত ভয় পেয়ে পালিয়ে আসবে না? যাও গিয়ে দেখে এসো আমার টাকার বাগানে কত টাকা ধরেছে? আর সেগুলো কাটার মত হয়েছে কী না?”
এ কথা শুনে কালুলু খুব ঘাবড়ে গেল। কিন্তু কী আর করা! মহিষকে নিয়ে সে রওনা হল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালুলু মহিষকে বলল, “ওহ্ মহিষ। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আমি তো ছুরিটা আনতেই ভুলে গেছি। এক্ষুণি বাড়ি যাওয়া দরকার।” এ কথা বলে সে তক্ষুণি সেখান থেকে দৌড় দিল এবং একইভাবে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। ঝোপের আড়াল থেকে মানুষের কন্ঠস্বর নকল করে বলে উঠল, “বাবা, বাবা, দেখ কি তাগড়াই একটা মহিষ। শিঘ্রি তোমার তীর ধনুকটা নিয়ে এসো। ওটাকে মেরে ফেলি।”
এ কথা শুনে মহিষ প্রাণভয়ে দিল দৌড়। আর খরগোশ রাজাকে গিয়ে জানাল, মহিষও ওদের মত গহীন বনে গিয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছে। সুতরাং ওকে নিয়ে আর টাকার বাগান দেখতে যাওয়া হয়নি।
বনের রাজা এবার সত্যি খুব রেগে গেল এবং মহিষকে কঠিন শাস্তি দিল। এবার এক কচ্ছপকে ধমক দিয়ে রাজা বলল, “কচ্ছপ, এবার তুমি খরগোশের সাথে যাবে। গিয়ে সেই টাকার বাগান দেখে এসে আমাকে সব ঘটনা খুলে বলবে। আমার তো রীতিমত সন্দেহ হচ্ছে খরগোশকে। সত্যি যদি সে প্রতারণা করে তাহলে আমি ওকে গাঁয়ের ওই সবচে উঁচু তালগাছটায় দশদিন ঝুলিয়ে রাখব আর একটা বানরকে পাঠাব ওকে পেটানোর জন্য।”
এ কথা শুনে কালুলু এবার ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। এবার আর রক্ষে নেই। বোকামি আর মিথ্যে বলার শাস্তি তাকে এবার পেতেই হবে। কচ্ছপটা ছিল বেশ বুদ্ধিমান। khorgosh-5খরগোশের সাথে রওনা হওয়ার আগে সে তার বউকে একটা থলের মধ্যে বালিশ, কুড়াল, চাকু, তীর ও দরকারি আরও কিছু টুকিটাকি জিনিষ গুছিয়ে দিতে বলল। বউ সব গুছিয়ে খরগোশের হাতে দিল। এসব নিয়ে কচ্ছপ এবার খরগোশের সাথে রওনা হল টাকার বাগান দেখতে।
কচ্ছপ আর খরগোশ হাঁটছে তো হাঁটছেই। বনের মধ্যে কিছুদূর যাওয়ার পর খরগোশ কচ্ছপকে বলল, “কচ্ছপ, কচ্ছপ, আমাকে যে একটু বাড়ি যেতে হবে। আমি আমার বালিশটা ভুলে রেখে এসেছি। ওটাকে আনতে হবে। না হলে রাতে তো আমি ঘুমুতে পারব না।”
“ঠিক আছে। ওটার জন্য আর তোমাকে বাড়ি গিয়ে কাজ নেই। আমার কাছে বালিশ আছে। ওটা তুমি ব্যবহার করতে পার।”, কচ্ছপ বলল।
সুতরাং খরগোশের আর বাড়ি ফেরা হল না। আবার তারা চলতে রাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালুলু আবার বলল, “ওহ্ , আমার কুড়ালখানা তো ভুলে রেখে এসেছি। ওটা আনতে আমাকে বাড়ি যেতে হবে।”
“ওটা কোন ব্যাপারই না। এই নাও আমার কুড়ালখানা।”
সুতরাং খরগোশ ফের কচ্ছপের সাথে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর কালুলু আবার বলল, “ইস। আমার চাকুখানা তো ফেলে রেখে এসেছি। টাকার গাছ থেকে টাকা কাটব কি দিয়ে? নাহ্ , আমাকে এক্ষুনি ফিরতে হবে।”
“এটা কোন ব্যাপারই না। এই নাও, আমার চাকুখানা নাও।” কচ্ছপ বলল।
অতএব ওরা আবার চলতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর খরগোশ বলল, “কচ্ছপ, একটু পর আমার একটা ঘন জঙ্গল পার হব। সেটা খুব ভয়ংকর জঙ্গল। বাঁচার জন্য একটা তীর ধনুক দরকার। আমি কি কাছে কোথাও গিয়ে ওটা নিয়ে আসব?”
