Category: ছোটদের খবর
12.jpg
News Headings

যাদের জন্য কেউ নেই...
২৭ জানুয়ারী শিশু প্রকাশের সম্মেলন
জুতার গাম দিয়ে নেশা করছে রাজধানীর শিশুরা
পথশিশুদের নিয়ে শিক্ষা বাণিজ্য
হরিজন শিশুদের ভবিষ্যত অনেকটাই অনিশ্চিত
Jan 3, 2009
চিলড্রন ভয়েস
হরিজন শিশুদের ভবিষ্যত অনেকটাই অনিশ্চিত
আরিফুল ইসলাম আরমান
শহরের প্রধান সড়কের দয়াময়ী মোড় থেকে পূর্ব দিকে সোজা এগোলে জামালপুর-ময়মনসিংহ সড়কের পাশেই হরিজন কলোনী। প্রধান ফটক পার হলে সামনে চোখে পড়বে জারাজীর্ণ ছোট ছোট ঝুঁপড়ি ঘর,কালীমন্দির। রয়েছে পায়ে হাটার সরু পথ। আর এই সরু পথ ধরে কলোনীর ভেতরে প্রবেশ করলেই নাকে আসবে মদের উৎকট গন্ধ। যে গন্ধে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে। আর এরই মাঝে বসবাস করছে কলোনীর দুই শতাধিক শিশু।
শিক্ষা বঞ্চিত,অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ,ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম,বাল্যবিবাহ এবং অভিভাবকদের অসচেতনতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে কলোনীর শিশুরা। ফলে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে এখানকার শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ। পারিপাশ্বর্িক পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এসব শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে নানা রকম অপরাধের সাথে। প্রায় দু'শ বছর আগে স্থাপিত কলোনীর শতাধিক ঘরে প্রায় নব্বইটি পরিবারের বসবাস।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে,অভিভাবকদের অসচেতনতায় কলোনীর শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করতেই পড়াশোনা শেষ করছে। আর দশ পেড়িয়ে বারতে পড়লেই মেয়ে শিশুরা শিকার হচ্ছে বাল্যবিবাহের। ছেলে শিশুরা একটু বড় হলেই যুক্ত হচ্ছে পৈত্রিক পেশায়। স্থানীয় ভাবে একটি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেখানে নেই শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও শিক্ষক। এরই মধ্য দিয়ে অনেক শিশুই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে হাই স্কুলে পড়ার স্বপ্ন দেখলেও সামাজিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে তারা পিছিয়ে পড়ছে। সমাজের হেয় সমপ্রদায়ের মানুষ হওয়ায় স্থানীয় হাই স্কুল গুলোতে তাদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ খুবই কম বলে অভিভাবকদের অভিযোগ। কলোনীর শিশু মৌসুমী (১০) জানালো,স্কুলের শিক্ষকরা তাদের শিক্ষাদানে বিমুখতা প্রকাশ করে। নোংরা ও ময়লা কাপড়,ছেড়া প্যান্ট ও জুতা পড়া ৬ বছরের শিশু আশিক জানলো, পড়াশোনা করতে ওর খুবই ভালো লাগে। ইচ্ছা,বড় হয়ে চাকুরী করবে। কিন্তু সংসারে নূন আনতে পান্তা ফুড়ায় অবস্থা। আর তাই এই বয়সেই সে স্থানীয় একটি চা স্টলে কাজ শুরু করেছে। তার মত কলোনীর ফাইরা (৯),মারিয়া (১৩),অমিত (১০),মধু (৭),রেশ (১০) এর অবস্থা অনেকটা একই রকম।
জাতীয় শিশুনীতিতে ১৮ বছরের কম বয়সে মেয়ে শিশুদের বিয়ে না দেওয়ার বিধান থাকলে কলোনীতে আনায়াসেই এই নীতি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। শুধু বাল্যবিবাহই নয়,এখানে বিরাজ করছে বহুবিবাহ। একজন পুরুষ একসাথে ৩ স্ত্রীর সাথে ঘর সংসার করার প্রমান মিলেছে।