“ঠিক আছে। তোমার চিন্তার কিছু নেই। আমার কাছে অনেক তীর আছে।”, কচ্ছপ বলল।
এবার কিন' খরগোশ সত্যি সত্যি বিপদে পড়ে গেল। সে বোকা বনে গেল খরগোশের কাছে। সে চিন্তা করতে লাগল, এ বোকামির পরিণতি এখন কী হতে পারে? সে কল্পনা করতে লাগল, বনের রাজা একটা রশি দিয়ে তাকে উল্টো করে তাল গাছের মাথায় ঝুলিয়ে রেখেছে। একটা বানর তাকে লাঠি দিয়ে ইচ্ছেমত পেটাচ্ছে। নাহ্ সে আর ভাবতে পারছে না। শেষে সে খরগোশের কাছ থেকে পালানোর জন্য জোরসে দিল দৌড়। পায়ে যত জোর আছে দৌড়াতে দৌড়াতে সে ফিরে এলে নিজের বাড়িতে। কচ্ছপ তখন অনেক পিছনে।
বাড়ি ফিরে কালুলু তার বউকে চিৎকার করে বলতে লাগল, “বউ, বউ, আমার হাতে আর এক মিনিটও সময় নেই। তুমি তাড়াতাড়ি আমার গায়ের সব পশম তুলে দাও। তারপর আমার সারা গায়ে কাদা মাটি লেপে দাও। যেন সবাই আমাকে দেখে ভাবে আমি তোমার শিশু সন্তান। কালুলু নয়।” এ কথা শুনে তার বউ দ্রুত তাকে কামিয়ে দিল। কাদা লেপে দেয়ার পর কালুলুকে সত্যি সত্যি খুব ছোট দেখাল। যেন সে কোন খরগোশের বাচ্চা।
এর মধ্যে হয়েছে কি, কচ্ছপ ফিরে এসে বনের রাজাকে সব ঘটনা খুলে বলল। রাজা বলল, “এবার আর মিথ্যুক খরগোশকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ওকে লম্বা তালগাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মারব। যাও, ওকে ধরে নিয়ে এসো।”, রাজা সেপাইদের হুকুম দিল।
সেপাইরা বাড়ি গিয়ে খরগোশকে ডাকতে লাগল, “বেরিয়ে এসো আহাম্মক। রাজা তোমাকে এক্ষুনি ধরে নিয়ে যেতে বলেছে।”
কালুলুর বউ বলল, “এখানে তো আমি আর আমার শিশু সন্তান ছাড়া আর কেউ থাকে না।”
khorgosh-6 সারা বাড়ি তন্ন করে খুজেও খরগোশের দেখা পেল না। কোথায় কালুলু? অবশেষে সেপাইরা বলল, “যখন কালুলুকে পাওয়া গেল না তখন এই শিশু ছানাকেই নিয়ে যাচ্ছি।” এই বলে সেপাইরা একটা ঝুড়িতে শিশু ছানা মনে করে কালুলুকে নিয়ে গেল।
কালুলুর বউ সে রাতেই গিয়ে হাজির হল রাজার কাছে। দেখল একটা ঝুড়িতে ভরে কালুলুকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। বউটি ঝুড়ির কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বলল, “শোন, কাল বিচারের জন্য তোমার ঝুড়ির মুখ যখন খোলা হবে তখন তুমি শক্ত হয়ে ঝুড়ির মধ্যে মরার মত পড়ে থাকবে যেন তুমি মরে গেছ। শ্বাসটাকেও একটু সামলে রেখ।”
পরদিন কালুলুর বউ রাজার কাছে গেল এবং শিশুকে কিছু খাওয়ানোর অনুমতি চাইল। তাকে ঝুড়ির কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ঝুড়ি খোলা হল। কিন্তু এ কি! খরগোশ ছানাটা যে মরে গেছে! বউটি দ্রুত রাজার কাছে ফিরে এসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, বলল, “রাজাই আমার ছানাকে মেরে ফেলেছে। আদালতে আমি এ মৃত্যুর বিচার চাইব। রাজাকে আসামী করে আমি আজই মামলা করব।”
এ কথা শোনার পর রাজা চিন্তায় পড়ে গেল সত্যি তো। দোষ যা করার করেছে কালুলু। ও তো কোন দোষ করেনি। তবে ওকে কেন ধরে নিয়ে এল সেপাইরা? তাকে হত্যা করা উচিত হয়নি। অবশেষে বনের সব পশু মিলে রায় দিল, রাজাকে অবশ্যই এজন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। খরগোশের বউকে এক থলি টাকা দেয়া হোক যাতে সে তার শিশুর কবর দিতে পারে।
রাজা বড় এক থলি টাকা দিল কালুলুর বউয়ের হাতে। টাকার থলি আর মৃত শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো কালুলুর বউ। ফিরে এসেই ঝুড়ির মুখ খুলে দিল সে। সাথে সাথে ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে এল শিশু বেশের কালুলু। বলল, “ওহ্ বাঁচালে আমাকে। শক্ত হয়ে থাকতে কি যে কষ্ট হচ্ছিল! ওভাবে মরার মত ভান করে কতক্ষণ থাকা যায়? নাহ্ আমি আর কখনো কোন মিথ্যে কথা বলব না।
কালুলুর বউ তাকে টাকার থলিটি দেখাল। কালুলু বলল, “এর থেকে খবরদার একটা টাকাও খরচ করবে না। সব রেখে দাও। ওগুলো প্রতারণার ফসল। ও টাকা আমাদের আবার দেখো নতুন করে কোন ঝামেলায় ফেলবে। দেখলে না একবার মিথ্যে বলে এক থলি টাকা নিয়ে কি ঝামেলাই না পোহাতে হল। যখন আমার পশমগুলো আবার ভালভাবে গজিয়ে উঠবে আমি ও টাকাগুলো আবার রাজাকে ফেরত দিয়ে আসব।”
এভাবে দিন যায়, রাত যায়। কয়েক মাস পর কালুলু আবার আগের চেহারায় ফিরে এল। এক দিন সে টাকার থলি নিয়ে রাজার কাছে রওনা হল। গিয়ে বলল, “হুজুর, এইমাত্র আমি টাকার বাগান থেকে ফিরছি। অনেক দূরের বাগান তো। তাই আসতে অনেক দেরী হয়ে গেল। এই দেখুন, আমি সে বাগান থেকে কত্ত টাকা তুলে এনেছি। কচ্ছপ কী আর আমার সাথে হেঁটে পারে? ও পিছনে পড়ে রইল। শেষে একা ফিরে এসেছে। কিছুতেই সে আর আমার সাথে হাঁটতে রাজী হল না, যেতে রাজী হল না সেই দূরের বাগানে। কি আর করা! ওকে তো আর আমি জোর করতে পারি না। এই নিন টাকাগুলো।” এই বলে কালুলু বনের রাজার হাতে টাকাগুলো তুলে দিল।
বনের রাজা কালুলুর টাকাগুলো পেয়ে খুব খুশি হল। টাকা চাষের মত অদ্ভুত এক চাষের ফসল হাতে পেয়ে খরগোশকে ধন্যবাদ জানাল সে। কিন্তু পরক্ষণেই সে তার শিশুকে মেরে ফেলার জন্য লজ্জিত হল। কালুলু বাড়ি ফিরে আনন্দে লাফাতে লাগল এই ভেবে যে সে পুরো ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সামলাতে পেরেছে। তবে সে জন্য তাকে শেষ বারেও মিথ্যে বলতে হয়েছে। কিন্তু এটাই তার শেষ মিথ্যে কথা। সে প্রতিজ্ঞা করল, জীবনে যত দিন বাঁচবে কখনো আর মিথ্যে বলবে না। মিথ্যে বলার ঝামেলা অনেক।