খাবার পানি সংগ্রহের জন্য রয়েছে মাত্র ৩ টি টিউবওয়েল। সারাক্ষণ যেখানে ভীড় লেগেই থাকে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। দিন দিন মানুষ বাড়লেও কলোনীর জায়গা বাড়েনি। পৌরসভা নির্মিত একটি একতলা ভবন থাকলেও যেকোন সময় তা ভেঙে পরে ঘটতে পারে প্রাণহানি। ফলে তারা খুপরির মতো ঘর তুলে বসবাস করছে।
কলোনীর সর্বত্রই বিরাজ করছে অপরিচ্ছন্ন ও অপরিস্কার পরিবেশ। পুরো কলোনীতে নেই স্বাস্থ্য সম্মত স্যানেটারি ল্যাট্রিন। সারা বছরই কলোনীর শিশুরা ডায়রিয়া,আমাশয়,জন্ডিস,জ্বরসহ নানারকম রোগব্যাধিতে ভুগছে। স্বল্প আয়ের এসব মানুষের জন্য কাছে কোলে নেই কোন ডাক্তার। কিছু হলেই যেতে হয় ৮ কিলোমিটার দূরের সরকারী হাসপাতালে। আশপাশে বেসরকারী কয়েকটি হাসপাতাল থাকলেও সেখানে এদের জায়গা হয় না।
স্বাস্থ্য,শিক্ষা থেকে বঞ্চিত কলোনীর শিশুরা অল্প বয়সেই নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত হচ্ছে। পৈত্রিক পেশার পাশাপাশি কেউ জড়িয়ে পড়ছে হোটেল-রেস্তোরার কাজে,কেউবা রিকশা চালনো কাজে। মাদক সেবন করা এখানকার শিশুদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। বলতে গেলে,মাদকের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় এসব শিশুরা। আর বড় হওয়াটা এভাবেই। বাবার সাথে সাথে সব শিশুরাই একসাথে মদ পান করছে। যাদের বাধা দেওয়ার মত কেউ নেই। অনেকে এই মদের টাকা সংগ্রহ করতে লিপ্ত হচ্ছে নানা রকম অসামাজিক কাজে। কলোনীর শিশু দূর্গা (১৩) জানায়,মা নেই। বাবা মদ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে। জীবিকার প্রয়োজনে ছোট ভাইবোনরা বংশধারার কাজে জড়িত হয়ে পড়েছে। এখানকার নোংরা-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ওর ভালো লাগে। মদ পান করে কিনা জানতে চাইলে,প্রথমে অস্ব্বীকার করে। পরে স্বীকার করে বলে নিয়মিত পান করি না। সে আরও জানায়,এখানকার অধিকাংশ শিশুরাই মদ পান করে।
জেলা ন্যাশনাল চাইল্ড টাস্কফোর্স (এনসিটিএফ) এর সভাপতি শামীম এজাজ খান মার্টিন জানান,এসব শিশুদের দাবী আদায়ে তারা সর্বদা তৎপর। এব্যাপারে তারা সরকারের বিভিন্ন দফতরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে আশানুরূপ সারা পাননি।
এদিকে এখন পর্যন্ত কলোনীর অধিকাংশ শিশুরই জন্মনিবন্ধন হয়নি। যারা স্কুলে যায় শুধুমাত্র তাদেরই জন্মনিবন্ধন হয়েছে। আর জন্মনিবন্ধন কি? এটিই এখনো জানে না অভিভাবকরা। বিনোদন আর স্বাভাবিক বিকাশের ব্যবস্থা না থাকায় কলোনী সংলগ্ন প্রধান সড়কটিই তাদের খেলার মাঠ। যেখানে প্রতিনিয়ন ঘটছে নানা রকম দুর্ঘটনা।
তবে হতাশার কথা হচ্ছে,অধিকারবঞ্চিত এসব মানুষের পাশে নেই কোন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। এনজিও ও মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম জানান,হরিজন কলোনীর শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। যথাশীঘ্রই সম্ভব এবিষয়ে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
এসব ব্যাপারে জামালপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান এডভোকেট শাহ মো: ওয়ারেছ আলী মামুন জানান,হরিজন কলোনীর সমস্যাটা দীর্ঘদিনের। পৌর কতর্ৃপক্ষ সবসময় সে সব সমস্যা সমাধানে তৎপর। বর্তমানে সেখানে দুটি বেসরকারী সংস্থার সাথে পৌরসভা যৌথ উদ্যোগে স্যানিটেশন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।